‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নিরক্ষর মানুষদের সাক্ষরতার কাজে নিয়োজিত করা যায়

আজকের সাক্ষরতা দিবসের প্রাক্কালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফে আমরা জানছি, দেশে বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ। এখনও প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। অর্থাৎ শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনে বাকি এ সংখ্যাটি। এর সঙ্গে আরেকটি হিসাবও জরুরি। এ জন্য একটু পেছনে ফিরতে হবে। ঠিক ১০ বছর আগে আমরা দেখেছি, তখন সরকার ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের অঙ্গীকার করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত জোরেশোরে এ প্রচারণা চলে। তখন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ওয়েবসাইট খুললেই লেখা উঠত- ‘উই আর কমিটেড টু এনশিউর হান্ড্রেড পার্সেন্ট লিটারেসি বাই টোয়েন্টিফোরটিন।’ কিন্তু ২০১২ সালের সাক্ষরতা দিবসের দু’দিন পর আমরা জানতে পারলাম- সে সময়ের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, ‘২০১৪ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের ঘোষণা থাকলেও সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা একটি ট্র্যাকে পৌঁছাতে চাই।’ হঠাৎ করে সম্ভব না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে আমি ওই সময় সাক্ষরতা দিবসে (৮ সেপ্টেম্বর ২০১২) সমকালেই লিখেছিলাম, ‘দুটি প্রকল্পের পোস্টমর্টেম এবং শতভাগ সাক্ষরতা’। সে সময় সরকার দুটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রথমটি ৬১ জেলার নিরক্ষরদের সাক্ষর করার জন্য, ব্যয় ২ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা আর অন্যটি এর বাইরের তিনটি পার্বত্য জেলার জন্য, ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি। সে সময় টাকার অভাব দেখিয়ে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করেনি সরকার। আর ওই দুটি প্রকল্প যখন বাতিল হলো, তখন শতভাগ সাক্ষরতার স্লোগানও শেষ হলো। তার মানে শতভাগ সাক্ষরতার স্লোগান ছিল প্রকল্পসর্বস্ব। আরও আশ্চর্যের বিষয়, সে সময় দুটি প্রকল্পের স্থানে গ্রহণ করা হয় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প। সেই প্রকল্পই মেয়াদ বাড়িয়ে এখনও চলছে। গত এক বছরে তার সুফল হলো সাক্ষরতার হার বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। এভাবে করে ২০১৪ সাল থেকে পিছিয়ে আসা ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ আমাদের কবে অর্জিত হবে? Continue reading

শিক্ষক যখন ‘মডেল’

সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অনন্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নানা সমস্যা ও চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও এখানকার শিক্ষকরা শিক্ষাদানসহ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা দায়িত্ব পালনে নিরলস ভূমিকা পালন করে আসছেন। দেশের অনেক মেধাবীও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আগ্রহী হচ্ছেন। এমনকি বিসিএসে উত্তীর্ণ নন-ক্যাডারদের অনেকে এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে একই জাতীয় বিদ্যালয়ের মধ্যেও আমরা মানের দিক থেকে আকাশ-পাতাল ফারাক দেখি। এ কারণেই আমরা দেখছি, সরকার ‘মডেল শিক্ষক’ পুল তৈরি করতে যাচ্ছে। ১৬ আগস্ট সমকালে এ ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। যেখানে বলা হচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষকদের নিয়ে মডেল শিক্ষক তৈরি করা হবে, যারা সংশ্নিষ্ট উপজেলার পিছিয়ে পড়া বিদ্যালয়গুলোর দুর্বল শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেবেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের গণিত ও ইংরেজিতে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

বলা বাহুল্য, বিদ্যালয়ের এই যে পিছিয়ে পড়া কিংবা এগিয়ে যাওয়া বিষয়টি নির্ধারিত হচ্ছে ফলের ওপর। এখন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা বা পিইসির কারণে কোন বিদ্যালয় কেমন ‘ফল’ করছে, তা সহজেই বোঝা যায়। কেবল ফলের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে পড়া নির্ধারণ করা কতটা যৌক্তিক। ফলের ওপর যখন এই এগোনো-পেছানোর ব্যাপারটা নির্ভরশীল, তখন এটি কেবল বিদ্যালয় বা শিক্ষার্থীর ব্যাপার। এখানে শিক্ষকদের যোগ্যতার প্রশ্নে এগোনো-পেছানোর ব্যাপার নেই। কারণ সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যোগ্যতা একই বলে আমরা মনে করি। মডেল শিক্ষক বিষয়টি বরং শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্যই তৈরি করবে। এটা হয়তো ঠিক, ওই যোগ্যতার মধ্যেও একই বিদ্যালয়ে অধিক শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক যেমন রয়েছেন, তেমনি কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকও রয়েছেন। এটা ভালো কিংবা খারাপ উভয় ফলধারী বিদ্যালয়ের জন্যই সমান। কেবল ‘ভালো’ ফলধারী বিদ্যালয় থেকেই ‘মডেল শিক্ষক’ গ্রহণ করলে একই শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ‘খারাপ’ ফলধারী বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দোষ কোথায়।

