Category Archives: বেকার সমস্যা

সহনীয় হোক চাকরির আবেদন ফি


বাংলাদেশে চাকরিটা সোনার হরিণ। চাকরিপ্রার্থী প্রত্যেক বেকার এ সোনার হরিণের পেছনে দৌড়ান। ফলে চাকরিদাতারা যাচ্ছেতাই করতে পারেন; ব্যাংক ড্রাফট তো বটেই। সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব চাকরির আবেদনেই ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার বাবদ প্রার্থীদের গুনতে হয় শত শত টাকা। বিসিএসসহ পিএসসির (সরকারি কর্ম-কমিশন) সব চাকরির আবেদনে ৩০০ থেকে ৫০০ এবং ব্যাংকের আবেদনেও সমপরিমাণ টাকা চাওয়া হয়। এ ছাড়া বেসরকারি চাকরি, বিশেষ করে শিক্ষকতার জন্য ক্ষেত্রভেদে ৩০০ থেকে ৫ হাজার টাকাও চাওয়া হচ্ছে। চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, ইন্টারভিউ কার্ড কিংবা লিখিত পরীক্ষার প্রবেশপত্র আসবে কি না তারও নিশ্চয়তা নেই অথচ আগেই আবেদনপত্রের সঙ্গে এ টাকা নেয়া হচ্ছে। আর এ টাকা নেয়া হচ্ছে বেকারদের কাছ থেকে, যাদের নির্দিষ্ট আয় নেই এবং একটা চাকরির জন্যই তারা চেষ্টা করছেন।
ব্যাংক ড্রাফট কিংবা পে-অর্ডারে টাকা নেয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে চাকরিদাতারা হয়তো নিয়োগের খরচ মেটানোর কথা বলবেন। বিশেষ করে যেসব নিয়োগে পরীক্ষা হয় সেখানে পরীক্ষা নেয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ প্রভৃতি আনুষঙ্গিক কাজে খরচ হবে স্বাভাবিক। কিন্তু এ খরচ কেন একজন চাকরিপ্রার্থী বেকারের ঘাড়ে পড়বে। ব্যাংক বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। সুতরাং তার প্রক্রিয়াকরণের সব ব্যয়ও প্রতিষ্ঠান বহন করবে কিংবা প্রতিষ্ঠানটির সে বাজেটও থাকবে। চাকরিপ্রার্থীদের সেটি বহন করার কথা নয়। প্রতিষ্ঠান যদি সেটা বহন নাও করে সে ক্ষেত্রে ঠিক এমন একটা পরিমাণ ব্যাংক ড্রাফট হিসেবে ধরা উচিত, যেখানে নিয়োগসংক্রান্ত সব ব্যয় মিটে যায়। বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, যে পরিমাণ টাকা চাকরিপ্রার্থীদের গুনতে হয় সেটা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার মাধ্যমও বটে। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের তুলনায় যে পরিমাণ বেকার বাড়ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সাধারণ চাকরিতেও ন্যূনতম লাখ খানেক আবেদন পড়ে। গত বছরের ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার জন। এ রকম যেকোনো চাকরিতে যদি ৩০০ টাকা করেও নেয়া হয় ও প্রার্থী যদি ১ লাখও হয়, তাতে ৩ কোটি টাকা উঠছে। এত টাকা একটি নিয়োগকাজ সম্পন্ন করতে লাগার কথা নয়।

বণিক বার্তা ২৬.০৩.২০১২

অনেকেই বলছেন, ব্যাংক ড্রাফট চাকরিদাতাদের আয়ের একটা অন্যতম উত্স হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর মাধ্যমে ব্যবসাও করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ক্যাটাগরি করে প্রত্যেকটি ক্যাটাগরিতে আবেদনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক ড্রাফট করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার ইচ্ছা করেই একবারে চাহিদামাফিক জনবল নিয়োগ না দিয়ে বারবার সার্কুলার দিচ্ছে, এতে একই প্রার্থী একই প্রতিষ্ঠানে বারবার ব্যাংক ড্রাফট করছেন। এভাবে একটার পর একটা চাকরিতে আবেদন করতে করতে চাকরিপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। যেসব চাকরিতে ৩০০ টাকা দরকার, সেখানে আবেদন করা ও আবেদনপত্র পাঠানোসহ (অনলাইন কিংবা সরাসরি) আনুষঙ্গিক কাজে ন্যূনতম ৫০০ টাকা খরচ হয়ে যায় আর ৫০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট হলেও সব মিলিয়ে সেখানে ৮০০ টাকা লেগে যায়। একজন বেকার এত টাকা কোত্থেকে দেবেন?
