উপাচার্যরা সততা ও নৈতিকতা দেখাতে পারেন না বলেই সংকট

সাক্ষাৎকার: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মাহফুজুর রহমান মানিক

কথাসাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক ও অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে চার দশকেরও বেশি শিক্ষকতার পর ২০১৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব) অধ্যাপনার পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘর ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ন্যায়পাল হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৮ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। ২০১৭ সালে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও কাগজ সাহিত্য পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি স্বীকৃতি ও সম্মাননা লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে যথাক্রমে ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি ১৯৭৪ সালে একই বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৯৮১ সালে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার জন্ম ১৯৫১ সালে সিলেটে।
সমকাল: সম্প্রতি জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, বরেণ্য শিক্ষাবিদরা উপাচার্য হতে চান না। তাদের কি স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নেই, না অন্য কিছু? বিষয়টি আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যটি একটা দুঃখজনক বাস্তবতার প্রতিফলন। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই এই সত্য সবার সামনে তুলে ধরার জন্য। বরেণ্য শিক্ষাবিদদের উপাচার্য হওয়ার জন্য আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। কিন্তু তারা হতে চান না। কারণ আপনি যেমনটা বলেছেন, স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের, দু-এক বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিলে সরকারি দলের স্থানীয় রাজনীতিকে আমলে নিতে হয়। ছাত্র-যুব-স্বেচ্ছাসেবী নানা সংগঠনের মন জুগিয়ে চলতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় প্রকল্পে তাদের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিতে হয়। এ রকম নানা প্রতিবন্ধকতা তাদের মোকাবিলা করতে হয়। এসব সামাল দিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করাটা প্রায় অসম্ভব।
সমকাল: উপাচার্যদের নিয়ে সাম্প্রতিক যে সংকট আমরা দেখছি, সেখানে কারণ হিসেবে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের বিষয়টিই সর্বাগ্রে উঠে আসছে কেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কারণ দু-এক ব্যতিক্রম বাদ দিলে উপাচার্য নিয়োগে একজন শিক্ষকের সরকারি দলের প্রতি আনুগত্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই দলের রাজনীতিতে শক্তিশালী একটি ভূমিকা থাকাকে একটি আবশ্যকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি একটি প্রথা হিসেবে গত শতকের আশির দশক থেকেই চলে আসছে। এটি একটি শক্তিশালী চর্চা।
সমকাল: উল্লেখযোগ্য উপাচার্যের কর্মকাণ্ডে সরকারও বিব্রত। তাহলে সরকার যোগ্য লোককে যোগ্য জায়গায় বসাতে পারছে না? নাকি যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: যেসব উপাচার্য নানা বিতর্কের জন্ম দেন, তাদের সংখ্যা কম। অনেক উপাচার্যই নিজেদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে পারেন। অনেক সময় স্থানীয় রাজনীতি ও রাজনীতিকদের স্বার্থের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে নানাভাবে তাদের ‘বিতর্কিত’ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। ফলে সব উপাচার্যকে একই মাপে ফেলে দেখা ঠিক নয়। তবে যারা প্রকৃতই বিতর্কিত, তারা শুধু নিয়োগকারী সরকারকে নয়; তাদের সহকর্মীসহ পুরো শিক্ষা পরিবারকেই বিব্রত করেন। Continue reading

শিক্ষাগুরুর মর্যাদা ‘বগুড়া স্টাইল’

বগুড়ায় আতঙ্কে বিদ্যালয় ছাড়তে চান সব শিক্ষক! চলছে প্রতিবাদ

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢুকে যেভাবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে মারধরের ঘটনা ঘটেছে, তা যে কাউকে হতবাক করবে। একজন অভিভাবক যেখানে শ্রেণি কার্যক্রম চলার সময় শিক্ষকের অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করতে পারেন না, সেখানে ওই অভিভাবক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে অন্যায়ভাবে তিনজন শিক্ষার্থীকে মেরেছেন! তাতেও তিনি ক্ষান্ত হননি; প্রতিবাদ জানানোয় শিক্ষকের গায়েও হাত তুলেছেন। এমনকি ওই নারী শিক্ষকের শ্নীলতাহানি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সোমবার সমকালে প্রকাশ, ভয়-লজ্জায় ওই বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক বদলি চাইছেন।

