Category Archives: শিক্ষাঙ্গন

শিক্ষার্থীর সুযোগ সংকোচন কেন

শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা করোনা দুর্যোগে সৃষ্ট প্রভাব অটোপাস-অ্যাসাইনমেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে কোনো রকম কাটিয়ে উঠতে পারলেও উচ্চশিক্ষা এখনও বলা চলে পিছিয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল স্নম্নাতক শেষ বর্ষ ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষা সম্পন্নের আয়োজন করছে। অন্যান্য বর্ষের ব্যাপারে প্রশাসন এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এ সপ্তাহের মধ্যেই উচ্চ মাধ্যমিকের (অটোপাসের) ফল প্রকাশ হবে। এরপরই উচ্চশিক্ষায় ভর্তির তোড়জোড় শুরু হবে। ভর্তির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবশ্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তিতে সম্মত হয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়- ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আগে থেকেই স্বতন্ত্রভাবে পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলেছে। সবাই গুচ্ছ পদ্ধতিতে এলে অন্তত করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতো। তারপরও অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এ পদ্ধতিতে যাচ্ছে- এটা ভালো বিষয়। কিন্তু স্বস্তি মিলছে না; বিভাগ পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে।

করোনা থেকে সুরক্ষা দিতে প্রশাসন পরীক্ষা কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে শিক্ষার্থীরা দুর্যোগ উপেক্ষা করেই মাঠে নেমেছে? আগে এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য তথা বিজ্ঞান বিভাগ, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থীরা নিজস্ব বিভাগে ভর্তি হতে না পারলেও বিভাগ পরিবর্তনের নির্দিষ্ট ইউনিটে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শর্তসাপেক্ষে অন্য বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ ছিল। এ বছর গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এ রকম পৃথক কোনো ইউনিট রাখা হয়নি। ভর্তিচ্ছুরা বিভাগ পরিবর্তনের জন্য আলাদা পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছে। এই দাবিতে রাজধানী ঢাকা, বরিশাল শহরসহ বেশ কিছু জায়গায় তারা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। Continue reading

ভর্তিতে শিক্ষার্থীর করোনাভাগ্য!

দুর্যোগের মধ্যেও শিশুদের একটি চাপমুক্ত ও স্বস্তির বছর শিক্ষার্থীর করোনা ভাগ্য বৈকি

শিশুদের স্কুলে লটারির মাধ্যমে ভর্তির বিষয়টি ২০১০-১১ সালের পর আবার আলোচনায় এসেছে। ২০১১ সালে সমকালেই লিখেছিলাম ‘ভাগ্যই বিজয়ী হোক‘। এবার করোনার সময় যখন লটারির পরিধি বাড়ছে, অর্থাৎ এতদিন কেবল প্রথম শ্রেণিতেই ছিল, এখন নবম পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে লটারি হলেও বিজয়টা করোনার নয় বরং ভাগ্যেরই। এ সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে খুশি হয়েছেন, আবার অনেক অভিভাবকই মন খারাপ করেছেন। লটারি যেখানে ভাগ্যের বিষয়, সেখানে ‘প্রত্যাশিত’ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারার বেদনা কাউকে না কাউকে তো সইতে হবেই। প্রশ্ন হলো, প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান কোনগুলো? তার আগে বলা দরকার, শিক্ষামন্ত্রী এ-বিষয়ক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন : ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ বা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকা। আমি মনে করি, প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান আর ক্যাচমেন্ট এরিয়া- এই দুটি জটিলতা নিরসনের ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে স্কুলে ভর্তি সমস্যার সমাধান।

প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান মানে সবাই ভালো ফল অর্জনকারী নামিদামি প্রতিষ্ঠানই বুঝে থাকেন। ওই সব প্রতিষ্ঠানে সন্তানের ভর্তি অনেকের কাছে সামাজিকভাবে সম্মানেরও বিষয়। সেগুলোতে অভিভাবকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ১০ বছর আগেও যখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হতো, আমরা তখন কী এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখেছিলাম। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিশুর স্বাভাবিক খেলাধুলা বাদ দিয়ে বই-খাতা-কলম নিয়ে বসে থাকা আর টিউটর-কোচিং সেন্টারে দৌড়ঝাঁপ করতে হতো। এমনকি কোনো কোনো অভিভাবক অন্য প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলেও সন্তান নামিদামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সেখানে প্রথম শ্রেণিতেই ভর্তি করিয়ে দিতেন!

