Category Archives: শিক্ষাঙ্গন

করোনার দিনগুলোতে ‘শিক্ষা’​

বাচ্চাদের পড়াশোনার মূল দায়িত্বটা কিন্তু নিতে হবে মা-বাবা/অভিভাবককে

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ ও তা থেকে সুরক্ষায় ‘ঘরে থাকা’ নিশ্চিত করতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল বাংলাদেশে বন্ধ হয়নি; বরং দেড় শতাধিক দেশের অবস্থাও তথৈবচ। তবে ১৬ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর ছুটি পেয়ে অনেকেই ‘বদ্ধ ঘরে’ না থেকে ‘জগৎ’ দেখার আশায় কক্সবাজারসহ নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। এমনকি অনেক শিক্ষকও এ ‘সুযোগ’ হাতছাড়া করেননি। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর, প্রশাসনের তরফ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ প্রবণতা কমেছে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আর এখন তো চলছে দেশব্যাপী ‘লকডাউন’। সংক্রামক ব্যাধি করোনা থেকে বাঁচতে কেবল ঘরে থাকাই যথেষ্ট নয় বরং আরও কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়াসহ বেশকিছু নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও মোবাইলে খুদেবার্তার মাধ্যমেও সতর্ক থাকার বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত জানছেন শিক্ষার্থী ও তার পরিবার।

সরকারের ঘোষণায় প্রথমে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কথা বলা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ৯ এপ্রিলের পরই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে- এ সম্ভাবনা রয়েছে সামান্যই। এমনকি এপ্রিলের প্রথম দিন থেকে অনুষ্ঠিতব্য চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা ইতোমধ্যে পেছানো হয়েছে। কথা হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি যদি আরও বাড়ে তাতে শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় বিরতি দীর্ঘ হয়ে যাবে। শিক্ষাবর্ষের এক-তৃতীয়াংশ এখনই পার হয়ে গেছে। নানা পরীক্ষার তারিখ থাকলেও পেছাচ্ছে। এ অবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা উপায়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে দেশ-বিদেশে। Continue reading

শিক্ষায় বড় তিন পরিবর্তন- তিনটি ছোট প্রশ্ন

তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেই, পঞ্চম শ্রেণিতে সমাপনী কেন

শিক্ষাব্যবস্থায় ‘ব্যাপক’ পরিবর্তন আসছে বলে আমরা সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম থেকে জানছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে পরিবর্তন যেমন ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে, তেমনি নেতিবাচকও হতে পারে। পরিবর্তন যাতে ইতিবাচক হয় সেটাই কাম্য। সে প্রত্যাশায় আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা- প্রতিটি স্তরেই যে বড় পরিবর্তন আসছে, তা নিয়ে আমি আগাম তিনটি ছোট প্রশ্ন রাখতে চাই।

তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেই, পঞ্চম শ্রেণিতে সমাপনী কেন : শিক্ষাব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের কথা আমরা শুনছি, এর মধ্যে সবচেয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া। শিশুদের সুন্দর, সুষম ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বিকাশে এটি সত্যিই জরুরি। পরীক্ষা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। ছোটবেলা থেকেই যেভাবে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার চাপে পিষ্ট, যেভাবে শিশু ও অভিভাবকের মধ্যে পরীক্ষায় ‘ভালো ফল’-এর জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা চালু রয়েছে; যেভাবে শিশুরা কোচিং-প্রাইভেট টিউটরের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে, তা থেকে নিস্কৃতি পেতে পরীক্ষা বাদ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের মতো শিশুদের পরীক্ষা উঠিয়ে দিয়ে আনন্দদায়ক পরিবেশে শিক্ষার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা হয়তো ঠিক; সিঙ্গাপুর-ফিনল্যান্ডের মতো পরিবেশ-পরিস্থতি আমাদের নেই। আমরা জানি, ফিনল্যান্ডে শিশুদের ১৬ বছর পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই নেই। আমরা তাদেরটা পুরোপুরি না হোক, কিছু তো অনুসরণ করতে পারি। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া যতটা উপকারী; পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী ততটাই অপকারী। Continue reading

অধ্যক্ষ বড় বাঁচা বেঁচেছেন…

অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলার ঘটনায় রাস্তায় নেমেছেন রাজশাহী পলিটেকনিকের শিক্ষকবৃন্দ