বলা বাহুল্য, এ ঘটনার পর শিক্ষকরা বিদ্যালয়টিকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। যেমনটি ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেছেন, ‘ক্লাসরুমে ঢুকে কেউ নারী শিক্ষককে মারধরসহ তার শ্নীলতাহানি করতে পারে, সেটা কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু আমাদের স্কুলে সেটাই হয়েছে। এ ঘটনার পর ক্লাসরুমটাকে কি আমরা আর নিরাপদ ভাবতে পারি?’ প্রশ্ন হলো, একজন অভিভাবক কীভাবে এমন সাহস করতে পারেন। তার সন্তান যদি অন্য সহপাঠীর দ্বারা আক্রান্ত হন, সেটা অভিভাবক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক কিংবা প্রধান শিক্ষকের কাছে বলবেন। তারা বিচার করতে ব্যর্থ হলে স্থানীয় প্রতিনিধি অথবা শিক্ষা প্রশাসনে নালিশ করতে পারেন। তিনি তার ধার না ধরে নিজেই বিচারের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন! Continue reading

সামাজিক বৈচিত্র্য ও অটিজম

প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছাকার্ডে অটিস্টিক শিশুর আঁকা ছবি (২০১৪)

সমাজভর্তি বিচিত্র মানুষ। কারও সঙ্গে কারও শতভাগ মিল নেই। রঙে মিল নেই, কথায় মিল নেই, আচরণে মিল নেই, চলাফেরায় মিল নেই, চিন্তা-চেতনায় মিল নেই। প্রতিভাও সবার সমান নয়। উচ্চতায়ও পার্থক্য ঢের। অমিল রয়েছে আয়ে, পারিবারিক অবস্থায় এবং বয়সে। কেউ উদার, কেউ অনুদার; কেউ কোমল, কেউ রাগী; কেউ অন্তর্মুখী, কেউ বহির্মুখী। কারও দুটি হাত থাকার বদলে একটি থাকা কিংবা পা না থাকা বা চোখে দেখতে না পাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ যাদের আমরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ কিংবা প্রতিবন্ধী বলি, তারাও এই বৈচিত্র্যের বাইরে নয়। অটিজম এমনি এক বৈচিত্র্যের নাম। যাদের মানসিক কিংবা শারীরিক বিকাশ সঠিকভাবে হয় না তারা সাধারণত অটিজমের শিকার। মানুষের বৈচিত্র্যের মধ্যেও শেষ দুই শ্রেণির জন্য আলাদা পরিভাষা সমাজে প্রচলিত; কারণ তাদের ধরন ও প্রয়োজন ভিন্ন। সামাজিক শৃঙ্খলা ও সংহতির জন্য আমরা যেমন ভিন্ন চিন্তার মানুষকে সম্মান করি, ঠিক একই কারণে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের চাহিদা পূরণে আমরা এগিয়ে যাই এবং অটিজম রয়েছে এমন কারও প্রতি সহানুভূতিশীল হই। সে চিন্তা থেকেই নিশ্চয় অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল জাতিসংঘ। ২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়।

অটিজম সচেতনতা দিবসে এ বছর জাতিসংঘ জোর দিয়েছে ইনক্লুসিভ এডুকেশন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায়। আমরা জানি, প্রতিটি শিশুর চাহিদা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী শিখন সম্পন্ন করা এবং সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে সবার শিক্ষা নিশ্চিত করাই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা। এর মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরিব, ছেলে-মেয়ে, প্রতিবন্ধী-অটিস্টিকসহ সব শিশুকে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান করা হয়। বস্তুত আমরা যখন অটিস্টিক শিশুর চাহিদা নিশ্চিত করার কথা বলছি, তাদের ব্যাপারে সচেতনতার কথা বলছি, সেখানে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে শিক্ষায়। Continue reading

