Category Archives: ঢাকা

স্বপ্নের ঢাকা!

চিরচেনা ঢাকার চিত্র এটা নয়। রাস্তায় জ্যাম নেই, নগরে মানুষ নেই; কোথাও প্রয়োজনীয় যান নেই। আবার কোথায়ও ভূরি ভূরি যান দাঁড়িয়ে আছে অথচ যাত্রী নেই, ট্রাফিক সিগন্যাল নেই, শব্দদূষণ নেই। দোকানে-মার্কেটে ভিড় নেই, গুলিস্তান ফাঁকা, ফার্মগেট ফাঁকা। ফাঁকা এরকম প্রধান স্পটগুলো। যাদের ব্যক্তিগত যান আছে তারা কয়েক মিনিটেই ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দাপিয়ে বেড়াতে পারছেন। কোলাহলমুক্ত এক শান্ত ঢাকা। ফাঁকা ঢাকা। ঈদের বন্ধেই সাধারণত ঢাকার এই চিত্র দেখা যায়। এ সময় যারা ঢাকায় থাকেন, তাদের কাছে এটাই স্বপ্নের ঢাকা, প্রত্যাশিত ঢাকা। এ সময় অনেকে বলেন, ‘সারা বছর যদি ঢাকা এমন থাকত’! আবার অনেকে লেখেন, ‘ঢাকা যদি এমন হতো’!

ঈদের ষষ্ঠ দিন হিসেবে আজও হয়তো এ চিত্র দেখা যাবে। কিন্তু কাল থেকে কে ঠেকাবে ঢাকাকে? মানুষের কোলাহল বাড়বে, যানজট বাড়বে; অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে। ঢাকা ফিরে পাবে তার আপন পরিচিতি। এই তো ঢাকা। এটাই তার চিরন্তন চেহারা। যে চেহারা দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে ফোর্বস ম্যাগাজিনে স্থান করে নিয়েছে। যে চেহারা ঘুম কেড়ে নিয়েছে নগরবিদদের। যে চেহারায় শ্রান্তি নেই ট্রাফিক পুলিশের। সরকারেরও তো মাথাব্যথার অন্ত নেই। ইতিমধ্যে নগর দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। আরও কত পদক্ষেপ যে রয়েছে তার অন্ত নেই! আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকা নগরবাসীর কথা তো বলার অপেক্ষাই নেই। এখানে চোর আছে, ডাকাত আছে; ফুটপাতে মানুষ আছে। এখানে ছিনতাই হয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়। নিজ বাসায় মানুষ খুন হয়। এসব মিলিয়েই ঢাকা। গবেষকরা হিসাব করেন, প্রতিদিন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নতুন করে ঢাকায় আসেন। আরও হিসাব করেন, প্রতি বছর ঢাকার পানির স্তর নামছে তিন মিটার হারে। ঢাকার বিষাক্ত নদীগুলো নিয়েও তো আলোচনার কমতি নেই। উইকিপিডিয়া দেখাচ্ছে, পৃথিবীর ২৭টি মেগাসিটির মধ্যে ঢাকার অবস্থান ২০, যেখানে বাস করে এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ। ঢাকা নিয়ে এরকম হিসাব আর গবেষণার সংখ্যা যে কত তারও ইয়ত্তা নেই!
ঠিক এর বাইরে এসে ঈদের চিত্রটা কেমন যেন বেখাপ্পা। ঈদের ছুটিতে কত মানুষ বাড়ি যায় তার একটা আনুমানিক হিসাব করে ১৫ আগস্ট বিবিসি বাংলা দেখিয়েছে_ ৫০ লাখ। অনেকে ধারণা করেন, অর্ধেক মানুষই গ্রামে যায়। সে হিসাবে ৭০ লাখ। সংখ্যায় যা-ই হোক, এ বিপুল সংখ্যক নগরবাসী ঢাকা ছাড়লেই বোঝা যায় ঢাকার চাপ কতটা কমেছে। ফলে এ সময় যারা ঢাকা থাকেন, একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। একটা স্বপ্নের ঢাকার নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং ঈদের সময়ের মতো যেন সারা বছর ঢাকা থাকে, তার প্রত্যাশা করেন।