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বড় বাঁচা বেঁচেছেন। সাঁতার জানায় তিনি প্রাণে বেঁচেছেন, এটা তার সৌভাগ্য। কিন্তু এ বাঁচা তো আসলে ‘বাঁচা’ নয়। একজন শিক্ষক হিসেবে তার জন্য এর চেয়ে বড় অপমানের বিষয় আর কী হতে পারে। তারই শিক্ষার্থী দ্বারা তিনি নিগৃহীত হয়েছেন। আসলে এটি তার নয়, আমাদেরই অপমান। লজ্জায় আমাদের মাথা নুইয়ে আসে। এ সমাজ বরাবরই শিক্ষকের সম্মান বজায় রাখতে ব্যর্থ। পুলিশের হাতে শিক্ষক মার খান রাজপথে, ক্যাম্পাসে ছাত্রের হাত থেকেও নিস্তার নেই! আমরা দেখেছি, এ বছরেরই মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে বাধা দেওয়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হন শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. মাসুদুর রহমান। এভাবে উদাহরণের শেষ নেই। রাজশাহীর ঘটনাটি এরই যেন পুনরাবৃত্তি।

রাজশাহী পলিটেকনিকের অধ্যক্ষকে যেভাবে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী টেনেহিঁচড়ে পুকুরে ফেলেছে, তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে আমরা হতবাক হয়েছি। কতটা বেপরোয়া হলে অন্যায় আবদারের কাছে নতিস্বীকার না করায় একজন শিক্ষকের সঙ্গে এমন ন্যক্কারজনক আচরণ করা সম্ভব? ঘটনাটি যে কারণে ঘটেছে, তাতে আমাদের বিস্ময় আরও বেড়েছে। একজন অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। সঙ্গত কারণেই অধ্যক্ষ শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপস্থিতি না থাকায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না দিয়ে তাদের অভিভাবকসহ বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। সংবাদমাধ্যমসূত্রে আমরা জেনেছি, ঘটনার দিন (২ নভেম্বর) সকালে তাদের মধ্যে অন্যতম কামাল হোসেন সৌরভ, যিনি মিডটার্ম পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন এবং শ্রেণিকক্ষেও তার প্রয়োজনীয় উপস্থিতি নেই। তবে তার পরিচয় তিনি রাজশাহী পলিটেকনিক শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক। Continue reading

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস ও আমাদের দায়ভার

কার্জন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবেই নয় বরং নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। জ্ঞানচর্চার বাইরেও ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অন্যায়ের প্রতিবাদের কেন্দ্র হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি যেভাবে ভূমিকা পালন করে আসছে তাতে দেশের মানুষের স্বপ্ন জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যখনই খারাপ কিছু ঘটে আমরা ব্যথিত হই।  নানাদিক থেকেই অতীতের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অবনতি’ দেখেন। সেটা ধরেও বলা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর গৌরব, গরিমা, ঐতিহ্য, দাপট এখনও অটুট, অক্ষুণ্ন। তবে সম্প্রতি তাতে চির ধরেছে সে মন্তব্য করাও অমূলক নয়।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির ঘ ইউনিটের ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিবাদের প্রতীক তার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ হয়েছে, এখনও হচ্ছে। প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন’স কমিটির সভায় আবারও ঘ ইউনিটের পরীক্ষার সিদ্ধান্ত  হয়। কিন্তু জটিলতা এখনও কাটেনি, কারণ যতটুটু জানা যাচ্ছে, আগের পরীক্ষায় পাসকৃত কেবল ১৮ হাজার শিক্ষার্থীরই পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাতে বাদ পড়বে ৫৭ হাজার শিক্ষার্থী। তবে ঘটনা যা-ই ঘটুক ডিন কমিটির এ সিদ্ধান্তে এটাই স্পষ্ট যে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন ফাঁস স্বীকার করেছে এবং আমলে নিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়েছেন। এটা খুবই লজ্জার, যখন আমরা দেখলাম ১২ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পরেও ফল প্রকাশ করা হয়। প্রথমে পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত, তদন্ত কমিটি গঠনসহ কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতেই ফল ঘোষণা করা হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, এবার ৯ টা ১৭ মিনিটে ফাঁস হয়েছে; ক্রমান্বয়ে ক্লোজ ফ্রেমে নিয়ে আসবেন।

ফল ঘোষণার সিদ্ধান্ত কেউ মেনে নিতে পারেনি। সবাই দাবি করেছিলো- ঘ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা ও ঘোষিত ফল বাতিল করতে হবে, প্রশ্নফাঁসে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার এবং ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষায় দায়িত্বরত সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগ করতে হবে। Continue reading

