Category Archives: অনুবাদ

বাংলাদেশ যেভাবে মিয়ানমারকে চাপে ফেলতে পারে

মিয়ানমারকে অপরাধী রাষ্ট্র হিসেবে তার অপরাধের জন্য শাস্তিস্বরূপ অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে

মূল : মং জারনি

গত সপ্তাহে লন্ডনে একত্রিত হয়েছিলেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের ক্রিস সিডটি, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ও বাংলাদেশের একটি বিশেষজ্ঞ দল। ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারা আলোচনা করেন। এটা এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন মিয়ানমারকে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত রোহিঙ্গাদের আদিবাস সম্পর্কে ‘মিথ্যাচারের’ জন্য দায়ী করেন। যদিও বাংলাদেশ-মিয়ানমার গত বছরের অক্টোবরে প্রত্যাবাসনের একটি চুক্তি করে, কিন্তু জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়নি। প্রত্যাবাসনের জন্য সম্ভাব্য ৮০০ গ্রামের মধ্যে মাত্র দুটি গ্রামের পরিবেশ ইতিবাচক বলে জানা যায়।

আর সমস্যাটা এখানেই। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এত বেশি রোহিঙ্গার উপস্থিতি সাধারণ কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালামের মত, চাহিদার (রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বার্ষিক পরিকল্পনা ৯২০ মিলিয়ন ডলার) মাত্র ২২ শতাংশ মিটেছে। মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় ও খাবারের বন্দোবস্ত করা বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশের জন্য বোঝাস্বরূপ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যাপ্ত সাহায্য ছাড়া কেবল ঢাকার এ শরণার্থীর বোঝা বহন করা অন্যায্য।

অধিকন্তু, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থাকরণ প্রকারান্তরে মিয়ানমারের গণহত্যাকেই স্বীকৃতি দেবে। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমারের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল নে উইনের সময়কালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পিত প্রচার শুরু করা হয়। এর পর তারা মিয়ানমারে রাখাইনের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে নৃশংস ও সন্ত্রাসী প্রচারণায় অংশ নেয়। নে উইন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারের পরবর্তী শাসনগুলোতে সামরিক কিংবা বেসামরিক উভয় আমলে সবাই একই পথে হাঁটে। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত নিপীড়নকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে।
Continue reading

ভারতে ভুয়া খবরের জমজমাট বাজার

ভারতের লোকসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে ১১ এপ্রিল ২০১৯

মূল : ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলট

গত মাসে মাইক্রোসফট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়, বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় ভারতে বেশি ভুয়া খবর বের হয়। তা না হলে শত বছর আগের সত্য কীভাবে এখন এসে মিথ্যা হিসেবে প্রচার পায়? অথচ স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন- সত্যার্থ প্রকাশ। মাহাত্মা গান্ধী লিখেছেন- দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ।
সম্প্রতি দাবি করা হয়, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট বা ইউপিএ জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ আজহারের মুক্তির জন্য দায়ী। প্রকৃত সত্য হলো, তাকে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি সরকার পাকিস্তানের হাতে তুলে দেয়। আবার প্রচারণা চালানো হয় যে, পাকিস্তান যখন ১৯৬৫ সালে ভারত আক্রমণ করে, জওহরলাল নেহরু তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অথচ তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আবার ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির মতে, জওহরলাল নেহরু ইন্দিরা গান্ধীকে কংগ্রেস সভাপতি করে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রথা চালু করেন। আসলে নেহরু বিষয়টি অনেক আগেই পরিস্কার করেন, কংগ্রেস চাইলে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে- কে তার আসনে বসবেন।
এ রকম ভুয়া খবর নিয়ে ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম। সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, গুগল ও টিকটকের মতো ইন্টারনেট অ্যাপিল্গকেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দু’দিনব্যাপী বৈঠক করেন। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুনিল অরোরা বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘আমরা চাই যাতে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে একটি নির্দিষ্ট আচরণবিধি রাখা হয়, যাতে করে এই অ্যাপগুলোকে ভুল খবর ছড়াতে ব্যবহার না করা যায়। কেন ভারতে এ রকম ভুয়া খবর প্রচার হচ্ছে? এসব খবর ভারতের জন্যই সম্মানহানিকর।’
গত পাঁচ বছরে অনেক গুজব ছড়ানো হয়। এমনকি ফটোশপে ছবি সম্পাদনা করে দেখানো হয় যে, ১৯৮৮ সালে কাবুলে আবদুল গাফফার খানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় রাজীব গান্ধী ও রাহুল গান্ধী হাজির হন। এটাও বলা হয়, ইন্দিরা গান্ধীকে মুসলিম কায়দায় সমাহিত করা হয়। ফটোশপে আরও দেখানো হয়, বর্তমান রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী আশোক গহলোট পাকিস্তানের পতাকা উড়াচ্ছেন। আরও দেখানো হয়, রোহিঙ্গারা হিন্দুদের হত্যা করে তাদের গোশত খাচ্ছে। এ রকম তালিকা আরও দীর্ঘ। Continue reading

সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করুন

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ

মূল : মাইকেল বসিরকিউ

বাংলাদেশের কক্সবাজারের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির কুতুপালংয়ে বিদেশি সাংবাদিক ও আমাদের একটি দলের সঙ্গে আলাপকালে জামিলা মিয়ানমার থেকে পালানোর অভিজ্ঞতা বলছিলেন। জামিলা বলেছেন, গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যখন সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিতরা তাদের গ্রামের ওপর হামলা করে তার স্বামী ও পুত্রকে হত্যা করে, তখন তিনি পালিয়ে আসেন। ‘এখানে আসতে আমার ১৫ দিন সময় লাগে’- তার শিশুকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে হাজির হন এ আশ্রয়কেন্দ্রে। সুফিয়া বলেছেন, ‘আমি কেবল তখনই ফিরে যাব, যখন মিয়ানমারে স্থিতাবস্থা তৈরি এবং সেখানে আশ্রয়ের নিরাপত্তা দেওয়া হয়।’

আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নেওয়া তিন সন্তানের জনক হাফিজও বলেছেন, তিনি তখনই মিয়ানমার ফিরে যাবেন, যখন কর্তৃপক্ষ তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করবেন।

তাদের গল্প আসলে সাত লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরই প্রতিচ্ছবি। যারা গত বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিক থেকে তাদের ভাষায় অবর্ণনীয় সহিংসতার মধ্য দিয়ে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আসে। ফলে তাদের প্রত্যাবাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

মিয়ানমারে অবাঞ্ছিত রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। রাখাইনে এখন সংখ্যালঘুদের খুব অল্পই রয়েছে। এখন এ অঞ্চলের সবার উচিত, একটি টেকসই সমাধানের দিকে এগোনো। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকেই। কারণ বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব নেতৃত্বের কাছে সে দাবি জানিয়েছেন। শেখ হাসিনার ভূমিকার কারণে তার সমর্থকরা তাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মানবাধিকার রক্ষায় তার ভূমিকার কারণে অনেকেই ৭১ বছর বয়সী এ নেত্রীকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা বলছেন। Continue reading

কাগজ-কলমের সম্পর্ক!

চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে কাগজ-কলমের। রোগী অসুস্থ হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র লেখেন। ব্যবস্থাপত্রে রোগের বিবরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধপথ্যের বিস্তারিত লিখে থাকেন। চিকিৎসকের সঙ্গে অল্প সময়ের সাক্ষাতের পর সুস্থতায় পরবর্তী পদক্ষেপে ব্যবস্থাপত্রই ভরসা। স্বাভাবিকভাবেই সে ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন হওয়া উচিত সহজ-সরল, সাবলীল ও বোধগম্য। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় রোগী ব্যবস্থাপত্র বোঝেন না; এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত অন্যরাও বোঝেন না। দেখা গেল, চিকিৎসক এক ওষুধ লিখলেন আর ফার্মেসি থেকে দেওয়া হলো ভিন্ন ওষুধ। তা কারও মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এ অসুবিধার জন্য গত বছরের শুরুতে আদালত থেকে রায় আসে পরিস্কার হস্তাক্ষরে ব্যবস্থাপত্র লিখতে।
বলা বাহুল্য, ব্যবস্থাপত্র সমস্যা শুধু আমাদেরই নয়। আন্তর্জাতিক সমস্যা। এমনকি যে ইংরেজিতে ব্যবস্থাপত্র লেখা হয়, সে ইংরেজির পীঠস্থান খোদ ব্রিটেনেও সম্প্রতি এ নিয়ে নির্দেশনা জারি হয়েছে। Continue reading

ডেল্টা পরিকল্পনায় বাংলাদেশের পাশে নেদারল্যান্ডস

বাংলাদেশের সদ্যবিদায়ী ডাচ্ রাষ্ট্রদূত লিওনি কুয়েলিনায়ের নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ওয়েবসাইট নেক্সটব্লুর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের পরিবেশ, পানি, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন ও এ ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা বিষয়ে

নেক্সট ব্লু :বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে পানি বিষয়ক সহযোগিতা অনেক দিনের। এর অর্জন কী?