প্রথম শ্রেণির ভর্তিতে লটারির প্রচলন করায় অন্তত শিশুরা কিছুটা হলে স্বস্তি পেলেও তা থেকে একেবারে মুক্তি মেলেনি। কারণ দ্বিতীয় শ্রেণি থেকেই আবার সেই ভর্তি পরীক্ষা। Continue reading

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনই খুলে দেওয়া সংগত হবে না-রাশেদা কে চৌধুরী

সাক্ষাৎকার

রাশেদা কে চৌধুরী গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক। ২০০৮ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। রাশেদা কে চৌধুরীর জন্ম ১৯৫১ সালে সিলেটে। শিক্ষায় করোনা দুর্যোগের প্রভাব নিয়ে তিনি সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন

সমকাল :করোনায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তোড়জোড় আমরা দেখছি। বাংলাদেশের জন্য এটি কি যথোপযুক্ত সময়?

রাশেদা কে চৌধুরী :করোনার কারণে পৃথিবীর অনেক দেশেই এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ১৬০ কোটি শিক্ষার্থীর ওপর এ মহামারির প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমাদের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী ১৮ মার্চ থেকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ আমরা দেখছি। এসব বিষয় নিয়ে প্রশাসনিকভাবে আলোচনা হচ্ছে। তারাও চিন্তাভাবনা করছেন খুলে দেওয়া যায় কিনা। স্কুুল খোলার পরিকল্পনার বিষয়টি গণমাধ্যমেও ক্রমাগত আসছে। তবে এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সংগত হবে বলে আমি মনে করি না। করোনা পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এটা যথোপযুক্ত সময় নয়। করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে শনাক্তের হার এখনও বিশ শতাংশের মতো। ফলে শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে ফেলা ঠিক হবে না। করোনায় সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথাই বলছেন। হ্যাঁ, খোলার সময় আসবে। আমরা যখন দেখব করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসছে, তখন খোলার চিন্তা করতে হবে।

সমকাল :শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পূর্বপ্রস্তুতি কতটা জরুরি? Continue reading

খোলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটা প্রস্তুত?

মাস্ক ব্যবহার, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্তকরণ কিংবা শরীরের তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থাপনা থাকা জরুরি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রস্তুতির পরিসর আরও বিস্তৃত

অধিকাংশ দেশেই করোনা সংক্রমণের কারণে বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করেছে। সংক্রমণের মাত্রা অনুযায়ী কোথাও বেশি সময়, আবার কোথাও অল্প সময় শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যেমন ডেনমার্কে ১১ মার্চ বন্ধ হওয়া স্কুল খুলেছে ২০ এপ্রিল। আর আমাদের ১৬ মার্চে বন্ধ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী মাসের ৭ তারিখ। করোনা সংক্রমণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আরও পেছাতে পারে। তবে আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখনই খুলবে, তার আগে আমাদের কিছু প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। তার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত?
প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যেসব দেশ ইতোমধ্যে স্কুল খুলেছে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। ২ জুলাই ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ানে ‘ব্যাক টু স্কুল : হোয়াট ক্যান পিউপিলস ইন ইংল্যান্ড এক্সপেক্ট ফ্রম সেপ্টেম্বর?’ অর্থাৎ স্কুল খোলার ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা সেপ্টেম্বর থেকে কী আশা করতে পারে? শিরোনামের প্রতিবেদনে করোনা-পরবর্তী সেখানকার বিদ্যালয় খোলার নির্দেশনার বিস্তারিত এসেছে। জুন মাসের শুরু থেকেই সেখানে স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে। জুন মাসের খোলাটা ছিল আংশিক। এতদিন কেউ চাইলে তার সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়েও থাকতে পারত, তাদের জন্য বিকল্প অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা। কানাডাসহ অনেক দেশই এই শিথিলতা অনুমোদন দিয়েছে। কানাডা প্রবাসী তামান্না কলিম দ্যুতি জানিয়েছেন, জুনে সেখানেও স্কুল খুলেছে। মাসখানেক শ্রেণি কার্যক্রম চললেও তিনি তার মেয়েকে তখন স্কুলে পাঠাননি। গ্রীষ্ফ্মকালীন ছুটি কাটিয়ে সেপ্টেম্বরে আবার স্কুল খুললে তখন পাঠাতে নিরাপদ বোধ করবেন। আবার দক্ষিণ কোরিয়াসহ কিছু দেশে আগে বড়দের, তারপর ছোটদের এভাবে স্কুল খুলেছে। এতদিন যা-ই হয়েছে ইংল্যান্ডে কিন্তু সেপ্টেম্বর থেকে সশরীরে স্কুল করা বাধ্যতামূলক করেছে। কেউ স্কুলে না গেলে তার জন্য জরিমানার কথাও বলা হয়েছে। Continue reading