চাকরিপ্রার্থী অনেকেই বলছেন, মনে হচ্ছে পড়াশোনার খরচের তুলনায় চাকরির আবেদনেই বেশি টাকা লেগে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা পাবলিক কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে আসেন তাদের পড়াশোনা বাবদ খুব অল্প টাকাই খরচ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এখানকার শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলগুলোয়ও বলা চলে ফ্রিই থাকেন। সেখানে এসব শিক্ষার্থীর অনেকের জন্যই ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ করে চাকরির আবেদন করা কষ্টকর। তার ওপর যদি মাসের পর মাস কিংবা অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর আবেদন করে যেতে হয়, সেটা কীভাবে সম্ভব? অর্থাত্ এখানেও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধার চেয়েও টাকাটা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার টাকা আছে তিনি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারছেন, যার টাকা নেই বা স্বল্প তিনি চাইলেও তা পারছেন না।
এটাকেও বেকারত্ব বাড়ার অন্যতম কারণ বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশে বেকারত্ব সমস্যার প্রকটতা নিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে অনেক সময় চাইলেই কেউ কাঙ্ক্ষিত চাকরি পান না। অর্থনীতিবিদ পিগু যথার্থই বলেছেন, যখন কর্মক্ষম জনগণ তাদের যোগ্যতা অনুসারে প্রচলিত মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতে চায় অথচ কাজ পায় না সে অবস্থাকেই বলা হয় বেকারত্ব। যে বেকারত্ব জাতির জন্য অভিশাপ। চাকরিদাতারা এ অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য অবদান রাখছেন সন্দেহ নেই; এটা আরও কার্যকর হতো যদি ব্যাংক ড্রাফট ছাড়াই চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ মেলে।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো কর্মসংস্থানের একটা বড় ক্ষেত্র। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার এগুলোয় চাকরি পেয়ে থাকেন। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরির আবেদনে কোনো ধরনের ফি দিতে হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের শেষ দিকে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এ রকম চাকরির আবেদনের সঙ্গে কোনো ফি না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, চাকরির আবেদনের সময় একজন বেকারের পক্ষে ব্যাংক ড্রাফট করা কষ্টসাধ্য। তারা কিছু বিদেশী ও বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকের উদাহরণ দিয়েছিল, যারা চাকরির আবেদনপত্রের সঙ্গে কোনো ধরনের ফি নেয় না। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব ব্যাংক চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ফি আদায় করছে, সে বিষয়টিও বিবেচনা করার অনুরোধ করেছিল। বাস্তবতা হলো, ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পরামর্শ আমলে নেয়নি। এখনো ব্যাংকগুলোয় চাকরির আবেদনে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হচ্ছে।
করপোরেট জবগুলোয় সাধারণত ব্যাংক ড্রাফট কিংবা পে-অর্ডারের নামে কোনো ফি নেয়া হয় না। যেসব প্রতিষ্ঠানে ফি নেয়া হয়, সেখানে সাধারণত লিখিত পরীক্ষা হয়। ফলে এসব ফির একটা যৌক্তিকতা আছে। সে ক্ষেত্রেও ফি রাখা উচিত সহনীয় মাত্রায়। এখন যেহেতু চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যাও বেশি, ফলে আগের মতো ৩০০ বা ৫০০ না নিয়ে ১০০ টাকা নেয়া
যেতে পারে।
একজন শিক্ষিত বেকার যখন তার বেকারত্ব ঘুচানোর চেষ্টা করছেন, সমাজেরও উচিত তার জন্য এগিয়ে আসা এবং প্রকৃত অর্থেই সমাজের দায়িত্ব; সরকারের তো বটেই। চাকরিপ্রার্থীর দৈনন্দিন জীবন চালানোর জন্যই একটা চাকরি দরকার। যেখানে তিনি দীর্ঘ ১৭ বা ১৮ বছর পড়াশোনা করে এসে চাকরি খুঁজছেন, পরিবার যখন তার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং তার দিনগুলো কষ্টে অতিক্রম করতে হয়; সেখানে চাকরির জন্যই যদি তাকে বড় অঙ্কের টাকা গুনতে হয়, সেটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ নয় কি?