তাদের প্রত্যাশিত এই ঢাকাই কি সত্যিকার স্বপ্নের ঢাকা? যেখানে কোলাহল নেই, প্রাণচাঞ্চল্য নেই। এ তো যেন ঘুমের নগরী, মৃত নগরী। এটা বাস করার জন্য স্বপ্নের শহর হয় কীভাবে। একদিকে যেমন এর স্থায়িত্ব কম, মানে মাত্র সপ্তাহখানেক সময়ের জন্য এটি আসে। অন্যদিকে এ সময় নেই কোনো অফিসিয়াল কর্মকাণ্ড। ব্যাংক বন্ধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, অফিস-আদালত বন্ধ। এ অবস্থা আসলে চলতে পারে না। ঢাকায় প্রত্যেক মানুষ কোনো না কোনো ধান্দায় আসেন এবং প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে কাজ পাচ্ছেন, থাকছেন। প্রত্যেকের বাস করার মাধ্যমেই এই ঢাকার উৎফুল্লতা। প্রাণহীন কোনো নগরী নয়। তাহলে স্বপ্নের নগরী কি অধরাই থাকছে? উত্তর হলো_ না। ঢাকার বর্তমান সব অবকাঠামো, জনসম্পদ এবং পারিপার্শ্বিকতা চিন্তা করেই স্বপ্নের ঢাকার কথা ভাবতে হবে। যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে না হোক, মোটামুটি সবাই থাকতে পারবে। তার দৈনন্দিন জীবন যাপন করতে পারবে। এ জন্য যথাযথ পরিকল্পনা দরকার। সেটা এখানকার বিষয় নয়, সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই এ নিয়ে মাথা ঘামাবেন।

ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) দেশের ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আপডেটিং গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ অব বাংলাদেশ নামে। তাতে গত সাত বছরের ভূগর্ভস্থ পানির চিত্র দেখানো হয়েছে। তাতে বলা হয়, সাত বছরে ঢাকার পানির স্তর নেমেছে ছয় মিটার। আজকের আলোচনা ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে এর সঙ্গে ঢাকার নদীগুলোও আসবে।
প্রায় সোয়া কোটি নগরবাসীর প্রতিদিন পানি জোগানের দায়িত্বে রয়েছে ওয়াসা। ওয়াসা জানাচ্ছে, প্রতিদিন পানির চাহিদা রয়েছে ২ হাজার ২৫০ মিলিয়ন লিটার। ওয়াসা প্রতিদিন ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন লিটার পানি জোগান দিতে পারে। চাহিদার তুলনায় ওয়াসা পানি কম সরবরাহ করছে, কিংবা সরবরাহকৃত পানির মানের প্রশ্ন আছে, সেটা বিষয় নয়। বিষয়টা হলো ৮৭ শতাংশই তোলা হচ্ছে মাটির নিচ থেকে।
ওয়াসা পানির ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, এতে পানির স্তর দিন দিন দ্রুত নিচে নেমে যাবে, এটা স্বাভাবিক। এখন গবেষণা হচ্ছে, পানির স্তর কতটা নিচে নেমে যাচ্ছে তা নিয়ে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সাত বছরে নেমেছে ছয় মিটার। ২০০৪ সালে যেখানে সমুদ্রস্তর থেকে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি ছিল ৪৬ মিটার নিচে, ২০১১-এ তা বেড়ে হয় ৫২ মিটার। অবশ্য ‘ওয়াটার এইড বাংলাদেশ’ বলছে, প্রতি বছর ঢাকার পানির স্তর নামছে তিন মিটার হারে।
পানির স্তর এভাবে দ্রুত নামায় একদিকে যেমন ওয়াসার পাম্প কিংবা গভীর নলকূপ থেকে পানি ওঠানো অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে এটা নগরবাসীর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বিরাট প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি হবে। ভূমিধস, খরা, পরিবেশ বিপর্যয় থেকে শুরু করে বাস্তুসংস্থান শৃঙ্খলা ভেঙে দেবে। আমাদের সামনে যে বাঁচা-মরার কঠিন বাস্তবতা উপস্থিত হয়েছে, এটা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার আগে নদী বিষয়ে যাওয়া যাক।
