Category Archives: অনুবাদ

শ্রীলঙ্কার ‘নতুন’ প্রধানমন্ত্রীর পুরোনো চ্যালেঞ্জ

প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগ দাবিতে এক মাস ধরে আন্দোলন চলছে শ্রীলঙ্কায়

মূল লেখক: মারিও আরুলথাস

ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

শ্রীলঙ্কায় ২০১৯ সালের বোমা হামলার পর গত সপ্তাহের গণবিক্ষোভে বিস্ম্ফোরণ ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা। প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগ দাবিতে গত এক মাস ধরে কলম্বোতে যে আন্দোলন চলছিল; সেখানে সরকার সমর্থকরা হামলা চালায়। আন্দোলনকারীরা পাল্টা প্রতিশোধ নেয়। ওই সময় সহিংসতায় নিহত হয় ৮ জন। সরকারি দলের শতাধিক নেতাকর্মীর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর প্রেসিডেন্টের ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে পদত্যাগ করেন এবং পালিয়ে রক্ষা পান।

এখন মাহিন্দা রাজাপাকসের জায়গায় নতুন মুখ এসেছে। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন দেশটির ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) নেতা রনিল বিক্রমাসিংহে। এর আগে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হলেও কোনোবারই তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। বলার অপেক্ষা রাখে না, দশকের পর দশক ধরে চলা শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের জের ধরেই মাহিন্দা রাজাপাকসের অবিশ্বাস্য পতন হয়।
মাত্র দুই বছর আগে শ্রীলঙ্কার জাতীয় নির্বাচনে সেখানকার বিখ্যাত রাজাপাকসে পরিবারের ভূমিধস জয় হয়। তারা দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পায়। রাজাপাকসেরা ক্ষমতায় আসীন হন। ২০১৯ সালে গোটাবায়া তাৎপর্যপূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এভাবে শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতা ও আধিপত্য নিশ্চিত হয়। প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া, প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা ছাড়াও রাজাপাকসে পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রাণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। বর্তমান পার্লামেন্টে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) একমাত্র প্রতিনিধি রনিল বিক্রমাসিংহে। যদিও তাঁর দল রাজনীতিতে এক সময় বেশ শক্তিশালী ছিল। কিন্তু গত নির্বাচনে ইউএনপি দলের ভরাডুবি হয়। Continue reading

সৈন্যবিশেষ নয়, ইসরায়েল রাষ্ট্রই শিরিনের ঘাতক

আলজাজিরার ফিলিস্তিনি সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ

মূল লেখক: মারওয়ান বিশারা 

ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

শিরিনকে অতীতের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে লেখার জন্য আমি প্রস্তুত নই। আজকে তো নয়ই, সম্ভবত কখনোই লিখতে পারব না। আলজাজিরার সংবাদিক শিরিন কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি আগ্রাসনের নির্মমতার খবর সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন। যে উন্মত্ততা তুলে ধরার কাজে তিনি সারাজীবন কাটিয়ে দেন, অবশেষে তিনি নিজেই রক্তাক্ত এই উন্মত্ততার শিকার হন। আরব বিশ্বে আবু আকলেহ একটি পারিবারিক নাম। শিরিন হয়তো শারীরিকভাবে অনেক দূরে; কিন্তু তার উপস্থিতি রয়েছে মরক্কোর রাবাত থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ পর্যন্ত অগণিত গৃহে।
শিরিন ছিলেন এক অভিজ্ঞ সাংবাদিক। ফিলিস্তিন থেকে ধ্বনিত তার সাহসী কণ্ঠ সারাবিশ্বে প্রতিধ্বনিত হতো। মৌসুমি প্রতিবেদকরা সেখানে স্বল্প সময়ের জন্য ছিলেন; আবার চলে গেছেন। কিন্তু শিরিন সেখানে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ছিলেন। তিনি তার মাতৃভূমি দখলদারদের মুখোমুখি হয়েছেন এবং কণ্ঠহীন ফিলিস্তিনির কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে গেছেন। Continue reading

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জাতিসংঘের সংস্কার

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত বিশ্বকে এটা স্বীকার করতে বাধ্য করছে, আমাদের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যর্থ