সহনীয় হোক চাকরির আবেদন ফি

বাংলাদেশে চাকরিটা সোনার হরিণ। চাকরিপ্রার্থী প্রত্যেক বেকার এ সোনার হরিণের পেছনে দৌড়ান। ফলে চাকরিদাতারা যাচ্ছেতাই করতে পারেন; ব্যাংক ড্রাফট তো বটেই। সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব চাকরির আবেদনেই ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার বাবদ প্রার্থীদের গুনতে হয় শত শত টাকা। বিসিএসসহ পিএসসির (সরকারি কর্ম-কমিশন) সব চাকরির আবেদনে ৩০০ থেকে ৫০০ এবং ব্যাংকের আবেদনেও সমপরিমাণ টাকা চাওয়া হয়। এ ছাড়া বেসরকারি চাকরি, বিশেষ করে শিক্ষকতার জন্য ক্ষেত্রভেদে ৩০০ থেকে ৫ হাজার টাকাও চাওয়া হচ্ছে। চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, ইন্টারভিউ কার্ড কিংবা লিখিত পরীক্ষার প্রবেশপত্র আসবে কি না তারও নিশ্চয়তা নেই অথচ আগেই আবেদনপত্রের সঙ্গে এ টাকা নেয়া হচ্ছে। আর এ টাকা নেয়া হচ্ছে বেকারদের কাছ থেকে, যাদের নির্দিষ্ট আয় নেই এবং একটা চাকরির জন্যই তারা চেষ্টা করছেন।
ব্যাংক ড্রাফট কিংবা পে-অর্ডারে টাকা নেয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে চাকরিদাতারা হয়তো নিয়োগের খরচ মেটানোর কথা বলবেন। বিশেষ করে যেসব নিয়োগে পরীক্ষা হয় সেখানে পরীক্ষা নেয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ প্রভৃতি আনুষঙ্গিক কাজে খরচ হবে স্বাভাবিক। কিন্তু এ খরচ কেন একজন চাকরিপ্রার্থী বেকারের ঘাড়ে পড়বে। ব্যাংক বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। সুতরাং তার প্রক্রিয়াকরণের সব ব্যয়ও প্রতিষ্ঠান বহন করবে কিংবা প্রতিষ্ঠানটির সে বাজেটও থাকবে। চাকরিপ্রার্থীদের সেটি বহন করার কথা নয়। প্রতিষ্ঠান যদি সেটা বহন নাও করে সে ক্ষেত্রে ঠিক এমন একটা পরিমাণ ব্যাংক ড্রাফট হিসেবে ধরা উচিত, যেখানে নিয়োগসংক্রান্ত সব ব্যয় মিটে যায়। বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, যে পরিমাণ টাকা চাকরিপ্রার্থীদের গুনতে হয় সেটা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার মাধ্যমও বটে। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের তুলনায় যে পরিমাণ বেকার বাড়ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সাধারণ চাকরিতেও ন্যূনতম লাখ খানেক আবেদন পড়ে। গত বছরের ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার জন। এ রকম যেকোনো চাকরিতে যদি ৩০০ টাকা করেও নেয়া হয় ও প্রার্থী যদি ১ লাখও হয়, তাতে ৩ কোটি টাকা উঠছে। এত টাকা একটি নিয়োগকাজ সম্পন্ন করতে লাগার কথা নয়।
অনেকেই বলছেন, ব্যাংক ড্রাফট চাকরিদাতাদের আয়ের একটা অন্যতম উত্স হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর মাধ্যমে ব্যবসাও করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ক্যাটাগরি করে প্রত্যেকটি ক্যাটাগরিতে আবেদনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক ড্রাফট করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার ইচ্ছা করেই একবারে চাহিদামাফিক জনবল নিয়োগ না দিয়ে বারবার সার্কুলার দিচ্ছে, এতে একই প্রার্থী একই প্রতিষ্ঠানে বারবার ব্যাংক ড্রাফট করছেন। এভাবে একটার পর একটা চাকরিতে আবেদন করতে করতে চাকরিপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। যেসব চাকরিতে ৩০০ টাকা দরকার, সেখানে আবেদন করা ও আবেদনপত্র পাঠানোসহ (অনলাইন কিংবা সরাসরি) আনুষঙ্গিক কাজে ন্যূনতম ৫০০ টাকা খরচ হয়ে যায় আর ৫০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট হলেও সব মিলিয়ে সেখানে ৮০০ টাকা লেগে যায়। একজন বেকার এত টাকা কোত্থেকে দেবেন?