করোনার দিনগুলোতে ‘শিক্ষা’​

বাচ্চাদের পড়াশোনার মূল দায়িত্বটা কিন্তু নিতে হবে মা-বাবা/অভিভাবককে

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ ও তা থেকে সুরক্ষায় ‘ঘরে থাকা’ নিশ্চিত করতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল বাংলাদেশে বন্ধ হয়নি; বরং দেড় শতাধিক দেশের অবস্থাও তথৈবচ। তবে ১৬ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর ছুটি পেয়ে অনেকেই ‘বদ্ধ ঘরে’ না থেকে ‘জগৎ’ দেখার আশায় কক্সবাজারসহ নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। এমনকি অনেক শিক্ষকও এ ‘সুযোগ’ হাতছাড়া করেননি। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর, প্রশাসনের তরফ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ প্রবণতা কমেছে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আর এখন তো চলছে দেশব্যাপী ‘লকডাউন’। সংক্রামক ব্যাধি করোনা থেকে বাঁচতে কেবল ঘরে থাকাই যথেষ্ট নয় বরং আরও কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়াসহ বেশকিছু নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও মোবাইলে খুদেবার্তার মাধ্যমেও সতর্ক থাকার বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত জানছেন শিক্ষার্থী ও তার পরিবার।

সরকারের ঘোষণায় প্রথমে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কথা বলা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ৯ এপ্রিলের পরই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে- এ সম্ভাবনা রয়েছে সামান্যই। এমনকি এপ্রিলের প্রথম দিন থেকে অনুষ্ঠিতব্য চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা ইতোমধ্যে পেছানো হয়েছে। কথা হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি যদি আরও বাড়ে তাতে শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় বিরতি দীর্ঘ হয়ে যাবে। শিক্ষাবর্ষের এক-তৃতীয়াংশ এখনই পার হয়ে গেছে। নানা পরীক্ষার তারিখ থাকলেও পেছাচ্ছে। এ অবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা উপায়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে দেশ-বিদেশে। Continue reading

শিক্ষায় বড় তিন পরিবর্তন- তিনটি ছোট প্রশ্ন

তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেই, পঞ্চম শ্রেণিতে সমাপনী কেন

শিক্ষাব্যবস্থায় ‘ব্যাপক’ পরিবর্তন আসছে বলে আমরা সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম থেকে জানছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে পরিবর্তন যেমন ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে, তেমনি নেতিবাচকও হতে পারে। পরিবর্তন যাতে ইতিবাচক হয় সেটাই কাম্য। সে প্রত্যাশায় আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা- প্রতিটি স্তরেই যে বড় পরিবর্তন আসছে, তা নিয়ে আমি আগাম তিনটি ছোট প্রশ্ন রাখতে চাই।

তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেই, পঞ্চম শ্রেণিতে সমাপনী কেন : শিক্ষাব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের কথা আমরা শুনছি, এর মধ্যে সবচেয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া। শিশুদের সুন্দর, সুষম ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বিকাশে এটি সত্যিই জরুরি। পরীক্ষা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। ছোটবেলা থেকেই যেভাবে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার চাপে পিষ্ট, যেভাবে শিশু ও অভিভাবকের মধ্যে পরীক্ষায় ‘ভালো ফল’-এর জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা চালু রয়েছে; যেভাবে শিশুরা কোচিং-প্রাইভেট টিউটরের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে, তা থেকে নিস্কৃতি পেতে পরীক্ষা বাদ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের মতো শিশুদের পরীক্ষা উঠিয়ে দিয়ে আনন্দদায়ক পরিবেশে শিক্ষার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা হয়তো ঠিক; সিঙ্গাপুর-ফিনল্যান্ডের মতো পরিবেশ-পরিস্থতি আমাদের নেই। আমরা জানি, ফিনল্যান্ডে শিশুদের ১৬ বছর পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই নেই। আমরা তাদেরটা পুরোপুরি না হোক, কিছু তো অনুসরণ করতে পারি। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া যতটা উপকারী; পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী ততটাই অপকারী। Continue reading

অধ্যক্ষ বড় বাঁচা বেঁচেছেন…

অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলার ঘটনায় রাস্তায় নেমেছেন রাজশাহী পলিটেকনিকের শিক্ষকবৃন্দ