দ্য কাশ্মীর ফাইলস : বিজেপির প্রোপাগান্ডা

বিতর্কের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ ছবির অনুমোদন দিয়েছেন

মূল লেখক : ফয়সাল হানিফ
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

বলিউডের সাম্প্রতিক জনপ্রিয় সিনেমা ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ রিলিজ হওয়ার পর থেকেই বক্স অফিস কাঁপাচ্ছে। কারণ, এ পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবির মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক হিসেবে তকমা পাওয়া ছবিটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কাশ্মীরি পণ্ডিতরা মুসলিম অধিকৃত কাশ্মীর উপত্যকাকে কৌশলে মুক্ত করেছে। আসলে যা ঘটেছে ছবির কাহিনি সে সত্যের কাছে যায়নি। যেখানে ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে রচিত যে কোনো ছবিতে বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত, সেখানে আমরা দেখছি ভারতীয় শাসক দল বিজেপির অনুদানপ্রাপ্ত ও দলটির বিশেষ উৎসাহের ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ যেন তাদের জন্য আরও বেশি কিছু নিয়ে এসেছে। সিনেমার অতিরঞ্জিত প্লটগুলোর অন্যতম, রক্তপিপাসু মুসলিম কর্তৃক হিন্দু নারীদের খুব কাছ থেকে টার্গেট করে গুলি করা। ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের যে কোনো খারাপ কিছু ঘটার জন্য প্রতিবেশীর ওপর দোষ চাপাতে পারে।
১৯৮৯ সাল থেকে শুরু করে দুই দশকে একটি সংগঠনের হিসাবে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ৬৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ ও সরকারের হিসাবে সংখ্যাটি আরও কম। তবে গবেষক অশোক সোয়ান দেখিয়েছেন, কাশ্মীর ফাইলসে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়ানোর কথা বলছে। একই সময়ে ভারতীয় সামরিক বাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার কাশ্মীরি মুসলমানকে হত্যার কথা বলা হয়েছে, কাশ্মীরজুড়ে গ্রামে গ্রামে চিহ্নহীন গণকবরের সন্ধান এ সম্পর্কেই বলছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের অনেককেই ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জঙ্গি’ হিসেবে দেখিয়েছে; যে ‘ওয়ার অন টেরর’ কাজে লাগিয়ে তার এ বর্বরতাকে এসব ‘খারাপ লোকদের’ বিরুদ্ধে নিজেকে বাঁচানোর কৌশল হিসেবে দেখানোর সুযোগ পেয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতীয় ছবির বাজার বিশাল। হলিউডের চেয়ে বলিউডে একশ কোটিরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়। একই সঙ্গে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলো খারাপ উদ্দেশ্য সাধনে এক জোট হয়ে কাজ করার ইতিহাস আছে। রুপালি পর্দায় যে অমানবিকতা প্রদর্শিত হয় তা সাংঘাতিক। Continue reading

সিনেমা নয়, সত্যি

বিয়ে-সংসার নিয়ে মানুষের যে স্বপ্ন থাকে; ফাহমিদা কামালেরও নিশ্চয় ব্যতিক্রম ছিল না। তার বিয়েও হয়েছে। তবে তা স্বাভাবিক পরিবেশে নয়। মেয়েটিও স্বাভাবিক ছিল না। অসুস্থতার মধ্যেই তার বিয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়। নাকে অক্সিজেনের নল, পরনে বিয়ের লাল বেনারসি, পাশে বর- এমন ছবি তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। স্বাভাবিকভাবেই সবাই নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানান এবং ফাহমিদার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। বলা বাহুল্য, ফাহমিদা মনের জোরে বিয়ের পরদিন বাসায়ও ফিরেছিলেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতির ফলে পরদিনই তাকে ফিরতে হয় হাসপাতালে। অবশেষে বিয়ের ১২তম দিনে ২১ মার্চ মেয়েটি চিরদিনের জন্য চলে যায়।