স্বপ্ন ফেরি করা লাল বাস

অপেক্ষা লাল বাসের জন্য। প্রতীক্ষাটা কত সময়ের? ক্লাস শেষ, বাস আসবে, সবাই হুড়মুড়িয়ে উঠবে। পাঁচ-দশ মিনিট কিংবা আধা ঘণ্টা। না! ‘লাল বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে ফেসবুক পেজে একজন লিখেছেন- ‘৬ মাস ধরে ডিইউতে [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে] বসবাস করছি; লাল বাসে চড়ার ইচ্ছাটা কবে যে পূরণ হবে…।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার পরও হয়তো নানা কারণে তার লাল বাসে চড়ার সুযোগ হয়নি। তিনি এখনও সুযোগের অপেক্ষায়। তার অপেক্ষা মাত্র ছয় মাসের। কারও অপেক্ষা তো ১৯-২০ বছরের! একজন লিখেছেন, ১০টি কারণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার প্রথমটিই- লাল বাস।
লাল বাসের কী এমন মাহাত্ম্য যেটা স্বপ্ন হতে পারে? ঢাকার বুক চিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসগুলো কেবল দাপিয়েই বেড়ায় না, শিক্ষার্থী পরিবহনই করে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজই করে না; বরং স্বপ্নও ফেরি করে বেড়ায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অলঙ্কৃৃত ক্ষণিকা, চৈতালি, বৈশাখী-বসন্ত, উয়ারী-বটেশ্বর, হেমন্তসহ একঝাঁক লাল বাস যখন ঢাকার রাস্তায় চলে, তখন হাজার হাজার কিশোর-কিশোরীর মনে স্বপ্ন জাগায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রেরণা দেয়।
চোখ-ধাঁধানো লাল রঙের বাস দেখার পর হয়তো তা অনেকক্ষণ মানসপটে ভেসে থাকে। বাসের রঙ লাল হওয়ার বিশেষত্ব কি এখানেই? Continue reading

‘উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি’

এভাবে কোনো সন্তানের সঙ্গে আচরণ করা উচিত নয়

মা শিশুসন্তানকে পড়াচ্ছেন ওয়ান, টু, থ্রি…। মেয়ে বারবার ভুল করছে আর মায়ের হাতে মার খাচ্ছে। এমনি এক ভিডিও দেখে যে কারও ছোট্ট মেয়েটির জন্য মায়া লাগবে। আর মাকে মনে হবে অত্যাচারী। যে কি-না শিশুটির করুণ আর্তনাদ ও শাস্তি থেকে বাঁচার আবদার সত্ত্বেও তাকে রেহাই দিচ্ছে না, তার হুঙ্কার ও হাত সমানভাবেই চলছে। ভারতের এ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল, যা তারকা খেলোয়াড় বিরাট কোহলি, যুবরাজ সিংসহ অনেকেই শেয়ার করেছেন। তারা বলছেন, এভাবে কোনো সন্তানের সঙ্গে আচরণ করা উচিত নয়। ২৫ আগস্ট ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগে ‘একেই বলে শিক্ষা দেওয়া_ নাকি শিক্ষা পাওয়া?’ শিরোনামে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপা হয়। যার শুরুটা এ রকম_ ‘তিন কি চার বছরের একটি মেয়ে ইংরেজি ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর আওড়াতে গিয়ে মায়ের কাছে বকা ও শেষ পর্যন্ত চড় খাচ্ছে। এক মিনিট ৯ সেকেন্ডের একটি খাঁটি উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি।’
সত্যিই উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি বটে। পড়াতে গিয়ে শিশুদের মারা আমাদের দেশে অনেক পরিবারেই সাধারণ ঘটনা। পরিবারের বাইরেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের মেরে পড়ানো স্বাভাবিক বিষয়। বহু বছর বেত, লাঠি ইত্যাদি এখানকার শিক্ষকদের শিক্ষার্থী ‘শায়েস্তা’ করার অন্যতম অস্ত্র ছিল। কখনও কখনও চড়-থাপ্পড়ের মাধ্যমে হাতও অস্ত্র। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ রয়েছে, সরকারের নির্দেশনা রয়েছে; শিক্ষা আইনেও একে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপরও কিন্তু তা থেমে নেই। Continue reading

শিক্ষকদের সৃজনশীল হওয়ার পথ কেন রুদ্ধ

শিক্ষকদের যখন আন্দোলনে মাঠে থাকতে হয় তখন সৃজনশীল নিয়ে আলাদা সময় বের করার ফুরসত কোথায়?

শিক্ষকদের যখন আন্দোলনে মাঠে থাকতে হয় তখন সৃজনশীল নিয়ে আলাদা সময় বের করার ফুরসত কোথায়?