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বড় বাঁচা বেঁচেছেন। সাঁতার জানায় তিনি প্রাণে বেঁচেছেন, এটা তার সৌভাগ্য। কিন্তু এ বাঁচা তো আসলে ‘বাঁচা’ নয়। একজন শিক্ষক হিসেবে তার জন্য এর চেয়ে বড় অপমানের বিষয় আর কী হতে পারে। তারই শিক্ষার্থী দ্বারা তিনি নিগৃহীত হয়েছেন। আসলে এটি তার নয়, আমাদেরই অপমান। লজ্জায় আমাদের মাথা নুইয়ে আসে। এ সমাজ বরাবরই শিক্ষকের সম্মান বজায় রাখতে ব্যর্থ। পুলিশের হাতে শিক্ষক মার খান রাজপথে, ক্যাম্পাসে ছাত্রের হাত থেকেও নিস্তার নেই! আমরা দেখেছি, এ বছরেরই মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে বাধা দেওয়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হন শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. মাসুদুর রহমান। এভাবে উদাহরণের শেষ নেই। রাজশাহীর ঘটনাটি এরই যেন পুনরাবৃত্তি।

রাজশাহী পলিটেকনিকের অধ্যক্ষকে যেভাবে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী টেনেহিঁচড়ে পুকুরে ফেলেছে, তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে আমরা হতবাক হয়েছি। কতটা বেপরোয়া হলে অন্যায় আবদারের কাছে নতিস্বীকার না করায় একজন শিক্ষকের সঙ্গে এমন ন্যক্কারজনক আচরণ করা সম্ভব? ঘটনাটি যে কারণে ঘটেছে, তাতে আমাদের বিস্ময় আরও বেড়েছে। একজন অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। সঙ্গত কারণেই অধ্যক্ষ শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপস্থিতি না থাকায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না দিয়ে তাদের অভিভাবকসহ বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। সংবাদমাধ্যমসূত্রে আমরা জেনেছি, ঘটনার দিন (২ নভেম্বর) সকালে তাদের মধ্যে অন্যতম কামাল হোসেন সৌরভ, যিনি মিডটার্ম পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন এবং শ্রেণিকক্ষেও তার প্রয়োজনীয় উপস্থিতি নেই। তবে তার পরিচয় তিনি রাজশাহী পলিটেকনিক শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক। Continue reading

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস ও আমাদের দায়ভার

কার্জন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবেই নয় বরং নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। জ্ঞানচর্চার বাইরেও ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অন্যায়ের প্রতিবাদের কেন্দ্র হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি যেভাবে ভূমিকা পালন করে আসছে তাতে দেশের মানুষের স্বপ্ন জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যখনই খারাপ কিছু ঘটে আমরা ব্যথিত হই।  নানাদিক থেকেই অতীতের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অবনতি’ দেখেন। সেটা ধরেও বলা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর গৌরব, গরিমা, ঐতিহ্য, দাপট এখনও অটুট, অক্ষুণ্ন। তবে সম্প্রতি তাতে চির ধরেছে সে মন্তব্য করাও অমূলক নয়।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির ঘ ইউনিটের ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিবাদের প্রতীক তার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ হয়েছে, এখনও হচ্ছে। প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন’স কমিটির সভায় আবারও ঘ ইউনিটের পরীক্ষার সিদ্ধান্ত  হয়। কিন্তু জটিলতা এখনও কাটেনি, কারণ যতটুটু জানা যাচ্ছে, আগের পরীক্ষায় পাসকৃত কেবল ১৮ হাজার শিক্ষার্থীরই পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাতে বাদ পড়বে ৫৭ হাজার শিক্ষার্থী। তবে ঘটনা যা-ই ঘটুক ডিন কমিটির এ সিদ্ধান্তে এটাই স্পষ্ট যে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন ফাঁস স্বীকার করেছে এবং আমলে নিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়েছেন। এটা খুবই লজ্জার, যখন আমরা দেখলাম ১২ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পরেও ফল প্রকাশ করা হয়। প্রথমে পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত, তদন্ত কমিটি গঠনসহ কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতেই ফল ঘোষণা করা হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, এবার ৯ টা ১৭ মিনিটে ফাঁস হয়েছে; ক্রমান্বয়ে ক্লোজ ফ্রেমে নিয়ে আসবেন।