মূল লেখক : অ্যান্থনি পানকে
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত বিশ্বকে এটা স্বীকার করতে বাধ্য করছে, আমাদের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যর্থ। বিশেষ করে, তারা যুদ্ধাপরাধের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে বলে মনে হয় না। ফলে চলমান যুদ্ধটি এখনও জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের আবশ্যকতার কথা বলছে, যাতে ভবিষ্যতে আমাদের নিজেদের এমন পরিস্থিতিতে দেখতে না হয়। এই আশাবাদের কারণ হলো, ঐতিহাসিক বিভিন্ন মুহূর্তে জটিল পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে যখন শোকাহত করেছে, তখনই বড় বড় সংস্কার হয়েছে।

ঐতিহাসিক কিছু শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরার আগে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনার দাবি রাখে। প্রথমেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিষয়ে আসি। আইসিসি এর আগে কয়েক ব্যক্তির বিচার করেছে। যেমন যুদ্ধাপরাধের জন্য লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরের বিচার হয়েছে। এখন তারা ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিষয়টি অনুসন্ধান করছেন। প্রশ্ন হলো, যেহেতু ইউক্রেন কিংবা রাশিয়া কেউই রোম স্ট্যাটিউটে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, সেহেতু আইসিসি পুতিনের বিচার করতে পারবে কিনা? তা ছাড়া বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একমত, আইসিসি যদি রাশিয়ার এই নেতার বিরুদ্ধে অপরাধ পায়ও, তার পরও তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে না, কারণ তিনি এখনও ক্ষমতায় আসীন।

জেনেভা ও হেগ কনভেনশনেও যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষ ও কারাগারে বন্দিদের চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘ সনদের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে আগ্রাসী যুদ্ধের নিন্দা জানানো হয়েছে। জেনেভা কিংবা হেগ কনভেনশন বা জাতিসংঘ সনদে থাকার পরও তার বিচারের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। আর সেখানে পুতিনের বিষয়টি অকার্যকর এ জন্য যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের যে কোনো সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাশিয়ার রয়েছে। Continue reading

দ্য কাশ্মীর ফাইলস : বিজেপির প্রোপাগান্ডা

বিতর্কের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ ছবির অনুমোদন দিয়েছেন

মূল লেখক : ফয়সাল হানিফ
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

বলিউডের সাম্প্রতিক জনপ্রিয় সিনেমা ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ রিলিজ হওয়ার পর থেকেই বক্স অফিস কাঁপাচ্ছে। কারণ, এ পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবির মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক হিসেবে তকমা পাওয়া ছবিটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কাশ্মীরি পণ্ডিতরা মুসলিম অধিকৃত কাশ্মীর উপত্যকাকে কৌশলে মুক্ত করেছে। আসলে যা ঘটেছে ছবির কাহিনি সে সত্যের কাছে যায়নি। যেখানে ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে রচিত যে কোনো ছবিতে বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত, সেখানে আমরা দেখছি ভারতীয় শাসক দল বিজেপির অনুদানপ্রাপ্ত ও দলটির বিশেষ উৎসাহের ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ যেন তাদের জন্য আরও বেশি কিছু নিয়ে এসেছে। সিনেমার অতিরঞ্জিত প্লটগুলোর অন্যতম, রক্তপিপাসু মুসলিম কর্তৃক হিন্দু নারীদের খুব কাছ থেকে টার্গেট করে গুলি করা। ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের যে কোনো খারাপ কিছু ঘটার জন্য প্রতিবেশীর ওপর দোষ চাপাতে পারে।
১৯৮৯ সাল থেকে শুরু করে দুই দশকে একটি সংগঠনের হিসাবে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ৬৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ ও সরকারের হিসাবে সংখ্যাটি আরও কম। তবে গবেষক অশোক সোয়ান দেখিয়েছেন, কাশ্মীর ফাইলসে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়ানোর কথা বলছে। একই সময়ে ভারতীয় সামরিক বাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার কাশ্মীরি মুসলমানকে হত্যার কথা বলা হয়েছে, কাশ্মীরজুড়ে গ্রামে গ্রামে চিহ্নহীন গণকবরের সন্ধান এ সম্পর্কেই বলছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের অনেককেই ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জঙ্গি’ হিসেবে দেখিয়েছে; যে ‘ওয়ার অন টেরর’ কাজে লাগিয়ে তার এ বর্বরতাকে এসব ‘খারাপ লোকদের’ বিরুদ্ধে নিজেকে বাঁচানোর কৌশল হিসেবে দেখানোর সুযোগ পেয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতীয় ছবির বাজার বিশাল। হলিউডের চেয়ে বলিউডে একশ কোটিরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়। একই সঙ্গে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলো খারাপ উদ্দেশ্য সাধনে এক জোট হয়ে কাজ করার ইতিহাস আছে। রুপালি পর্দায় যে অমানবিকতা প্রদর্শিত হয় তা সাংঘাতিক। Continue reading