শিরোনামের প্রশ্নটি লেখকের মতো হয়তো অনেকেরই। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে যখন উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৪১ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকদের ব্যর্থতা সামনে আসছে। বাস্তবে শিক্ষকদের এ ব্যর্থতার পেছনে যে কিছু কারণ রয়েছে, যেগুলো সত্যিকার অর্থে শিক্ষকদের সৃজনশীল হতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা দেখার বিষয়।
বলা প্রয়োজন, গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষায় নতুন পদ্ধতি চালুর দাবি ছিল অনেক দিনের। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ঘাড়ে যখন কোচিং-নোট-গাইডের মতো ছায়া শিক্ষা চেপে বসছিল, তখন দেশের শিক্ষাবিদদের সহযোগিতায় সরকার চালু করে সৃজনশীল পদ্ধতি। এ পদ্ধতি চালু হওয়ার সময় প্রত্যাশা করা হয়েছিল, দেশ থেকে কোচিং-নোট-গাইড উচ্ছেদ হবে, মুখস্থবিদ্যার বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সৃজনশীল হবে, শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন ঘটবে। যদিও ২০০৮ সালে চালু হওয়া সৃজনশীল পদ্ধতির আজকের বাস্তবতা সংশ্লিষ্টদের অজানা নয়। কোচিং-নোট-গাইডও সৃজনশীল (!) হয়ে দিব্যি চলছে। কাগজে-কলমে খোদ প্রশাসনের প্রতিবেদনেও তার দুরবস্থার চিত্র সংবাদমাধ্যমে এসেছে। Continue reading

গ্রিন স্কুল, রবীন্দ্রনাথ এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

GreenSchool-Bali

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অবস্থিত গ্রিন স্কুল

রবীন্দ্রনাথ কি আজকের দুনিয়ার গ্রিন আন্দোলনের কথা জানতেন? সবকিছুকে গ্রিন করার যে আয়োজন এখন সর্বত্র। ‘গ্রিনের’ তালিকায় কত কিছুই না আছে; গ্রিন টেকনোলজি, গ্রিন পার্টি, গ্রিন ইকোনমি, গ্রিন টি, গ্রিন ডে, গ্রিন বুক ইত্যাদি। জানুয়ারিতে ব্রিটেনের গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদন পড়ে এই তালিকায় গ্রিন স্কুলের খবরও জানা গেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক বছর ধরে এই গ্রিন স্কুল রয়েছে। আমাদের দেশে গ্রিন স্কুল এখনও সেভাবে নেই। গ্রিন স্কুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচিতি না থাকলেও রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয়ের ধারণা থেকে সহজেই তা অনুমান করা যায়। প্রায় একশ’ বছর আগে তিনি যে ধারণা দিয়েছেন সেটাই তো প্রকৃত গ্রিন স্কুল। লোকালয় থেকে দূরে নির্জন পরিবেশে গাছপালার মধ্যে স্থাপিত বিদ্যালয়কেই আদর্শ বিদ্যালয় বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। যেখানে শিক্ষকরা নিভৃতে নিজেরা জ্ঞানচর্চা করবেন এবং ছাত্রদের শিক্ষা দেবেন। যে বিদ্যালয়ের সঙ্গে ফসলি জমি থাকবে, দুধের গরু থাকবে; এগুলো ছাত্ররাই পড়াশোনার অবসরে দেখাশোনা করে নিজেদের আহারের ব্যবস্থা করবে। Continue reading

অক্সব্রিজের আয়নায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়

অক্সব্রিজের মধ্যে লুকিয়ে আছে বিখ্যাত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের দুনিয়াজোড়া খ্যাতি আর ঐতিহাসিকতার দিক থেকে একত্রে বলা হয় অক্সব্রিজ। এদের প্রথমটির সঙ্গে মিলিয়েই এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। যদিও এ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ে অক্সফোর্ডের স্থান পঞ্চম, ক্যামব্রিজ দ্বিতীয় আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান ছয়শ’ থেকে সাতশ’র মধ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থ্থান সাতশ’র মধ্যে থাকলেও এর বাইরে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। র‌্যাংকিংয়ের কথা চিন্তা না করলেও ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যে একটা আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরপরও অক্সব্রিজের সঙ্গে কিংবা অক্সব্রিজের আয়নায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখার ন্যায্যতা এখানেই যে অনেকে বলছে আমাদের উচ্চশিক্ষা আসলে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত। Continue reading

গাছতলার স্কুল!