ফাহমিদার মৃত্যুর খবর নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাপিয়ে মূলধারায়ও খবরটি প্রকাশ পায়। এভাবে মানুষের চোখে জল আনা ফাহমিদার গল্পটা অসমাপ্তই থেকে গেল। মেয়েটি চলে গেলেও তার আলোচনা থেমে থাকেনি। বস্তুত তার জীবনে যা ঘটেছে, এমনটি আমরা সিনেমার পর্দায় দেখতে অভ্যস্ত। ফাহমিদার ঘটনা যেন সিনেমাকেও ছাড়িয়ে গেছে!

ফাহমিদার শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছিল। তার বয়স ৩০ না পেরোলেও ব্যাধি তাকে ভালোভাবেই কাবু করে ফেলেছিল। তার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার সব ধরনের চেষ্টা করা হয়। দেশের চিকিৎসার পাশাপাশি ভারতেও নেওয়া হয়েছিল ফাহমিদাকে। তার পরও মেয়েটিকে রাখা যায়নি। Continue reading

রোহিঙ্গা গণহত্যার মার্কিন স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার

মূল লেখক : ওয়াই ওয়াই নু
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা বলে সোমবার দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ স্বীকৃতি আমার এবং আরও অনেক রোহিঙ্গার জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এমন অবস্থায় কাটিয়েছি, যখন অনুভব করছিলাম, বিশ্ব থেকে যেন আমরা পরিত্যক্ত। বছরের পর বছর আমরা সাহায্যের আবেদন জানিয়েছি, কিন্তু এ আহ্বানে সাড়া পাইনি। আমরা যে সহিংসতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি এবং যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে; এর পরও বিশ্বের আচরণে আমরা ভাবছিলাম, বিশ্ব সম্প্রদায় বুঝি আমাদের অগ্রাহ্যের নীতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভয়ংকর সেসব ঘটনা স্মরণ আমাদের ফের ‘ট্রমা’য় ফেলছে। যখন বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের মানুষদের হত্যা করা হয়েছে, তখন অন্যরা কীভাবে তা অগ্রাহ্য করে থাকতে পারে? যখন হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে জোর করে আমাদের দেশ মিয়ানমার থেকে বের করে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারল! Continue reading

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ভারতের উভয় সংকট

মূল লেখক : শশী থারুর 
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধে ভারতের কৌশলগত দুর্বলতাসহ আরও কিছু বিষয় সামনে এসেছে। বিশ্বে দেশটির অবস্থান, তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘ মেয়াদে সম্পর্কের বিচক্ষণতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উঠছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর প্রতিবাদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ডাকা জরুরি অধিবেশনে নিন্দা প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল ভারত। প্রাথমিকভাবে ভোটের বিষয়ে ব্যাখ্যায় ভারত রাশিয়ার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি কিংবা এই আক্রমণে অনুতাপ বোধ করেনি। এমনকি ইউক্রেনের দুটি অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের স্বাধীনতায় রাশিয়ার স্বীকৃতির বিষয়েও ভারত কোনো টুঁ শব্দ করেনি।
যদিও আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইউক্রেনের এই সংকটের সমাধান করার আহ্বানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার ভারতের দীর্ঘদিনের নীতিরই চর্চা করেছেন। এ যুদ্ধে যখন মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, এমনকি ভারতের একজন শিক্ষার্থী রাশিয়ার গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং খারকিভে খাদ্য সংকটের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে, সে সময়ও মোদি সরকারের কোনো ধরনের সমালোচনা, নিন্দা ছাড়া কেবল শান্তির আলোচনা বেহুদা বৈকি।
ভারতের এই সংযমের গূঢ়ার্থ অনুধাবন করা কঠিন নয়। ভারতের অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামের অর্ধেকই জোগান দেয় রাশিয়া। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক চুক্তি তার চেয়েও বেশি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় থেকেই ক্রেমলিনের সঙ্গে ভারতের Continue reading