লিওনি কুয়েলিনায়ের :হ্যাঁ, অনেক দিনের। শুরুটা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৩ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বন্যা হয়, তখন দু’দেশের প্রকৌশলীরা একত্রে কাজ করেন। সেটাই ছিল শুরু। এখনও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রকৌশলী নেদারল্যান্ডসের ডেলফটে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার এডুকেশন-আইএইচইতে কাজ করছেন। ২০১৪ সালেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেদারল্যান্ডসকে পুনরায় দুর্যোগে সহায়তা করার অনুরোধ জানান। এবারের কাজ বন্যা মোকাবেলা ও নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থাপনা তথা ডেল্টা প্ল্যান।

বাংলাদেশের ডেল্টা প্ল্যানকে ডাচ্‌ ডেল্টা প্ল্যানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ডাচ্‌ ডেল্টা প্ল্যান ২০০৮ সালে ভিরম্যান কমিশন প্রণয়ন করেছিল। বলা চলে, উভয় ডেল্টা প্ল্যানের উদ্দেশ্য একই রকম :নিরাপদ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব-দ্বীপ গড়ে তোলা। যদিও দু’দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনেক। প্রতি বছর দেশটিতে ২০ লাখ মানুষ বাড়ছে। যা হোক ২১০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ডেল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত দিক থেকে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশের ডেল্টা প্ল্যান বা এই ব-দ্বীপের পরিকল্পনা খুব জরুরি। কারণ আমরা দেখি, উপকূলীয় এলাকার অনেক গ্রাম প্রায়ই বন্যার পানিতে ভেসে যায়। লবণাক্ততা ও পানি জমে থাকার কারণে সেখানকার কৃষিজমি অনুর্বরহয়ে পড়ে। Continue reading

আসাম : ঠিকানাবিহীন ৪০ লাখ মানুষ!

৩০ জুলাই প্রকাশিত আসামে জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন তথা এনআরসির চূড়ান্ত খসড়ায় বাদ পড়ে ৪০ লাখ মানুষ

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে যখন ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক চলছে, তখন আমার মনে পড়ছে রাজা উশিনারার ঘটনা। ঘটনাটি মহাভারতের, যেটি আসলে একটি চমৎকার উদাহরণ যে, আমরা কীভাবে পোস্ট অফিসহীন মানুষের সঙ্গে আচরণ করব এবং তাদের রক্ষা করব।

ঘটনা হলো, একদিন এক ঘুঘু পাখি রাজা উশিনারার আদালতে আশ্রয় প্রার্থনা করে। পাখিটিকে একটি বাজপাখি দৌড়াচ্ছিল। রাজা বাজপাখিকে বলল, ঘুঘু পাখি তার আশ্রয়ে রয়েছে। সুতরাং তার দায়িত্ব হলো পাখিটিকে রক্ষা করা। উত্তরে বাজপাখি বলল, ঘুঘু হলো তার খাদ্য, তাকে না খেলে উপোস থাকতে হবে, সেটা সম্ভব নয়। তখন রাজা বলল, ঘুঘুর বদলে যে কোনো কিছু খেতে পার। কিন্তু বাজপাখি সিদ্ধান্তে অনড়, ঘুঘুই তার চাই। অবশেষে বাজপাখি বলল, আপনি যদি ঘুঘু পাখিকে রক্ষা করতেই চান, তাহলে আপনার শরীর থেকে কিছু গোশত দিন; তা আমি খাব। রাজা উশিনারা এ শর্তে রাজি হলেন এবং তার শরীরের গোশত থেকে বাজপাখিকে খেতে বললেন।

এ ঘটনার এক গভীর তাৎপর্য আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আমরা বাংলাদেশি শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছিলাম। তারা হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষই ছিল। যদিও আমাদের কাছে তাদের বড় পরিচয় মানুষ, মানুষ হিসেবেই আমরা তাদের সংকটে আশ্রয় দিয়েছিলাম। আর আজ আসামে খাঁটি ভারতীয়দের বাস নিশ্চিত করার জন্য আমরা তাদের নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি; তাতে ৪০ লাখ মানুষ এখন দেশে অবৈধ নাগরিক হয়ে গেছে। Continue reading

আসামের অভিবাসন রাজনীতি

নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধন বা এনআরসির মাধ্যমে আসামে খাঁটি ভারতীয় খোঁজা হচ্ছে!