এই দুটি বৈষম্য সামনে রেখে যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘মডেল শিক্ষক’ তৈরির প্রকল্প নিচ্ছে, তখন মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য ‘সকল বিদ্যালয়ের মানের ইতিবাচক পরিবর্তন’ কীভাবে হাসিল হবে, তা বোধগম্য নয়। এমনকি এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতভেদও তৈরি হয়ে গেছে। খোদ প্রাথমিক বিদ্যালয়েরই অনেক শিক্ষক এর বিরোধিতা করছেন। মন্ত্রণালয় যে পদ্ধতিতে ‘মডেল শিক্ষক’ নির্বাচনের কথা বলছে, সে পদ্ধতিতে শিক্ষকদের মধ্যে যেমন দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে, তেমনি দুটি বিদ্যালয়েও পরস্পরের মধ্যে ঝামেলা তৈরি হতে পারে। বরং শিক্ষকদের ধারাবাহিক দু’তিন বছরের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মডেল শিক্ষক নির্বাচন করা যেতে পারে। এ রকম প্রত্যেক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বাছাই করে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজ নিজ বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য পাঠানোই যথেষ্ট হবে। Continue reading

গরুর গলায় বোমার বর্বরতা

নিরীহ প্রাণীটি জানে না কী বিপজ্জনক বোমা বয়ে বেড়াচ্ছে

কোরবানি এলে গৃহপালিত ও নিরীহ গরু কীভাবে উত্তাপ ছড়ায়, তা আমরা দেখে আসছি। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মীয় ও আঞ্চলিক বিষয় হিসেবে গরু এক অন্য মাত্রায় হাজির হয়। যদিও গরুর প্রতি বাঙালির রয়েছে অকৃত্রিম ভালোবাসা। শরৎচন্দ্রের মহেশ গল্পে গরুর প্রতি যে মমতা-দরদ প্রম্ফুটিত, তা এখনও বিদ্যমান। অথচ কোরবানির সময় গরুর এমন অনেক বিষয় হাজির হয়, যাতে আমরা অভ্যস্ত নই। এ কলামেই একবার আমি লিখেছিলাম ‘ভেজাল গরু!’। আর এখন যে বিষয় সামনে এসেছে, সেটি আরও ভয়ঙ্কর। রোববার সমকালের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম– ‘ভয় দেখাতে গরুর গলায় বোমা’। হ্যাঁ, একেবারে বোমা বাঁধা গরুর ছবিসহ সংবাদটি প্রকাশ হয়। ভারতীয় দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফে আরও দু’দিন আগেই খবরটি আসে। ভারত থেকে বাংলাদেশে পাচারের সময় নদীপথে গরু যাতে না আটকায়, সে জন্যই পাচারকারীদের এই ব্যবস্থা!
কী ভয়ঙ্কর ও ভয়াবহ কৌশল! নিরীহ প্রাণীটি জানে না কী বিপজ্জনক বোমা বয়ে বেড়াচ্ছে। পাচারকারীরা ভেবেছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বুঝি বোমা দেখে ভয় পেয়ে গরু ছেড়ে দেবে। ছাড়া পেয়ে ওপারের গরু এপারের চোরাকারবারিদের হাতে আপসে চলে আসবে। যদিও তা হয়নি। বিএসএফ সতর্কতার সঙ্গেই কয়েকটি গরু আটক করেছে। পাচারকারীরা কীভাবে এ কাজ করছে! এটি তো তাদের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে। Continue reading

সোনার ডিমপাড়া হাঁস

হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান যে বিমানের ঘাড়ে, সে বিমানের কর্মীরা কীভাবে ফ্রি টিকিটে দেশে-বিদেশে আরামে ঘোরেন?