রোহিঙ্গা গণহত্যার মার্কিন স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার

মূল লেখক : ওয়াই ওয়াই নু
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা বলে সোমবার দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ স্বীকৃতি আমার এবং আরও অনেক রোহিঙ্গার জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এমন অবস্থায় কাটিয়েছি, যখন অনুভব করছিলাম, বিশ্ব থেকে যেন আমরা পরিত্যক্ত। বছরের পর বছর আমরা সাহায্যের আবেদন জানিয়েছি, কিন্তু এ আহ্বানে সাড়া পাইনি। আমরা যে সহিংসতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি এবং যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে; এর পরও বিশ্বের আচরণে আমরা ভাবছিলাম, বিশ্ব সম্প্রদায় বুঝি আমাদের অগ্রাহ্যের নীতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভয়ংকর সেসব ঘটনা স্মরণ আমাদের ফের ‘ট্রমা’য় ফেলছে। যখন বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের মানুষদের হত্যা করা হয়েছে, তখন অন্যরা কীভাবে তা অগ্রাহ্য করে থাকতে পারে? যখন হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে জোর করে আমাদের দেশ মিয়ানমার থেকে বের করে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারল! Continue reading

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ভারতের উভয় সংকট

মূল লেখক : শশী থারুর 
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধে ভারতের কৌশলগত দুর্বলতাসহ আরও কিছু বিষয় সামনে এসেছে। বিশ্বে দেশটির অবস্থান, তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘ মেয়াদে সম্পর্কের বিচক্ষণতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উঠছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর প্রতিবাদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ডাকা জরুরি অধিবেশনে নিন্দা প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল ভারত। প্রাথমিকভাবে ভোটের বিষয়ে ব্যাখ্যায় ভারত রাশিয়ার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি কিংবা এই আক্রমণে অনুতাপ বোধ করেনি। এমনকি ইউক্রেনের দুটি অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের স্বাধীনতায় রাশিয়ার স্বীকৃতির বিষয়েও ভারত কোনো টুঁ শব্দ করেনি।
যদিও আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইউক্রেনের এই সংকটের সমাধান করার আহ্বানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার ভারতের দীর্ঘদিনের নীতিরই চর্চা করেছেন। এ যুদ্ধে যখন মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, এমনকি ভারতের একজন শিক্ষার্থী রাশিয়ার গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং খারকিভে খাদ্য সংকটের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে, সে সময়ও মোদি সরকারের কোনো ধরনের সমালোচনা, নিন্দা ছাড়া কেবল শান্তির আলোচনা বেহুদা বৈকি।
ভারতের এই সংযমের গূঢ়ার্থ অনুধাবন করা কঠিন নয়। ভারতের অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামের অর্ধেকই জোগান দেয় রাশিয়া। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক চুক্তি তার চেয়েও বেশি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় থেকেই ক্রেমলিনের সঙ্গে ভারতের Continue reading

কর্ণাটকে হিজাব বিতর্কের রাজনৈতিক সমীকরণ

মূল লেখক : অরুণ দেব
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

ভারতের কর্ণাটকে অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিম শিক্ষার্থীদের হিজাব পরিধানে ‘বাধা’ দেওয়ার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। মঙ্গলবার এ বিষয়ে হাইকোর্টে শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী বিষয়টি নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে, যাকে ক্লাস করতে দেওয়া হয়নি। ভারতের সংবিধানের ১৪ থেকে ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিক হিসেবে ধর্মীয় অধিকার দেওয়া আছে। মুসলিম মেয়েরা মাথায় যে স্কার্ফ বা হিজাব পরিধান করে থাকে, সংশ্নিষ্ট অনুচ্ছেদে তার অনুমোদনও সেখানে মিলছে।