বই- রোহিঙ্গা সংকট : তৃতীয় নয়ন

রোহিঙ্গা সংকট : তৃতীয় নয়ন। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

রোহিঙ্গা সংকট : তৃতীয় নয়ন
অনুবাদ- মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশনী- ঐতিহ্য
প্রচ্ছদ- ধ্রুব এষ
প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২২
মলাট মূল্য- ১৬০ টাকা

রােহিঙ্গা সংকট : তৃতীয় নয়ন একটি অনুবাদ গ্রন্থ। এটি মাহফুজুর রহমান মানিকের প্রথম একক গ্রন্থ। বইটিতে স্থান পেয়েছে ১৬ টি লেখা। যা বিদেশী সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়। যাদের অধিকাংশই লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক। একটি লেখা রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার; প্রকাশ হয়ে কম্বোডিয়ার খেমার টাইমসে।
প্রকাশিত লেখাগুলোর মাধ্যমে যেমন রোহিঙ্গা সংকটের ঘটনা প্রবাহ জানা যাবে, তেমনি বাংলাদেশ কীভাবে এগিয়ে এসেছে তার স্বরূপ বোঝা যাবে। যেমন কয়েকটি লেখার শিরোনাম, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান রোহিঙ্গাদের জন্য দুঃসংবাদ, রোহিঙ্গাদের সমর্থনে জো বাইডেনের এগিয়ে আসা উচিত, বাংলাদেশ যেভাবে মিয়ানমারকে চাপে ফেলতে পারে, রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করুন,
রোহিঙ্গা সংকট: বিশ্বের লজ্জাজনক নীরবতা ইত্যাদি।

বইটির ভূমিকা লিখেছেন সমকালে সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মোজাম্মেল হোসেন (মঞ্জু)। বইটি বোঝার জন্য ভূমিকাটি গুরুত্বপূর্ণ। যার উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে পত্রস্থ হলো। Continue reading

ভাষার গৌরব বনাম নিরক্ষরতার লজ্জা

নিরক্ষরতা মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পথে বাধা হলেও সাক্ষরতা কার্যক্রম প্রকল্প ও দিবসে বন্দি হয়ে পড়েছে।