কেউ কেউ ফ্রি পেলে নাকি আলকাতরাও খান। আলকাতরার বিষয়টি হয়তো অতিরঞ্জন। কিন্তু ছাড়- একটা কিনলে আরেকটা ফ্রি কিংবা সুযোগ পেলে মাগনা খাওয়া-নেওয়া ইত্যাদিতে যে আমরা অনেকেই সিদ্ধহস্ত, তা বলাই বাহুল্য। এ তো গেল বৈধ ফ্রির কথা। আবার অবৈধভাবে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা কৌশলেও ফ্রি খাওয়া বা নেওয়ার অপপ্রবণতা রয়েছে অনেকেরই। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিট নিয়ে এমনটিই ঘটেছে। মঙ্গলবার (২৩ জুলাই ২০১৯) সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম– ‘এত ফ্রি টিকিট পান বিমান কর্মীরা!’ কতটা পান? প্রতিবেদন বলছে, এক কর্মকর্তাই নিয়েছেন ৮৭টি টিকিট। আরেকজন ৬৮টি। পঞ্চাশের ঘরে আছেন অনেকেই। আরও নিচে তো আছেনই। তাদের অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে টিকিটগুলো পেয়েছেন। অনেকে নিজ নামের পাশাপাশি স্ত্রী-পরিজনের নামেও নিয়েছেন। ১০ বছরে প্রায় ৪৫ হাজার টিকিট নিয়ে তারা দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন। এর মধ্যে কেউ শতভাগ কমিশনে পেয়েছেন, অন্যরা পেয়েছেন ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কমিশন। কী সৌভাগ্য বিমান কর্মীদের! অথচ আমাদের এ রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা কেবল গত অর্থবছরেই লোকসান গুনেছে ২০১ কোটি টাকা। পবিত্র হজের ২ মাস ছাড়া প্রায় সারা বছরই বিমানকে লোকসান গুনতে হয়। এ বছরের এপ্রিলে সমকালে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- তেলেই ২ হাজার কোটি টাকা বাকি বিমানের। Continue reading

সামান্য সতর্কতা

অধিকাংশ রেলক্রসিং যখন অরক্ষিত তখন সচেনতাই পারে আমাদের রক্ষা করতে

সতর্কতা, সচেতনতা, কাণ্ডজ্ঞান, জীবনবোধ- এগুলোই ‘মানুষ’ হওয়ার মূল বিবেচ্য। অনেকে বলেন, মানুষ মানে যার মান ও হুঁশ দুটিই রয়েছে। এগুলো ছাড়া মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই অসম্পূর্ণ, ব্যক্তিত্বহীন কিংবা ভয়ঙ্কর। যার পরিণতিও ভয়াবহ। মঙ্গলবার সমকালের শেষ পাতায় প্রকাশিত ‘বিয়ের গাড়িতে ট্রেনের ধাক্কা, বর-কনেসহ নিহত ১০’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি তার অন্যতম উদাহরণ। সোমবার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের বলি হলো এ মানুষগুলো। অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ের জন্য রেল কর্তৃপক্ষের দায় অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এখানেও যে সতর্কতা ও সচেতনতার ব্যত্যয় ঘটেছে, তা অস্বীকারের জো নেই।

এটা ঠিক যে ঘটনাটি মর্মান্তিক, ট্র্যাজিক ও হৃদয়বিদারক। দুর্ঘটনায় যে কোনো মৃত্যুই আমাদের জন্য বেদনার। তারপরও কিছু ঘটনা দাগ কাটে। এ দুর্ঘটনায় বর-কনের মেহেদির রঙ শুকাবার আগেই উভয়ের মৃত্যু হলো। অথচ কিছুক্ষণ আগেই তাদের বন্ধন হলো; সুখী ও দীর্ঘস্থায়ী একটি দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন হয়তো তাদেরও ছিল। তাদের স্বপ্নের যেমন মৃত্যু হয়েছে; একই সঙ্গে বিয়ের যাত্রী হিসেবে দুই পরিবারের স্বজনরাই প্রধানত হতাহত হয়েছে। পরিবার দুটি এমন শোক কেমনে সইবে! Continue reading

পালাবদলের ঘুম!