ফল ঘোষণার সিদ্ধান্ত কেউ মেনে নিতে পারেনি। সবাই দাবি করেছিলো- ঘ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা ও ঘোষিত ফল বাতিল করতে হবে, প্রশ্নফাঁসে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার এবং ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষায় দায়িত্বরত সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগ করতে হবে। Continue reading

স্বপ্ন ফেরি করা লাল বাস

অপেক্ষা লাল বাসের জন্য। প্রতীক্ষাটা কত সময়ের? ক্লাস শেষ, বাস আসবে, সবাই হুড়মুড়িয়ে উঠবে। পাঁচ-দশ মিনিট কিংবা আধা ঘণ্টা। না! ‘লাল বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে ফেসবুক পেজে একজন লিখেছেন- ‘৬ মাস ধরে ডিইউতে [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে] বসবাস করছি; লাল বাসে চড়ার ইচ্ছাটা কবে যে পূরণ হবে…।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার পরও হয়তো নানা কারণে তার লাল বাসে চড়ার সুযোগ হয়নি। তিনি এখনও সুযোগের অপেক্ষায়। তার অপেক্ষা মাত্র ছয় মাসের। কারও অপেক্ষা তো ১৯-২০ বছরের! একজন লিখেছেন, ১০টি কারণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার প্রথমটিই- লাল বাস।
লাল বাসের কী এমন মাহাত্ম্য যেটা স্বপ্ন হতে পারে? ঢাকার বুক চিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসগুলো কেবল দাপিয়েই বেড়ায় না, শিক্ষার্থী পরিবহনই করে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজই করে না; বরং স্বপ্নও ফেরি করে বেড়ায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অলঙ্কৃৃত ক্ষণিকা, চৈতালি, বৈশাখী-বসন্ত, উয়ারী-বটেশ্বর, হেমন্তসহ একঝাঁক লাল বাস যখন ঢাকার রাস্তায় চলে, তখন হাজার হাজার কিশোর-কিশোরীর মনে স্বপ্ন জাগায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রেরণা দেয়।
চোখ-ধাঁধানো লাল রঙের বাস দেখার পর হয়তো তা অনেকক্ষণ মানসপটে ভেসে থাকে। বাসের রঙ লাল হওয়ার বিশেষত্ব কি এখানেই? Continue reading

‘উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি’

এভাবে কোনো সন্তানের সঙ্গে আচরণ করা উচিত নয়

মা শিশুসন্তানকে পড়াচ্ছেন ওয়ান, টু, থ্রি…। মেয়ে বারবার ভুল করছে আর মায়ের হাতে মার খাচ্ছে। এমনি এক ভিডিও দেখে যে কারও ছোট্ট মেয়েটির জন্য মায়া লাগবে। আর মাকে মনে হবে অত্যাচারী। যে কি-না শিশুটির করুণ আর্তনাদ ও শাস্তি থেকে বাঁচার আবদার সত্ত্বেও তাকে রেহাই দিচ্ছে না, তার হুঙ্কার ও হাত সমানভাবেই চলছে। ভারতের এ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল, যা তারকা খেলোয়াড় বিরাট কোহলি, যুবরাজ সিংসহ অনেকেই শেয়ার করেছেন। তারা বলছেন, এভাবে কোনো সন্তানের সঙ্গে আচরণ করা উচিত নয়। ২৫ আগস্ট ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগে ‘একেই বলে শিক্ষা দেওয়া_ নাকি শিক্ষা পাওয়া?’ শিরোনামে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপা হয়। যার শুরুটা এ রকম_ ‘তিন কি চার বছরের একটি মেয়ে ইংরেজি ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর আওড়াতে গিয়ে মায়ের কাছে বকা ও শেষ পর্যন্ত চড় খাচ্ছে। এক মিনিট ৯ সেকেন্ডের একটি খাঁটি উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি।’
সত্যিই উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি বটে। পড়াতে গিয়ে শিশুদের মারা আমাদের দেশে অনেক পরিবারেই সাধারণ ঘটনা। পরিবারের বাইরেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের মেরে পড়ানো স্বাভাবিক বিষয়। বহু বছর বেত, লাঠি ইত্যাদি এখানকার শিক্ষকদের শিক্ষার্থী ‘শায়েস্তা’ করার অন্যতম অস্ত্র ছিল। কখনও কখনও চড়-থাপ্পড়ের মাধ্যমে হাতও অস্ত্র। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ রয়েছে, সরকারের নির্দেশনা রয়েছে; শিক্ষা আইনেও একে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপরও কিন্তু তা থেমে নেই। Continue reading