হিজাব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি এবং এ ক্ষেত্রে কর্ণাটকে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার পেছনে রাজনীতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আগামী বছর কর্ণাটকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রথম ঘটনা হিসেবে ২০২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর কর্ণাটকের উদুপি জেলায় সরকারি পিইউ কলেজে হিজাবে বাধা দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এভাবে একে একে মোট পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে তিনটি সরকারি আর দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভয়াবহ উপস্থিতি আমরা দেখছি। হিজাবের বিষয়টি সামনে রেখে সেখানে ভোটব্যাংক গড়ার অপচেষ্টা চলছে। কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং ভারতের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে ক্যাম্পাস ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া; সব সংগঠন এ ঘটনায় একে অপরকে দোষারোপ করছে। এর মধ্যে শুক্রবার কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী বাসভরাজ বোমাই সেখানকার শিক্ষামন্ত্রী বিসি নাগেস ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। Continue reading

বরিস জনসনের ‘পার্টিগেট’ ও ইতিহাসের বিচার

মূল লেখক : সোনিয়া পার্নেল
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ১২ জানুয়ারি যখন জ্বরভাবাপন্ন সংসদে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে কথা বলেন, তিনি কিছু সময়ের জন্য এমনভাবে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন, যেন তিনি মুক্তি চান। তাহলে কি তিনি ২০২০ সালে কভিড-১৯-এর সময়ে কঠোর লকডাউনের মধ্যেও ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টির জন্য বিরোধী সাংসদদের উচ্চস্বরে উপহাস থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রার্থনা করছিলেন? যদিও তিনি গত কয়েক মাস ধরে বলে আসছিলেন, তিনি কোনো আইন ভাঙেননি। কিংবা তিনি তার দলের ক্রুদ্ধ সদস্যদের রুদ্র মূর্তি থেকে বাঁচতে চেয়েছেন। কিংবা লাখো মানুষের করুণ চাহনি থেকে, যারা বৃহৎ স্বার্থে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে লকডাউন মেনেছিলেন, এমনকি তারা হয়তো মৃত্যুবরণকারী তাদের মা-বাবা কিংবা বন্ধুদেরও বিদায় জানাতে পারেননি।

বরিস জনসনের শো সেদিন বক্স অফিস হতে পারে কিন্তু এটি আর সেই কমেডির মধ্যে নেই, যেটি ব্রিটেনের এক সময়কার জনপ্রিয় অভিনেতার কাছে মানুষ প্রত্যাশা করে। আমি চেয়েছিলাম তার গভীর অনুশোচনা। কিন্তু তিনি ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে পূর্ণমাত্রার একটি রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেন, যার পুরোটা তারই সৃষ্টি। স্কটিশ কনজারভেটিভ নেতা ডগলাস রস থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা সবাই বরিস জনসনের বিপক্ষে। এমনকি কনজারভেটিভ সংসদরা ইতোমধ্যে অনাস্থার চিঠি দাখিল করেছেন। Continue reading