ঢাবির হলগুলোর গণরুম যেন উদ্বাস্তু-শিবির

দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাত আসে বিশ্রামের জন্য। রাতের ঘুম আবার পরদিন কাজের শক্তি জোগায়। মানুষের বাঁচার জন্য তাই জরুরি বিষয়গুলোর মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। সুন্দর আবাসন, ভালো ঘুম মানুষকে প্রফুল্ল রাখে, কাজে মনোযোগী করে, জীবনবোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। ছাত্রজীবনের প্রধান কাজ পড়াশোনা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা, পড়াশোনা ও গবেষণার পরিবেশ নির্বিঘ্ন করতেই রয়েছে আবাসন ব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলার অন্যতম কারণ হলো যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক। সেখানে শিক্ষার্থীরা হলের সঙ্গে সংযুক্ত এবং তাদের আবাসন নিশ্চিত করা হয়। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করত। এখনও সব শিক্ষার্থী কোনো না কোনো হলের সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসন সুবিধা খুব কম। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হয়। আবাসিক হলগুলোতে যে আসন রয়েছে, তার তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী হলগুলোতে থাকছেন। ফলে সেখানে আবাসন সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। সে বিষয়টিই উঠে এসেছে সোমবার প্রকাশিত একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে। ‘পালা করে কেউ ঘুমায় রাতে, কেউ বা দিনে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্‌দীন হলের শিক্ষার্থীদের এমন দুর্দশা উঠে এলেও এটি আসলে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়েরই চিত্র। হলটিতে আবাসিক সুবিধা রয়েছে ৩৮৭ জনের। অথচ থাকছেন ১০০০ শিক্ষার্থী। সেখানে রয়েছে ১০টি গণরুম, যেখানে ৪ জনের রুমে থাকছেন ২০/২৫ জন শিক্ষার্থী। স্বাভাবিকভাবেই এসব কক্ষে রাতের বেলায় সবার একসঙ্গে ঘুমানো অসম্ভব। তাই তাদের ঘুমাতে হয় পালা করে। কেউ রাতে ঘুমান, কাউকে ঘুমাতে হয় দিনে। ফলে রাতে হয়তো কাউকে ঘুরেফিরে, বসে কিংবা কষ্ট করে পড়াশোনা করে কাটাতে হয়। একজন প্রতীক্ষায় থাকেন কখন তার সহপাঠী উঠবে, সেও একটু ঘুমাবে। Continue reading

পিচ রাস্তায় আঙুলের খোঁচা

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর একটি সড়কে আঙুলের খোঁচায় উঠে যাচ্ছে পিচ

পিচঢালা পথ কেমন? হয়তো সিসাঢালা প্রাচীরের মতো মজবুত নয়; কিন্তু অতটা শক্তও কি নয়? ইট-খোয়া বিটুমিনের তৈরি পিচ, এমন পিচের এক মাইল রাস্তা নির্মাণের জন্য নয় হাজার গ্যালন জ্বালানি খরচ করতে হয়; স্বাভাবিকভাবেই তা শক্ত ও মজবুত হওয়ার কথা। যে সড়কের ওপর দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহন যাতায়াত করলেও পিচের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকার কথা নয়; এমন মজবুত পিচ দিব্যি কয়েক মাস, এমনকি বছরও পার হয়ে যায়। অনেক সময় তাতে আঁচড়ও লাগে না। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন পিচের খবর সংবাদমাধ্যমে আসে, যে পিচঢালাইয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই উঠে যায়! এমনকি সে পিচ ওঠাতে তেমন কসরতও করতে হয় না, আঙুলের খোঁচাই যেন যথেষ্ট। ৩০ জুন সমকালে প্রকাশিত একটি সচিত্র প্রতিবেদন সে কথাই বলছে। ‘নির্মাণ শেষ হতেই উঠে যাচ্ছে সড়কের পিচ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর একটি সড়কের চিত্র উঠে এসেছে। যেখানে কাজ শেষ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কের পিচ মানুষের হাতের খোঁচায় উঠে যাওয়ার দৃশ্য দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। এ এক দুঃখজনক চিত্র।

এ চিত্র উপস্থাপনে খবর ও ছবি উভয় মিলে হয়তো পত্রিকার পাতায় অল্প জায়গাই যথেষ্ট; কিন্তু এর পেছনের ঘটনা অত ছোট নয়। স্বাভাবিকভাবেই কতগুলো বিষয় সামনে আসবে। প্রথমত, এক কোটি দুই লাখ টাকা বাজেটের সড়কটিতে সঠিকভাবে ঠিকাদার বাছাই করা হয়েছে কি-না; দ্বিতীয়ত, সড়কের কাজ সঠিকভাবে হয়েছে কি? তৃতীয়ত, পিচ তৈরিতে কেমন সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে! প্রতিবেদন বলছে, মাত্র ২১ জুন সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ হয়। এর মধ্যে ক’দিন যেতে না যেতেই আঙুলের খোঁচায় পিচ উঠে যাচ্ছে! স্বাভাবিকভাবেই ওপরের প্রশ্নগুলো আসছে। Continue reading