চাকরিপ্রার্থী অনেকেই বলছেন, মনে হচ্ছে পড়াশোনার খরচের তুলনায় চাকরির আবেদনেই বেশি টাকা লেগে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা পাবলিক কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে আসেন তাদের পড়াশোনা বাবদ খুব অল্প টাকাই খরচ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এখানকার শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলগুলোয়ও বলা চলে ফ্রিই থাকেন। সেখানে এসব শিক্ষার্থীর অনেকের জন্যই ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ করে চাকরির আবেদন করা কষ্টকর। তার ওপর যদি মাসের পর মাস কিংবা অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর আবেদন করে যেতে হয়, সেটা কীভাবে সম্ভব? অর্থাত্ এখানেও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধার চেয়েও টাকাটা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার টাকা আছে তিনি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারছেন, যার টাকা নেই বা স্বল্প তিনি চাইলেও তা পারছেন না।
এটাকেও বেকারত্ব বাড়ার অন্যতম কারণ বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশে বেকারত্ব সমস্যার প্রকটতা নিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে অনেক সময় চাইলেই কেউ কাঙ্ক্ষিত চাকরি পান না। অর্থনীতিবিদ পিগু যথার্থই বলেছেন, যখন কর্মক্ষম জনগণ তাদের যোগ্যতা অনুসারে প্রচলিত মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতে চায় অথচ কাজ পায় না সে অবস্থাকেই বলা হয় বেকারত্ব। যে বেকারত্ব জাতির জন্য অভিশাপ। চাকরিদাতারা এ অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য অবদান রাখছেন সন্দেহ নেই; এটা আরও কার্যকর হতো যদি ব্যাংক ড্রাফট ছাড়াই চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ মেলে।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো কর্মসংস্থানের একটা বড় ক্ষেত্র। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার এগুলোয় চাকরি পেয়ে থাকেন। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরির আবেদনে কোনো ধরনের ফি দিতে হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের শেষ দিকে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এ রকম চাকরির আবেদনের সঙ্গে কোনো ফি না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, চাকরির আবেদনের সময় একজন বেকারের পক্ষে ব্যাংক ড্রাফট করা কষ্টসাধ্য। তারা কিছু বিদেশী ও বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকের উদাহরণ দিয়েছিল, যারা চাকরির আবেদনপত্রের সঙ্গে কোনো ধরনের ফি নেয় না। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব ব্যাংক চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ফি আদায় করছে, সে বিষয়টিও বিবেচনা করার অনুরোধ করেছিল। বাস্তবতা হলো, ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পরামর্শ আমলে নেয়নি। এখনো ব্যাংকগুলোয় চাকরির আবেদনে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হচ্ছে।
করপোরেট জবগুলোয় সাধারণত ব্যাংক ড্রাফট কিংবা পে-অর্ডারের নামে কোনো ফি নেয়া হয় না। যেসব প্রতিষ্ঠানে ফি নেয়া হয়, সেখানে সাধারণত লিখিত পরীক্ষা হয়। ফলে এসব ফির একটা যৌক্তিকতা আছে। সে ক্ষেত্রেও ফি রাখা উচিত সহনীয় মাত্রায়। এখন যেহেতু চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যাও বেশি, ফলে আগের মতো ৩০০ বা ৫০০ না নিয়ে ১০০ টাকা নেয়া
যেতে পারে।
একজন শিক্ষিত বেকার যখন তার বেকারত্ব ঘুচানোর চেষ্টা করছেন, সমাজেরও উচিত তার জন্য এগিয়ে আসা এবং প্রকৃত অর্থেই সমাজের দায়িত্ব; সরকারের তো বটেই। চাকরিপ্রার্থীর দৈনন্দিন জীবন চালানোর জন্যই একটা চাকরি দরকার। যেখানে তিনি দীর্ঘ ১৭ বা ১৮ বছর পড়াশোনা করে এসে চাকরি খুঁজছেন, পরিবার যখন তার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং তার দিনগুলো কষ্টে অতিক্রম করতে হয়; সেখানে চাকরির জন্যই যদি তাকে বড় অঙ্কের টাকা গুনতে হয়, সেটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ নয় কি?