মোদির ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বনাম রাজনীতির অংক

মূল লেখক : অপূর্বানন্দ
অনুবাদক: মাহফুজুর রহমান মানিক

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় আমরা কী রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকাণ্ডের নতুন সংস্করণ দেখছি? প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঞ্জাবে নরেন্দ্র মোদির নিরাপত্তা বিঘ্নের ঘটনায় তথ্য সংগ্রহ করছে এবং এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভারতের প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ এ ঘটনায় তার উদ্বেগ জানিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট এ ঘটনায় ক্রোধান্বিত হয়েছেন। নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিপরিষদ কমিটিও এ ঘটনা গুরুতর হিসেবে নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক পুলিশ অফিসারসহ প্রায় সবাই এ ঘটনায় আগের ভয়ংকর উদাহরণ টেনেছেন। সরকার এবং বিজেপি উভয়ই পাঞ্জাব পুলিশ ও রাজ্য সরকারের দুর্বলতার কথা বলেছে এবং এর মধ্যে নোংরা রাজনৈতিক খেলার অভিযোগ আসছে। এ ঘটনার অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ হিসেবে আমরা দেখেছি, কেন্দ্র এসপিজি অ্যাক্ট অনুসারে পাঞ্জাব পুলিশ অফিসারদের বিচারের কথা বলছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং বিজেপির নীতিনির্ধারকরা ঘটনাকে পরিকল্পিতভাবে দেখে এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ পাচ্ছে এবং রক্তের বদলার বিষয়ও আসছে। সংবাদমাধ্যমও যদি এ দলে যোগ দেয় তাতেও বিস্ময়ের কিছু নেই।

সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? নরেন্দ্র মোদি পাঞ্জাবে এক সমাবেশে যাচ্ছিলেন। তখন প্রায় ২০ মিনিট উলাপুলের জ্যামে আটকে ছিল প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। হিন্দুস্তান টাইমসের খবর অনুসারে, ৫ জানুয়ারি পিরোজপুরে একটি র‌্যালিতে বক্তব্য দেওয়া ছাড়াও কিছু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ভঙ্গের কথা বলে এগুলো বাতিল করা হয়। পরে নরেন্দ্র মোদি বাথিন্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করে ঐতিহাসিক হোসাইনিওয়ালা যাওয়ার পথে কিছু প্রতিবাদকারী ওই সড়ক ব্লক করে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ফ্লাইওভারের ওপর ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষায় থাকে।  Continue reading

সু চির সাজা :মিয়ানমারের গণতন্ত্রের কফিনে আরেক পেরেক

সু চির বিরুদ্ধে এ রায়ের প্রতিবাদে মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান শহর মান্দালয় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে।

মূল : গ্র্যান্ট পেক

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে সে দেশের জান্তার আদালতে প্রথমে চার বছর, পরে বিশ্বের নিন্দায় দুই বছরের সাজা দেওয়ার ঘটনাটি দেশটির গণতন্ত্রের ওপর বছরের দ্বিতীয় আঘাত। প্রথম আঘাতটি এসেছিল এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনীর ক্যুতে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে। সু চির বিরুদ্ধে দুই মামলায় করোনা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ ভঙ্গ এবং অভ্যুত্থানকারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত সু চিকে কেবল এবারের সামরিক অভ্যুত্থান থেকেই নয়, বরং এর আগেও ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ২১ বছরের মধ্যে ১৫ বছরই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গৃহবন্দি করে রাখে। পরে সু চি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে গণতন্ত্রের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হন।

জান্তার আমলে ৭৬ বছর বয়সী সু চির এটি প্রথম সাজা। গত বছরের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে সামরিক জান্তা মিয়ানমারে ক্ষমতা দখল করে। সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি-এনএলডি ওই নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় লাভ করে। যদিও নিরপেক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা ওই নির্বাচনে বড় কোনো অনিয়ম পাননি।

সু চির বিরুদ্ধে এ রায়ের প্রতিবাদে মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান শহর মান্দালয় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ১৯৮৮ সালে গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলনের মতো সেখানেও বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান ও গান গেয়ে প্রতিবাদ জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্ববাসীও এ রায়কে প্রহসন বলে নিন্দা জানিয়েছে।

সু চির বিরুদ্ধে মামলাগুলো বস্তুত পরিকল্পিতভাবে তার ইমেজ হরণের জন্য যেমন করা হয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে পরবর্তী নির্বাচনেরও সম্পর্ক রয়েছে। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্রীয় আইন ভঙ্গসহ তার বিরুদ্ধে আরও ৯টি মামলা করেছে সামরিক জান্তা। এসব মামলায় সু চি দোষী সাব্যস্ত হলে তার ১০০ বছরের বেশি কারাদণ্ড হতে পারে। সামরিক বাহিনী তাকে গোপন স্থানে নিয়ে গেছে এবং রাষ্ট্রীয় টিভির খবর অনুসারে, সেখানেই তার সাজা দেওয়া হতে পারে।
Continue reading