ওয়াসা ভূগর্ভ থেকে ৮৭ শতাংশ পানি উত্তোলন করে। বাকি ১৩ শতাংশ আসে নদী থেকে। ঢাকার চারপাশে চারটি নদী— বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা। এর মধ্যে শীতলক্ষ্যা থেকে আসে ১০ শতাংশ, বাকি ৩ শতাংশ পানি বুড়িগঙ্গার। নদী থেকে উত্তোলিত পানি শোধনাগার থেকে শোধন করে বিতরণ করা হয়। মজার বিষয় হলো, ওয়াসার পানি নিয়ে গ্রাহকদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে— খাওয়ার অযোগ্য, দুর্গন্ধ, দূষিত, ডায়রিয়ার কারণ প্রভৃতি নদীর পানির জন্য। অর্থাত্ আমাদের নদীগুলো এতটাই দূষিত যে, তা শোধনের অযোগ্য। এই ১৩ শতাংশ দূষিত পানি ওয়াসার অন্য উেসর সঙ্গে মিশে পানিকেই ব্যবহারের অযোগ্য করে ফেলে।
চারটি নদীর সবগুলোর দূষণের মাত্রা বলার অপেক্ষা রাখে না। দূষণ আর দখলে এগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। সদরঘাটে গিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়ালে যে কেউ অসুস্থ হতে পারেন। এ দূষণও আমাদের দ্বারাই হচ্ছে। হাজারীবাগ ট্যানারির বর্জ্য, ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন, কলকারখানার বর্জ্য প্রভৃতির মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে আমরা বুড়িগঙ্গাকে ধ্বংস করেছি। কঠিন ও তরল বর্জ্যে এর অক্সিজেনের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে, সাম্প্রতিক পরিবেশ অধিদফতরের পরীক্ষায় বলা হয়েছে, এখানে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারবে না।
আমাদের নদীগুলোকে এভাবে না মারলে ঢাকা শহরে পানির কোনো সমস্যাই থাকত না। পরিকল্পনা ছাড়াই আমরা পানির বিষয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করেছি আর নদীগুলোকে ইচ্ছামতো দূষিত করেছি। অথচ ঢাকাবাসী শুরু থেকেই পানির বিষয়ে যদি নদীর ওপর নির্ভরশীল হতো, নদীগুলোকে ব্যবহার করে পানির চাহিদা মেটাত, তখন নগরবাসীর স্বার্থেই নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে হতো কিংবা একে ভালো রাখার সব পদক্ষেপ প্রশাসন নিত।
এখন আমরা সব হারিয়েছি। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে এর স্তর কমিয়ে জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়েছি, নদীগুলোকে দূষিত আর দখল করে বর্জ্য ফেলে মৃত করেছি। এসব পর্ব যখন শেষ, তখনই নদী উদ্ধারের তোড়জোড় দেখছি, ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। নদী উদ্ধারে হাইকোর্ট পর্যন্ত নির্দেশনা দিয়েছে। গত বছর ‘বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ রিভার ক্লিনিং প্রজেক্টের’ নামে বাবুবাজার থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত নদীর তলদেশের বর্জ্য অপসারণ শুরু হয়েছিল। সেটাও এখন বন্ধ। আবার ওই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাগত সমস্যায় নদীতেই পড়ছে।
ঢাকাবাসীর পানির সংকট উত্তরণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে উপরিভাগের বিশেষ করে নদীর পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো ছাড়া বাঁচার কোনো পথ নেই। কর্তাব্যক্তিরাও তা মনে করছেন। ওয়াসাপ্রধান এ কথাই বলেছেন, ‘আমরা ২০২১ সাল নাগাদ ভূ-উপরিভাগের পানি বর্তমানে ১৩ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করব, আর ভূগর্ভস্থ পানি ৮৭ থেকে নামিয়ে ৩০ শতাংশে নিয়ে আসব।’ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ২০০৪ সালে ওয়াসার গভীর নলকূপ ছিল ৪৪০টি, এখন তা হয়েছে ৫৬০টি। তবুও আমরা আশাবাদী। আশা ছাড়া বাঁচার আর কোনো পথ খোলা আছে কি!