শ্রেণীকক্ষের অভাবে গাছতলায় ক্লাস হচ্ছে_ এ ধরনের চিত্র গণমাধ্যমে প্রায়ই আসে। অবশ্য সোমবারের ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘গাছতলায় আসন পেতে গুরুদক্ষিণার পাঠশালা’ শিরোনামে যে পাঠশালার কথা বলা হচ্ছে এবং সে পাঠশালার ক্লাস যে গাছতলায় হচ্ছে সেটা কিছুটা ভিন্ন ধরনের। মুর্শিদাবাদের পৃথি্বরাজ ঘোষ হাজরা যিনি স্কুলজীবনে এলাকার সোলেমান স্যারের কাছে পড়তেন। স্যারের দক্ষিণা সামান্য হলেও পৃথি্বরাজের সেটা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। স্যার কিন্তু যথার্থ গুরুর দায়িত্ব পালন করে বলেছেন, তোমাকে গুরুদক্ষিণা দিতে হবে না, তুমি বড় হয়ে তোমার মতো অসামর্থ্যদের পড়াশোনা করাবে, সেটাই গুরুদক্ষিণা। পৃথি্বরাজ অবশ্য কথা রেখেছেন। স্নাতক পাস করেই পাড়ার একটা বাড়ির ভাঙা বারান্দায় তিনজনকে নিয়ে পড়ানো শুরু করে দিয়েছিলেন, যাদের দু’জন যাযাবরের সন্তান এবং একজন শিশু শ্রমিক। বিনাবেতনে পৃথি্বরাজের পড়ানো দেখে গরিব পরিবারগুলো তাদের ছেলেমেয়েদের তার কাছে পাঠাতে লাগল। পৃথি্বরাজের শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় তাকে শেষ পর্যন্ত যেতে হয়েছে গাছতলায়। ছয় বছর ধরে গাছতলায়ই সহায়-সম্বলহীন পরিবারের ছেলেমেয়েদের নিষ্ঠার সঙ্গে পড়িয়ে যাচ্ছেন। এখন তার ছাত্রছাত্রী ষাট। পৃথি্বরাজের ছয় বছরের নিষ্ঠা মুর্শিদাবাদের জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মকর্তারাও স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার গাছতলার বিদ্যালয়ই হয়তো একদিন পাকা দালান হবে। পৃথি্বরাজের বিদ্যালয়ের সফলতা এখানেই যে, তিনি সমাজের একেবারে অবহেলিত পরিবারের সন্তানদের পড়ানোর বন্দোবস্ত করেছেন। এর চেয়ে বড় বিষয় হলো শিশু শ্রমিকরাও এই বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ করতে পারছে। বিদ্যালয়টি বসে সকালে।
আমাদের দেশে এখনও অনেক শিশু শিক্ষার বাইরে। সরকারের হিসাব মতে ৯৯ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে গেলেও অনেক শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ে। গণসাক্ষরতা অভিযান তাদের এক গবেষণায় দেখিয়েছে, এখনও ৪৯ লাখ শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এ শিশুদের অধিকাংশই নানা ধরনের শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। পরিসংখ্যান ব্যুরো এক হিসাবে দেখাচ্ছে, ৩২ লাখ শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত, এর মধ্যে ১৩ লাখ একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম করে যাচ্ছে।
পৃথি্বরাজদের বিদ্যালয়ে কিন্তু সবাই পড়তে পারছে, হোক যাযাবর কিংবা হরিজন। আমাদের দেশে এখনও অনেক জায়গায় সে বৈষম্যটা রয়ে গেছে। সামাজিক বৈষম্য আমাদের এ রকম নানা পশ্চাৎপদ পরিবারের শিশুদের পিছিয়ে রাখছে।
শিশু শ্রমিক ও এ শিশুদের জন্য শিক্ষার তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। অবশ্য অনেকে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে এদের শিক্ষায় চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে সেটা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। একটি উদ্যোগের কথা তো বলাই যায়, ১৯৯৪ সালে রংপুর পৌরসভার সাবেক কমিশনার ফাতেমা ইয়াসমিন ইরার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পৌরসভার তত্ত্বাবধানে সুইপার শিশুদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল হরিজন প্রাথমিক বিদ্যালয়। অর্থাভাবে সেটি একদিন
বন্ধ হয়ে যায়।
সরকার সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়, ফলে তাদের এ রকম স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো প্রমোট করা দরকার, যেন এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়ে।
পৃথি্বরাজের উদ্যোগ যেভাবে আনন্দবাজার সামনে নিয়ে এসেছে, একইভাবে আমাদের এ রকম উদ্যোগগুলোকেও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সামনে আসা উচিত। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি সরকারের সহযোগিতায় সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত হবে, হোক না সেটা গাছতলার কোনো স্কুল।