বাংলাদেশ যেভাবে মিয়ানমারকে চাপে ফেলতে পারে

মিয়ানমারকে অপরাধী রাষ্ট্র হিসেবে তার অপরাধের জন্য শাস্তিস্বরূপ অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে

মূল : মং জারনি

গত সপ্তাহে লন্ডনে একত্রিত হয়েছিলেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের ক্রিস সিডটি, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ও বাংলাদেশের একটি বিশেষজ্ঞ দল। ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারা আলোচনা করেন। এটা এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন মিয়ানমারকে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত রোহিঙ্গাদের আদিবাস সম্পর্কে ‘মিথ্যাচারের’ জন্য দায়ী করেন। যদিও বাংলাদেশ-মিয়ানমার গত বছরের অক্টোবরে প্রত্যাবাসনের একটি চুক্তি করে, কিন্তু জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়নি। প্রত্যাবাসনের জন্য সম্ভাব্য ৮০০ গ্রামের মধ্যে মাত্র দুটি গ্রামের পরিবেশ ইতিবাচক বলে জানা যায়।

আর সমস্যাটা এখানেই। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এত বেশি রোহিঙ্গার উপস্থিতি সাধারণ কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালামের মত, চাহিদার (রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বার্ষিক পরিকল্পনা ৯২০ মিলিয়ন ডলার) মাত্র ২২ শতাংশ মিটেছে। মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় ও খাবারের বন্দোবস্ত করা বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশের জন্য বোঝাস্বরূপ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যাপ্ত সাহায্য ছাড়া কেবল ঢাকার এ শরণার্থীর বোঝা বহন করা অন্যায্য।

অধিকন্তু, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থাকরণ প্রকারান্তরে মিয়ানমারের গণহত্যাকেই স্বীকৃতি দেবে। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমারের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল নে উইনের সময়কালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পিত প্রচার শুরু করা হয়। এর পর তারা মিয়ানমারে রাখাইনের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে নৃশংস ও সন্ত্রাসী প্রচারণায় অংশ নেয়। নে উইন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারের পরবর্তী শাসনগুলোতে সামরিক কিংবা বেসামরিক উভয় আমলে সবাই একই পথে হাঁটে। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত নিপীড়নকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে।
Continue reading

পরীক্ষার ফ্রেমে আবদ্ধ শিক্ষার মান!

শিক্ষায় মান গেল বলে আমাদের চিন্তার অন্ত নেই। মানসম্পন্ন কিংবা গুণগত শিক্ষা আমরা খুঁজছি। শনিবার (২২ জুন ২০১৯) সমকালের একটি প্রতিবেদন তার অন্যতম প্রমাণ। যার শিরোনাম- স্কুল-কলেজ হাজার হাজার, মান কই। মান নিয়ে প্রশ্ন, কিন্তু মানটা আসলে কী? মানের অবয়ব নেই, একে ধরাছোঁয়া যায় না। অথচ আমরা সেটাকে ধরতে চাইছি, কিছু সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করছি। একটা প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি জিপিএ ৫ পেল। আমরা ধরেই নিই, প্রতিষ্ঠানটির বুঝি মান খুব বেড়ে গেল। কিংবা কোনো শিক্ষার্থী ভালো রেজাল্ট করলে আমরা ভাবি, শিক্ষার্থীর মান ভালো। কিন্তু আমাদের ভাবনায় ছেদ পড়ে, যখন জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সাধারণ বিষয়টিও বুঝতে অক্ষম। আমরা সেটা টের পেয়ে ছি ছি করি। আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিতেই গলদ রয়েছে, সেটা অনেকেই বলেছেন। ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ সমকালেই (৮ মে ২০১৯) তার ‘শিক্ষায় মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং গুণগত মান’ শিরোনামের লেখায়ও তা তুলে ধরেছেন। আবার মান যে কেবল পরীক্ষার ওপরই নির্ভরশীল নয়, সেটাও বুঝতে হবে।