বণিক বার্তা ২৬.০৩.২০১২

যেখান থেকে অনেক দুর্নীতির জন্ম

২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাও প্রশ্নপ্রত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে বাঁচতে পারেনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য এটি নাকচ করে দিয়েছে। তারা বলছে, যেটা বিলি করা হয়েছে, সেটা ভুয়া প্রশ্নপত্র আর পুলিশ এ অভিযোগে ২২ জনকে আটক করেছে। সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা আলোচিত একটি পরীক্ষা, যেখানে দেশের ৬১টি জেলার প্রায় সাড়ে ১০ লাখ প্রার্থী অংশ নেন। মন্ত্রণালয়ের নাকচ আমলে নিলেও এটা ঠিক, প্রশ্নপত্র ফাঁস দেশে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিসিএস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরীক্ষা বাকি নেই, যেখানে এমন অভিযোগ নেই। এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে বাতিল হয় খাদ্য বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষা। তারও আগে ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত নার্সিং ইউনিটের ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও ঢাকা মেডিকেলের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগগুলোও প্রায় সাম্প্রতিক ঘটনা।
বাংলাদেশে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগে ঘুষের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। যারা সত্যিকার অর্থে পড়াশোনা করে যোগ্যতার বলে চাকরি পেতে চান, তাদের চাকরির নিশ্চয়তা কমেছে এতে। এখানে টাকার কাছে যেন মেধা অসহায়। মনে হয়, মগের মুল্লুক চলছে। একজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি বা অনার্স পাস করে ১৫-১৬ ও মাস্টার্স করলে ১৭-১৮ বছর পড়াশোনা শেষ করে যখন চাকরির বাজারের এ অবস্থা দেখেন, তখন তার হতাশ হওয়া ভিন্ন পথ খোলা রয়েছে কি? এটা আমাদের জন্য কতটা লজ্জার তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করার মধ্য দিয়ে বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। ঠিক তখনই জানা যায়, আসলে এর সঙ্গে জড়িত কারা। সে সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে সরকারি বিজি প্রেসের নাম সামনে আসে। যেখান থেকে একটি শক্তিশালী চক্র বিসিএসসহ অন্যান্য পরীক্ষা মিলিয়ে মোট ৬৪ বার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে এবং এর জন্য এ পর্যন্ত ২৯টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটি প্রতিবেদন দেয়, তবে শাস্তি হয়নি কারোরই।
সম্প্রতি সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে অবশ্য গণমাধ্যমও বলছে, ‘ভুয়া প্রশ্নপত্র’ বিক্রি অর্থাৎ মূল প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। অনেকে ফাঁস করার কথা বলে মানুষকে প্রতারিত করে ভুল প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন। ঘটনাটি বিশেষত উত্তরাঞ্চলে ঘটেছে; যেখানে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় থেকে আটক করা হয়েছে ২২ জনকে। উত্তরাঞ্চল থেকে এর আগেও খাদ্য বিভাগের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়, যারা সত্যিকার অর্থেই প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত ছিল। এ অঞ্চলে প্রশ্নপত্র ফাঁস একটু বেশিই হয় সম্ভবত। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার আগে বিতরণ করা প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি, কিংবা ভুয়া প্রশ্নপত্র বিতরণের চেষ্টা বলেই কিন্তু প্রশাসন দায়মুক্ত হতে পারে না। এ রকম ঘটনা কেন ঘটল তারও সুষ্ঠু তদন্ত দরকার।
সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার হওয়ার পর থেকেই বাতাসে ভাসছিল যে, ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা দিলেই চাকরি। অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রেও গুরুত্ব অনুসারে এমন টাকার অঙ্কের কথা প্রায়ই শোনা যায়। যা কিছু রটে, তার কিছু না কিছু তো ঘটে। আর এটা যদি হয় বাস্তবতা তাহলে বলা যায়, যার টাকা নেই তার চাকরি নেই। মনে শঙ্কা জাগে, ভারতের কৃষকদের অনেকে যেমন ঋণের ভার সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন; তেমনি বাংলাদেশের সৎ, যোগ্য, মেধাবী কিন্তু দরিদ্র ঘরের সন্তানরাও এভাবে চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যা করবেন।