বণিক বার্তা, 30 অক্টোবর ২০১১

এই নগরীর ৪০০তম জন্মদিন(ইত্তেফাক ২০ জুলাই২০০৯)

গত ১৬ জুলাই ছিল ঢাকার ৪০০তম জন্মদিন। অর্থাৎ ১৫ জুলাই ঢাকা ৩৯৯ বছর পূর্ণ করেছে। ১৬১০ সালের এই দিনে মোগল সুলতান সুবেদার ইসলাম খাঁ ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। ৪০০ বছরের ঢাকা বলা হলেও ঢাকা তার সঠিক হিসাবে ২০১০ সালের ১৬ জুলাই পূর্ণ করবে ৪০০ বছর। ঢাকা মোটামুটি এ উপমহাদেশের প্রাচীন শহরগুলোর অন্যতম। ৩৯৯ বছর আগের ঐতিহ্যের ঢাকা বর্তমানে ১ কোটি ২৫ লাখ জনসম্পদ নিয়ে বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটির খেতাব অর্জন করেছে।

ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করা হয় এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। তখন ইসলাম খাঁ ঢাক বাজানোর নির্দেশ দেন। যে পর্যন্ত ঢাকের শব্দ পৌঁছেছিল, সেটাই হয়েছিল ঢাকার সীমানা। কেউ বলেন-ইসলাম খাঁর এই ঢাক বাজানোর নির্দেশ অর্থাৎ ঢাক শব্দ থেকে ঢাকার নাম করা হয়। অ্বশ্য নাম নিয়ে আরো কথা প্রচলিত আছে। প্রাচীন শহর ঢাকা যখন সমতট, বঙ্গ ও গৌড় প্রভৃতি জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল তখন ঢাকা নামে আঞ্চলিক ভাষা এ জনপদে প্রচলিত ছিল, তা থেকে এর নাম হয় ঢাকা। কেউ বলেছেন, ঢাকা-ঈশ্বরী বা ঢাকেশ্বরী যে মন্দির রয়েছে সে অনুসারেই এর নাম ঢাকা। আবার কারো মতে, এ অঞ্চলে প্রচুর ঢাকা গাছ জন্মাত। যা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের খুবই প্রিয়। তা থেকে ঢাকা নাম হিসেবে এসেছে।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ৩৯৯ বছর আগে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান অনুযায়ী সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতী ঢাকায় বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর সংলগ্ন টিএসসি সড়কে হরিদ্রাবর্ণের যে গেট এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেটাই-ঢাকা গেট। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে রাজধানীর নাম জাহাঙ্গীর নগর রাখা হলেও লোকমুখে ঢাকা নামটিই প্রচলিত ছিল। অবশ্য সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সে নামেরও মৃত্যু ঘটে।

সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী ছিল বিহারের রাজমহল। তখন বাংলায় চলছিল মোগলবিরোধী বার ভূঁইয়ার শাসন। মোগলরা দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে বঙ্গ বিজয়ে সফল হন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে ইসলাম খাঁ চিশতীকে রাজমহলের সুবেদার নিয়োগ করেন। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত করেন।

মোগল রাজধানী স্থাপনের পরে ঢাকাইয়া মসলিনের খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এসে বাংলার মসলিন কিনতেন। ফলে ঢাকা পরিণত হয় গোটাবঙ্গের কেন্দ্রবিন্দুতে। এরপর ঢাকার পরিচিতির সাথে রাজধানী হারিয়ে যায়। অর্থাৎ ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলি খান রাজধানীকে ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় স্থানান্তর করেন। তখন ঢাকা পরিণত হয় নায়েব-নাজিমের শাসনে। অবশ্য এখানে ব্যবসা বাণিজ্য এবং জনবসতি ছিল। এরপর ব্রিটিশ আমলে রাজধানী চলে যায় কলকাতায়।

১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ঢাকাকে আবার বাংলার রাজধানী করলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায় ঢাকা। এরপর ১৯১১ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী নিয়ে নেয়া হয় ভারতের কলকাতায়। পূর্ববাংলার মানুষের দাবির মুখে ১৯২১ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে ঢাকা আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে এক নতুন স্বাতন্ত্র্য পায় ঢাকা।

চলতি মাসের ১৬ তারিখে ঢাকার ৪০০তম জন্মদিন পূর্ণ হলো। আর আগামী বছর অর্থাৎ ২০১০ সালের ১৬ জুলাই ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি হবে। ৪০০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে চলছে নানা আয়োজন। একাডেমিক গবেষণা, স্মৃতি সংরক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচির আয়োজন করছে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন। এশিয়াটিক সোসাইটি, শত নাগরিক কমিটি, আমরা ঢাকাবাসী প্রভৃতি সংগঠন পালন করবে নানা কর্মসূচি। এসব কর্মসূচির মধ্যে ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বিবর্তন, সাহিত্য, নগরজীবন, নগর ও নারী, স্থাপনা ইত্যাদি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণার মাধ্যমে মোট ১৯টি বই প্রকাশিত হবে। এছাড়া ঢাকার ওপর এ যাবৎ লেখা প্রায় ৩ হাজার বইয়ের গ্রন্থপঞ্জি প্রকাশিত হবে। এগুলো করবে এশিয়াটিক সোসাইটি। ঢাকার ৪০০ বছর তার ঐতিহ্য আর সম্মানের। আমরা ঢাকার গৌরবময় ঐতিহাসিক এগিয়ে চলা কামনা করছি।
http://ittefaq.com.bd/content/2009/07/20/news0819.htm

এই নগরীর বাজেট (ইত্তেফাক,৬জুলাই২০০৯)

ঢাকা। আমাদের এই নগরী। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই নগরীর বাজেট ঘোষণা করেছেন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। বাজেটের পরিমাণ ১ হাজার ৪১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। বিশ্বমানের নগরী গড়ে তোলার প্রত্যয়ে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ মোট বরাদ্দের ৭৩ শতাংশ। গত ২০০৮-০৯ অর্থ বাজেটের পরিমাণ ছিল ৮১৭ কোটি ২২ লাখ টাকা।