ভারতবর্ষের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের অভিশংসন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেখক ও দার্শনিক এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ে কথা বলা কঠিন আর চুপ থাকা অসম্ভব।’ আর আসামের ক্ষেত্রে এটা এমন নয় যে, ঘটেছে বরং অবধারিতভাবেই ঘটানো হয়েছে। কিংবা ঘটানোর প্রক্রিয়ায় ছিল। গত দশকে যেটা ঘটে গেছে, তাকে আমাদের চারদিকের অবস্থার আলোকে বোঝা দরকার। বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের আসামের নাগরিক নিবন্ধন বা এনআরসি ও তার রাজনীতির দিকে তাকাতে হবে।

আসামে আজ যা ঘটছে, তা বুঝতে ২০১৭ বা ২০১৮ সালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে শুরু করলে হবে না, এ ক্ষেত্রে ১৯৮৩ সালের রক্তাক্ত সন্ত্রাসী ঘটনার কথা বলতে হবে, অথচ ওই ঘটনা কেউই স্মরণ করতে চান না।

যা হোক, ১৯৪৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আসামের রাজনীতিতে যখন কংগ্রেস প্রভাবশালী ছিল, তখন কংগ্রেসের বাঙালি সেটলারদের মধ্যে এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যারা সেখানে বিশ শতকের গোড়ার দিকে এসেছিল। এখন যে অভিবাসনের কথা বলা হচ্ছে, তা আসলে নতুন বিষয় নয়, সেটাও প্রায় শত বছর আগের বিষয়। সে সময় অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়া হয়, তাদের থাকার জন্য ভূমি দেওয়া হয় এবং এর ফলে তারা কংগ্রেসকে ভোট দেয়। এর বিপরীতে জনপ্রিয় মত হলো, এগুলো রাজনৈতিক বা ক্যাডার বাহিনী দ্বারা বাস্তবায়ন হয়নি। বরং রাজস্ব কর্মকর্তারা অভিবাসীদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।

আমাদের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে অবশ্য জীবনধারণ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত আসামের দাঙ্গায় যাদের পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছেন, তারা কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পাননি। তবে যারা পাঁচ হাজার করে ভারতীয় রুপি পেয়েছেন, তা ছিল সেসব মানুষের জন্য অপমানস্বরূপ, যারা তাদের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের হারায়। তাদের ধন-সম্পদ ধ্বংস করা হয়, এমনকি সেসব মানুষ বৃদ্ধ বয়সে এসেও আদালতে মামলা চালাচ্ছে।

Continue reading

রোহিঙ্গাদের জন্য আশার বাণী নেই !

একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন তো রোহিঙ্গা শিশুদেরও প্রাপ্য

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতি কক্সবাজার। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এ জেলায় গত বছর প্রথম সফরে আসি। তখন একটি বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হই, যেটি শরণার্থীরা তৈরি করেছে। এ সাঁকো কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের পূর্ববর্তী শরণার্থী শিবিরের সঙ্গে নতুন ক্যাম্পের সংযোগ স্থাপন করেছে। সাঁকোটি এখানে শরণার্থীদের যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পথ দিয়ে শরণার্থীদের ঘর তৈরির সামগ্রী, কম্বল, সোলার বাতি ইত্যাদি বিতরণ কেন্দ্র থেকে পুরনো শিবির হতে নতুন শিবিরে আনা-নেওয়া হচ্ছে। সাঁকোর নিচের পানিপ্রবাহ বৃষ্টি হলে যেন নদীতে পরিণত হয়। শরণার্থীরা প্রথম সে স্থানটি সাঁতরে পার হতো। পরে পানির ওপরে বাঁশ দিয়ে এ ব্যবস্থা তৈরি। এখন সেখানে তিনটি সাঁকো।

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থী স্রোত আসা শুরু হয় গত বছরের আগস্ট থেকে। তাতে সাত লাখ ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা আসে।

২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবসটি রোহিঙ্গাদের মতো শরণার্থীদের দুর্দশার কথা কেবল স্মরণ করেই উদযাপন নয়, বরং আমাদের উচিত, তাদের সংকটের সমাধানেও এগিয়ে আসা। আমরা যদি রোহিঙ্গাদের অন্য জীবন দেখি, সেখানে আমি অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, তাদের কারও কারও এমনকি প্রকৌশলীর গুণও রয়েছে। তাদের যদি প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়, তারা যে কোনো কিছু তৈরি করে দিতে সক্ষম। সর্বাগ্রে সাঁকো নির্মাণে তাদের সহযোগিতা করা উচিত। Continue reading