তবে আইনের দিক থেকে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই আমরা। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ ও সংশোধনী ১৯৯২-এর ৪ নম্বর ধারায় স্পষ্ট করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের শাস্তির বিধান আছে। বলা হয়েছে, এটি ফাঁস বা বিতরণে জড়িত থাকলে ৩ থেকে ১০ বছর কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড হবে। তবে এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়নি কোথাও। কারণ প্রত্যেক ঘটনার পেছনেই রাঘব-বোয়ালরা জড়িত, যাদের গায়ে আঁচড় দেয়ার ক্ষমতা বোধহয় কারোর নেই।
বাংলাদেশের সর্বত্র দুর্নীতির যে ছাপ আমরা দেখছি, তার সূচনা চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকেই। যেখানে যাবেন সেখানে যদি বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে চাকরি পেতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী সময়ে সে টাকা ওঠানোর জন্য বৈধ-অবৈধ উপায় অবলম্বন করবেন। এটা একদিকে যেমন দুর্নীতি বাড়ায়, আবার যারা টাকা দিয়ে এভাবে চাকরি পান তারা সংশ্লিষ্ট কাজের যোগ্যও হন না অনেক ক্ষেত্রে। আমাদের প্রশাসনের সর্বত্রই এ অযোগ্যরা যদি অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পান, সেটা দেশের জন্য কতটা ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রশ্নপত্র ফাঁস আর নিয়োগ পরীক্ষা এবং চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি এভাবে আর কত দিন চলবে? আমাদের পিছিয়ে পড়াটা তো এ কারণেও ঘটছে। এ থেকে মুক্তি চান সবাই।

বণিক বার্তা ২৮.০২.২০১২

বেকার সমস্যা সমাধানে সরকারি প্রকল্প

ঢাবির একজন শিক্ষার্থীর অনুভূতি দিয়ে শুরু করা যাক। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রিডিং রুমে পড়তে পড়তে টেবিলে লিখেছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, মা-বাবা আত্মীয়-স্বজন সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে, একটা ভালো চাকরি যদি না পাই এর চেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় আর কী হতে পারে”। হয়তো সে তার মনের এ বিষয়টি কারো সাথে শেয়ার করতে না পেরে টেবিলে লিখেছে। কিন্তু যে শিক্ষার্থী তীব্র প্রতিযোগিতার যুদ্ধে জয়ী হয়ে ভর্তি হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে, রিডিং রুমে এসে পড়াশোনা করছে, তার চাকরি না পাওয়ার এ আশংকা কেন? উত্তরটা অত্যন্ত স্পষ্ট- আমাদের দেশে চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। চাকরি এখানে সোনার হরিণ। চাইলেই কেউ কাক্সিক্ষত চাকরি করতে পারে না। এখানেই অর্থনীতিবিদ পিগুর কথা- ‘যখন কর্মক্ষম জনগণ তাদের যোগ্যতা অনুসারে প্রচলিত মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতে চায় অথচ কাজ পায় না সে অবস্থাকেই বলা হয় বেকারত্ব।’বাংলাদেশে এ বেকারত্ব বা বেকার সমস্যা কতটা প্রকট তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ষোল কোটি মানুষের দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা এখন তিন কোটি। এর মধ্যে ২০০৬-এর হিসাব অনুসারে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২১ লাখ। ২০১০-এ এসে সংখ্যাটা যে বাড়বে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রত্যেক বছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বের হয়। এর বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তো রয়েছেই, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা নাইবা বললাম। স্পষ্টতঃই দেখা যাচ্ছে দিন দিন বেকারের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।স্বাভাবিকভাবেই বেকার সমস্যা দেশের এক বিরাট সমস্যা। এটি সকলের মাথা ব্যথার অন্যতম কারণও বটে। এ মাথা ব্যথা উপশমে সরকার বা প্রশাসন কোনো ভূমিকা নিক বা না নিক, এটা কিন্তু নির্বাচনের অন্যতম ইস্যু। নির্বাচনের আগে সব দলই দৃঢ় পদক্ষেপের বুলি ছোড়ে। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ও নির্বাচনী ইশতিহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিলো বেকার সমস্যার সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ইশতিহারের ১৪ নং পয়েন্টে যুব সমাজ ও কর্মসংস্থান শিরোনামে সে কথাই বলা হয়েছে- ‘বছরে ন্যূনতম ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের জন্য প্রত্যেক পরিবারের একজন কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীকে কর্মসংস্থানের জন্য এমপলয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিম পর্যায়ক্রমে কার্যকরী করা হবে। সকল কর্মক্ষম নাগরিকের নিবন্ধন করা হবে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নতুন প্রজন্মের সমুদয় যুব সমাজকে দুই বছরের জন্য ন্যাশনাল সার্ভিস-এ নিযুক্ত করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।”আওয়ামী লীগ তার এ নির্বাচনী ইশতিহারের অঙ্গীকার অনুযাযী পরোক্ষভাবে অনেক আগ থেকেই কাজ শুরু করেছে বলে গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা জেনেছি। প্রত্যক্ষভাবে কর্মসংস্থানের উদ্যোগটা দেখা যায় এ মাসের ছয় তারিখে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রামে চারজন বেকার তরুণ-তরুণীর হাতে মননয়নপত্র তুলে দিয়ে প্রতিশ্রুত ‘ন্যাশনাল সার্ভিসের’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এ সার্ভিস জেলার ৯ হাজার ৯৫০ জনকে এ প্রকল্পের আওতায় আনে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়- ‘কুড়িগ্রাম মঙ্গা হতে দিব না, আর মঙ্গা হবে না। সবার পেটে ভাত থাকবে, মানুষ শান্তিতে ঘুমাবে। কুড়িগ্রামের পর বরগুনা হবে দ্বিতীয় জেলা যেখানে অচিরেই এ কমিশন এর কাজ শুরু হবে। বেকারত্ব ঘুচানোর জন্য এ প্রকল্প মূলত একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প। এখানে বেকারদের প্রশিক্ষণকালীন সময়ে দৈনিক ১০০ টাকা হারে দেয়া হবে। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর পরবর্তীতে দুই বছর দৈনিক ২০০ টাকা হারে অর্থাৎ মাসে ছয় হাজার টাকা করে দেয়া হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ৭ লাখ ২০ হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে এ প্রকল্প।বেকারত্ব নিরসনে উদ্ভাবিত সরকারি এ প্রকল্পের কথা জাতীয় বাজেটে এসেছিলো। বেকারত্ব নিরসনে এ প্রকল্প যে যথেষ্ঠ নয় তা বলা যায়। একদিকে যেমন এটি স্থায়ী চাকরি নয়, অন্যদিকে এর স্থায়ীত্বও বেশি নয় এর সাথে বেতনের পরিমাণটা তো আছেই। এটি পানির পিপাসায় ভীষণ তৃষ্ণার্তকে এক চামচ পানি দিয়ে তার পিপাসার জ্বালা বাড়ানো নয়, বরং সে অল্প পানি তার কিঞ্চিত পিপাসা মেটানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হবে। অর্থাৎ আমাদের পাহাড়সম বেকারের কিছুটা পাথেয় হিসেবের এ প্রকল্প ভূমিকা রাখবে। কম্পিউটার, চরিত্রগঠন, শারীরিক শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির প্রশিক্ষণ অস্থায়ী হলেও, এ সময়টা কম হলে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ একজন ব্যক্তিকে তার স্থায়ী বেকারত্ব ঘুচানোর কাজ করবে । প্রধানমন্ত্রী তো সে আশাবাদই ব্যক্ত করেছেন- ‘দুই বছর পর এসব বেকার যুবক ও যুব মহিলা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারবে এবং অপরকেও কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।প্রশিক্ষণের বিষয়ে বলার মতো বিষয় হলো প্রশিক্ষণগুলো হবে বাস্তব ভিত্তিক। এখানে অবশ্য কম্পিউটারের কথা এসেছে। বর্তমান প্রযুক্তির দুনিয়ায় কম্পিউটারে ইন্টারনেটসহ যে নানাবিধ বিষয় সেগুলো যেন নিশ্চিত হয়। এছাড়া এ প্রশিক্ষণগুলোর মাধ্যমে প্রার্থীরা যাতে দেশে এবং বিদেশে কর্মসংস্থান করে নিতে পারে সে বিষয়টির দিকে নজর দেয়া যেতে পারে।