১ হাজার ৪১১ কোটি টাকার মধ্যে নিজস্ব উৎস থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বকেয়া আয়ের খাত থেকে ২৮০ কোটি, সালামি ও ভাড়া বাবদ আয় ৬৮ কোটি, ট্রেড লাইসেন্স থেকে ৪৫ কোটি, রিকশার লাইসেন্স বাবদ ২ কোটি ৫০ লাখ, বিজ্ঞাপন ফি থেকে ১৫ কোটি, বাস ও ট্রাক টার্মিনাল থেকে ১৫ কোটি, গরুর হাট ইজারা থেকে ১৮ কোটি, রাস্তা খনন ফি থেকে ৫৩ কোটি, যন্ত্রপাতি ভাড়া থেকে ১০ কোটি, সম্পত্তি হস্তান্তর থেকে ৫৮ কোটি, অকট্রয় ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ কোটি ৫০ লাখ, শিশুপার্ক থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখ, বিদ্যুৎ বিল থেকে ৯ কোটি ৫০ লাখ ও অন্যান্য খাত থেকে ৭ কোটি টাকা।

মেয়র সরকারি অনুদান থেকে ২০০ কোটি, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প থেকে ৩২৫ কোটি এবং পিপিপিভিত্তিক প্রকল্প থেকে ২১৫ কোটি টাকা সাহায্য পাওয়ার আশা করছেন।

বাজেটে ১০২১ কোটি ৩ লাখ টাকা উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা মোট বাজেটের ৭৩ শতাংশ। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতনভাতা, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতে ২২৫ কোটি টাকা। কবরস্থান, শ্মশান ও বৌদ্ধদের শেষ কৃত্যস্থান নির্মাণ ও উন্নয়নে ৯ কোটি ৫০ লাখ। শিশুপার্ক উন্নয়নে ৩ কোটি টাকা। পার্ক, খেলার মাঠ ও নগরবাসীর বিনোদনে ৬ কোটি টাকা। আঞ্চলিক কার্যালয় ও বাজার নির্মাণ খাতে ২৪ কোটি টাকা। সুইপার কলোনি নির্মাণে ১০ কোটি। কার পার্কিং এ ২ কোটি, পরিবেশ উন্নয়নে ৮ কোটি এবং ডোবা ও জলাশয় উন্নয়নে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণে ২০ কোটি, জবাইখানা নির্মাণে ১ কোটি, স্বাস্থ্য বিভাগের পরীক্ষাগারে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৪ কোটি ও পাবলিক টয়লেট নির্মাণে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এবারের বাজেটে নতুন করে কোন কর বাড়ানো হয়নি। তবে কর-এর ক্ষেত্র বাড়ানো হয়েছে। মেয়র ঢাকার ওয়ার্ড ৯০টি থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার সুপারিশ করেছেন। নগরীর প্রাণ নদীগুলোকে বাঁচাতে “স্বাধীন নদী রক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন, ডিসিসিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন করতে এবং ওয়াসাকে ডিসিসির অধীন করতেও সুপারিশ করেন মেয়র। তিনি বলেন, নগরীকে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশ বান্ধব করে গড়ে তুলতে আগামী ৫০ বছরকে সামনে রেখে একটি মহা পরিকল্পনা হাতে নেয়া প্রয়োজন। প্রতিবছর জুন আসে। আসে নতুন বাজেট। নাগরিক উন্নয়নের বাজেট হলেও উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। নাগরিক জনদুর্ভোগ দুর্ভোগই থেকে যায়। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যানজট ইত্যাদি দুর্ভোগে নাকাল নগরবাসী। নাগরিকদের দুর্ভোগ কমাতে এ বাজেট কতটা ভূমিকা পালন করবে সেটাই দেখার বিষয়। প্রায় সোয়া কোটি মানুষ নিয়ে আমাদের এ মেগাসিটি। বিশ্বের সর্বাধিক ঘনত্বপূর্ণ মেগাসিটির বাজেট আগামীর সোয়া কোটি নগরবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনে কতটা ভূমিকা পালন করবে সেটাই দেখার বিষয়। আমরা আশা করছি বাজেটের সফল বাস্তবায়ন হবে।

Rivers of Dhaka (Daily star,31 may 2009)

Bangladesh is a country full of rivers. But at present these river are being despatched to the pages of history. We read “Dhaka stands on the river Buriganga”. This Buriganga is passing through a critical moment. Not only Buriganga, but also the other rivers around Dhaka city are going to die.

Everybody should come forward to save the rivers