তিস্তা ইস্যুতে মমতার ওপর চাপ বাড়ছে

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে অচল হয়ে পড়েছে তিস্তা সেচ প্রকল্প

মূল : রোমিতা দত্ত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যকার তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কোনো গতিই হয়নি। কলকতার একটি পাঁচতারা হোটেলে শেখ হাসিনা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ঘণ্টার একান্ত বৈঠককে অফিসিয়ালি ‘উষ্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক’ বলা হলেও বাংলাদেশের মানুষের কানে তা অন্য যা কিছু শোনাক অন্তত মধুর শোনাবে না।

যদিও শেখ হাসিনা তার দেশের জাতীয় কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডিলিট) উপাধি নিয়ে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু তিনি তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়ে কোনো আশার বাণী নিয়ে যেতে পারেননি। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও তিস্তার বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যেতে পেরেছেন; তারপরও শেখ হাসিনা তিস্তার বল মমতা কোর্টে ফেলেছেন বলে বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ওপর চাপ বাড়ছে।

এ বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। বিরোধী দল বিএনপি ইতিমধ্যেই তিস্তার পানি না পাওয়ার বিষয়টিকে একটি বড় নির্বাচনী ইস্যু বানিয়েছে, যেটি হাসিনা সরকারকে বেকায়দায় ফেলছে। আওয়ামী লীগের ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণেও এ ইস্যুতে দলটি সমালোচিত হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের কারণেই বিএনপি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিস্তা নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে।

শেখ হাসিনাও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পূর্বের সব বৈঠকে বিষয়টির ওপর বারবার জোর দিয়েছেন; যেহেতু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি বিরাট এলাকাজুড়ে তিস্তার পানি প্রয়োজন এবং পানি না পাওয়ার কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি প্রায় সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পানির প্রশ্নে বেঁকে যান। মমতার পানি না দেওয়ার মধ্যেও রাজনীতি রয়েছে। তার ভাবনায় হয়তো পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা এলাকার কৃষকও রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে অচল হয়ে পড়েছে তিস্তা সেচ প্রকল্প। রংপুর অঞ্চল মরুকরণ হচ্ছে। মৎস্য চাষ ও নদীভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা অদৃশ্য হয়ে গেছে। Continue reading

ট্রাম্পের শান্তির ঝুলিতে ফিলিস্তিনিদের লাশ

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের প্রতবাদে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে ইসরায়েলের হামলা

মূল : ডানা মিলব্যাঙ্ক

টিভির পর্দায় সম্পূর্ণ দুটি পৃথক দৃশ্য আমরা দেখছি। সোমবার যখন ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনের গাজায় বিক্ষোভরত মানুষকে হত্যা করছে, তখন তারই ৫০ মাইল দূরে জেরুজালেমে চলছে উৎসবের আমেজ। জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেখানে মার্কিন দূতাবাস খোলার আনন্দ উদযাপন করছেন। একই সঙ্গে তারা পরস্পর শান্তির প্রতি তাদের অনুরাগের প্রশংসা করছেন!

যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন সুলিভান ঘোষণা করেছেন, তেলআবিব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর শান্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার এক দৃপ্ত পদক্ষেপ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এক ভিডিওবার্তায় ‘শান্তিচুক্তি স্থায়ীকরণে’ তার প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তার জামাতা জ্যারেড কুশনারও একই কথা বলেছেন- ‘শান্তি নাগালের মধ্যে আসছে’ মানে শান্তি প্রতিষ্ঠা হলো! ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরেক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘আজকের দিনটি শান্তির জন্য এক মহান দিন।’

তাদের এই ‘শান্তির’ই নিদর্শন হলো ৬০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা, ২৭০০ আহত করা আর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শত্রুতার পুনর্বীজ বপন। এভাবে পুরো অঞ্চলে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের ‘শান্তির’ বার্তা।

ট্রাম্প জামাতা কুশনার দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘শান্তি আনয়ন প্রচেষ্টার’ দায়িত্বে রয়েছেন। শান্তির এই দূতই তখন ফিলিস্তিনিদের নিন্দা করতে ভোলেননি। কুশনার বলেন, আমরা ফিলিস্তিনিদের তরফ থেকে যে বিক্ষোভ দেখে আসছি, এমনকি আজও দেখছি, এসব সহিংসতা সমস্যারই অংশ, সমাধানের নয়। ইসরায়েলকে তাদের হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাতে ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র অস্বীকার করেছেন। Continue reading