আওয়ামী লীগ প্রত্যেক পরিবারকে চাকরি দেয়ার যে অঙ্গীকার করেছে, সে বিষয়ে অনেকে সন্দেহ করেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন প্রত্যেক পরিবার মানে কী দলীয় পরিবার? এ প্রশ্ন যে একেবারে ফেলনা তা কিন্তু নয়। গত বছরের শেষ দিকে সরকার চাকরির জন্য সারাদেশ থেকে বায়োডাটা সংগ্রহের বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এর জন্য যদি কেউ বায়োডাটা দিয়ে থাকে তারা সবাই দলীয় লোক, কারণ বায়োডাটা সংগ্রহের এ ঘোষণা দলীয়ভাবেই হয়েছে, দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদেরকেই এ বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রামে যে চারজনকে মনোনয়ন দিয়ে ন্যাশনাল সার্ভিস শুরু করেছেন তাদের বিষয়েও রয়েছে দলীয়করণের অভিযোগ, এর সাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগও উঠেছে।বিষয়গুলো যদি সত্য হয়, পুরো পরিকল্পনাকেই করবে প্রশ্নবিদ্ধ। এভাবে শেষ পর্যন্ত এটি সফলতার মুখ দেখবে কিনা এ বিষয়ে অনেকেরই সন্দেহ রয়েছে। সেজন্য সরকারকে অন্তত এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার। এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় এ প্রকল্পে অল্পদেরই স্থান দেয়া সম্ভব হবে। তার ওপর যদি উঠে দলীয়করণ আর দূর্নীতির অভিযোগ সেটা জনগণ মেনে নেয়ার কথা নয়। এ অবস্থাভাবাপন্নের দিক থেকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই পুরো প্রকল্প পরিচালনা করা উচিত।সরকার বেকারত্ব ঘুচানোর জন্য এ প্রকল্পের পাশাপাশি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিতভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে পারে। সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও অনেক জনবলের প্রচ- সংকট রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ১৪ তারিখ প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম উল্লেখ করা যেতে পারে- ‘লোকবল সংকটে ৩৮৭ রেলস্টেশনের ১০৬টিই বন্ধ। এভাবে ডাকবিভাগ, প্রাথমিক শিক্ষাসহ সরকারি বিভিন্ন সেক্টরে জনবল নিয়োগ দেয়ার অনেক পদই খালি আছে। ইতিমধ্যে ৩০তম বিসিএস-এর সার্কুলারও হয়ে গেছে। নিয়মিতভাবে নিয়োগের বিষয়টি অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন বেকার সমস্যা কিছুটা হলেও কমবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোও ভালোভাবে চলবে।বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতিহার এবং বিভিন্ন বক্তব্যে বেকারত্বের হার ২০২১ সাল নাগাদ বর্তমান ৪০ ভাগ থেকে ১৫ ভাগে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। সরকারের এ সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই নিয়োগের এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে যেমন নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, পাশাপাশি বিদেশেও যাতে অধিক হারে জনশক্তি রফতানি করা যায় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এখনও বিভিন্ন দেশে আমাদের জনশক্তি কাজ করছে। এখনও বিদেশে আমাদের শ্রমিকরা কাজ করছে। এখন বিভিন্ন দেশে যারা কাজ করছে অধিকাংশই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নয়, ফলে এরা নিম্নমানের কাজ করছে, অল্পই বেতন পাচ্ছে। সরকারি এ প্রকল্প যদি শ্রমিকদেরকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেয়, বিদেশে গিয়েও তারা ভালো কাজ পাবে, ভালো বেতন পাবে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যারোর তথ্য মতে, এপ্রিল ২০০৯ পর্যন্ত বিদেশে কর্মরত জনশক্তির সংখ্যা ৫৫ লাখেরও অধিক। যেসব দেশে আমাদের জনশক্তি আছে সরকারিভাবে সেসব দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া দেশের আইন-শৃংখলাসহ সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো রেখে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা দরকার। বেশি বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে, বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে এগুলো নিশ্চিত করা যায়।সরকারি চাকরিদানের প্রকল্প ন্যাশনাল সার্ভিসকে কার্যকরী করতে এর সচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দলীয়করণ মুক্তি আবশ্যক। চাকরির বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং প্রশিক্ষণের পর নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চাকরির বন্দোবস্তই প্রকল্পের সুফল বয়ে আনবে। বেকারত্ব দূরীকরণে সমাজের সবাইকে সরকারের পাশাপাশি কাজ করলে অমরা বেকারত্বের অভিশাপ হতে কিছুটা হলেও রেহাই পাবো।

(দৈনিক ডেসটিনি 18 march2010)