মানের বিষয়টি যখন আমরা পরীক্ষার ফ্রেমে আবদ্ধ করে ফেলেছি, তখন পরীক্ষাই হয়ে উঠল শিক্ষার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। শিক্ষকরা শেখান পরীক্ষায় পাসের জন্য; শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য। এর সঙ্গে যুক্ত হলো কোচিং সেন্টারের টেকনিক, যুক্ত হলো নোট-গাইড। প্রশ্ন পদ্ধতি সৃজনশীল হলো, নোট-গাইডও সৃজনশীল হয়ে উঠল। এভাবেই জয় হলো পরীক্ষার। বাড়ল পরীক্ষা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পাবলিক পরীক্ষা শুরু হলো। পরীক্ষায় পাসের হার কিংবা জিপিএ ৫- সংখ্যায় সবারই উন্নতি ঘটল। রইল বাকি- মান।

তাহলে মানটা কী? Continue reading

স্যালুট চাকা!

প্রায় ১০ বছর আগে মার্কিন সাময়িকী স্মিথস অনিয়ানে ‘অ্যা স্যালুট টু দ্য হুইল’ শিরোনামে একটি ফিচার প্রকাশ হয়। সেখানে লেখক মেগান গাম্বিনো চাকাকে স্যালুট জানিয়েছেন। এই স্যালুট একেবারে সাদামাটা অর্থে কোনো অভিবাদন নয়, এর গোড়া আরও গভীরে।
সৈয়দ শামসুল হক ২০১২ সালে কালের খেয়ায় ধারাবাহিক এক উপন্যাস লেখেন, যার শিরোনাম- ‘কেরানীও দৌড়ে ছিল’। উপন্যাসের বিষয় যা-ই হোক, তিনি দেখিয়েছেন, কেরানি তো বটেই, আসলে আমরা সবাই দৌড়াচ্ছি। জীবনযাপনের জন্য সবাইকে দৌড়াতে হয়। জীবনের এ দৌড় শুধু দু’পায়ে হয় না, বরং সময়ের যত আধুনিক ও দ্রুতযান আছে সবই অন্তর্ভুক্ত। আর যখনই যানবাহনের কথা আসছে তখনই হাজির চাকা। আজ চাকা ছাড়া জীবনের কোনো গতিই নেই।

চাকা আবিস্কার
বলাবাহুল্য, মানবসভ্যতার ইতিহাসে চাকার আবিস্কার একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তবে কোথায় কখন এ চাকা আবিস্কার হয়, তার অকাট্য প্রমাণ নেই বললেই চলে। ফলে এ আবিস্কার নিয়ে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। অবশ্য বিশেষজ্ঞ অনেকেই মনে করেন, যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৫০০০ বছর আগে তথা আজ থেকে ৭০০০ বছরেরও বেশি আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাকের একটি সভ্যতা) চাকা আবিস্কৃত হয়। ককেশাসের উত্তর দিকে বেশকিছু কবর পাওয়া গেছে, যাতে ৩৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ঠেলাগাড়িতে করে মৃতদেহ কবর দেওয়া হতো। ৩৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে তৈরি করা একটি মাটির পাত্র দক্ষিণ পোল্যান্ডে পাওয়া গেছে, যাতে চার চাকার একটি গাড়ির ছবি আছে। এটিই এ পর্যন্ত প্রাপ্ত চাকাযুক্ত গাড়ির ছবির সবচেয়ে পুরনো নিদর্শন বা চিহ্ন। মনে করা হয়, গাছের গোল গুঁড়ি গড়িয়ে যেতে দেখে চাকার ধারণা আসে মানুষের মাথায়। তারা গুঁড়িটি পাতলা করে কেটে তার মাঝখানে ছিদ্র করে লাঠির মতো কিছু দিয়ে চাকতি দুটিকে যুক্ত করেছে। আর তাতেই তৈরি হয়েছে আদিম গাড়ি। ওই গাড়ির সঙ্গে বর্তমানের গরুর গাড়ির কিছুটা মিল থাকতে পারে। পরে নানাভাবে চাকার বিবর্তন হয়েছে। কাঠের চাকা দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়া এবং ফেটে যাওয়ায় এতে লোহার পাতলা পাত লাগানো হয়। একপর্যায়ে পাতের জায়গা দখল করে পাতলা রাবার। সর্বশেষ রাবারের চাকা ও টিউব আবিস্কৃত হয়।
Continue reading