বিষয়টির চিন্তা আরও উস্কে দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. মজিবুর রহমানের সাম্প্রতিক এক ‘ফেসবুক স্ট্যাটাস’। আমার এ শিক্ষক যথার্থই লিখেছেন, ‘বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক হলেও সত্য, যে জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সৃষ্টি করেছে, সে জাতির কোটি কোটি মানুষ পড়তে ও লিখতে পারে না!’ এটা লজ্জারই বিষয়, যে বাংলা ভাষা আমাদের এত আবেগ-অনুভূতির জায়গা; দেশের অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ সে বাংলার আবেদন অনুধাবন করতে পারছে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ভাষিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দুটি মাধ্যম- পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে তারা বাংলা ব্যবহার করতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিষয়টি নিয়ে সব পর্যায়ে যে ধরনের সক্রিয়তার প্রয়োজন ছিল, তাও নেই। বাস্তবতা হলো, নিরক্ষরতা মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পথে বাধা হলেও সাক্ষরতা কার্যক্রম প্রকল্প ও দিবসে বন্দি হয়ে পড়েছে।
ভাষার মাসে সাক্ষরতার আলোচনা বইমেলার কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর বইমেলায় বাংলা ভাষায় যে হাজার হাজার বই প্রকাশ হয়; নিরক্ষর মানুষ সে বইয়ের অক্ষরগুলোর কাছে যেন অসহায়। বাংলার জ্ঞানভান্ডারের এত রস থেকে তারা বঞ্চিত। লেখকদের চিন্তার প্রতিফলন যে বইয়ের মাধ্যমে ঘটে; যে বইগুলো জাতিকে পথ প্রদর্শন করে; যে বই আলোর ইশারা দেয়- যারা পড়তে পারে না, সেগুলো তাদের জন্য যেন অন্ধকার। জাতি হিসেবে এ ব্যর্থতা আমাদেরই। দেশের অধিকাংশ নাগরিক যেখানে সাক্ষর; সেখানে একটি অংশ এতদিন ধরে আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আমাদেরই সদিচ্ছা এবং উদ্যোগের অভাবে! প্রতিদিন যে এত আয়োজন নিয়ে সংবাদপত্র প্রকাশ হয়; সাপ্তাহিক, মাসিক, ষাণ্মাসিক তথা মেয়াদভিত্তিক যে সাময়িকী প্রকাশ হয়; যারা পড়তে জানে না- এগুলো তাদের জন্য নিরর্থক কাগজ। এমনকি ফেসবুক বা মুখবইও তাদের পড়ার সুযোগ কই! বাস্তব জগতের বাইরে ভার্চুয়াল জগৎ যে মানুষের আরেকটি বিশাল জগৎ হয়ে পড়েছে; সেখানেও সবাই নিজ নিজ ভাব প্রকাশ করছে; নিরক্ষরতা তাদের সেখানে প্রবেশের পথেও সবচেয়ে বড় বাধা।
দেশে ঠিক কত কোটি মানুষ এখনও সাক্ষর নয়- তার হিসাব পেতেও আমাদের সাক্ষরতা দিবসের দিকে তাকাতে হয়। কারণ প্রশাসনের তরফ থেকে বলা চলে, ওই একটি দিনেই এ তথ্য জানানো হয়। গত বছর ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে আমরা দেখেছি, দেশে সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। সে হিসাবে এখনও দেশে অন্তত ৪ কোটি মানুষ নিরক্ষর। Continue reading

প্রযুক্তির মেলবন্ধন না ঘটলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ শঙ্কায়

সাক্ষাৎকার: জাকারিয়া স্বপন

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মাহফুজুর রহমান মানিক

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন বাংলাদেশের প্রথম অনলাইনভিত্তিক অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান ‘আইপে সিস্টেমস লিমিটেড’ ও বাংলা ভাষার জনপ্রিয় ওয়েবসাইট প্রিয় ডটকমের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে তিনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতক জাকারিয়া স্বপনের জন্ম ময়মনসিংহে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মাহফুজুর রহমান মানিক।

সমকাল: ‘মাতৃভাষা বাংলার সর্বস্তরে প্রচলন’- এর সঙ্গে ইন্টারনেটে বাংলার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

জাকারিয়া স্বপন: আমরা তো সবাই প্রত্যাশা করি, সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হোক। এই প্রত্যাশার আলোকে ইন্টারনেটে বাংলা প্রচলনের বিষয়টিও দেখার অবকাশ রয়েছে। ইন্টারনেটের ফলে বাংলা ভাষার ব্যবহার বেড়েছে। মানুষে মানুষে বেশি যোগাযোগ হচ্ছে। আর যোগাযোগের মূল মাধ্যম যেহেতু মাতৃভাষা, তাই এর ব্যবহারও বেড়েছে। ভাষা সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত নানাভাবে ভাষার রূপান্তর ঘটেছে। বর্তমানে ভাষা ব্যবহারের অন্যতম মাধ্যম হলো ইন্টারনেট। যেমন হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে আগে ইংরেজিতে কথোপকথন হতো। এখন সেখানে বাংলায় হচ্ছে।

সমকাল: তার মানে, ভাষা হিসেবে বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

জাকারিয়া স্বপন: ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনের অংশ। সুতরাং ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রশ্নে প্রযুক্তির ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। Continue reading