Monthly Archives: জানুয়ারি ২০১৮

স্বপ্ন ফেরি করা লাল বাস

অপেক্ষা লাল বাসের জন্য। প্রতীক্ষাটা কত সময়ের? ক্লাস শেষ, বাস আসবে, সবাই হুড়মুড়িয়ে উঠবে। পাঁচ-দশ মিনিট কিংবা আধা ঘণ্টা। না! ‘লাল বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে ফেসবুক পেজে একজন লিখেছেন- ‘৬ মাস ধরে ডিইউতে [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে] বসবাস করছি; লাল বাসে চড়ার ইচ্ছাটা কবে যে পূরণ হবে…।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার পরও হয়তো নানা কারণে তার লাল বাসে চড়ার সুযোগ হয়নি। তিনি এখনও সুযোগের অপেক্ষায়। তার অপেক্ষা মাত্র ছয় মাসের। কারও অপেক্ষা তো ১৯-২০ বছরের! একজন লিখেছেন, ১০টি কারণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার প্রথমটিই- লাল বাস।
লাল বাসের কী এমন মাহাত্ম্য যেটা স্বপ্ন হতে পারে? ঢাকার বুক চিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসগুলো কেবল দাপিয়েই বেড়ায় না, শিক্ষার্থী পরিবহনই করে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজই করে না; বরং স্বপ্নও ফেরি করে বেড়ায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অলঙ্কৃৃত ক্ষণিকা, চৈতালি, বৈশাখী-বসন্ত, উয়ারী-বটেশ্বর, হেমন্তসহ একঝাঁক লাল বাস যখন ঢাকার রাস্তায় চলে, তখন হাজার হাজার কিশোর-কিশোরীর মনে স্বপ্ন জাগায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রেরণা দেয়।
চোখ-ধাঁধানো লাল রঙের বাস দেখার পর হয়তো তা অনেকক্ষণ মানসপটে ভেসে থাকে। বাসের রঙ লাল হওয়ার বিশেষত্ব কি এখানেই? Continue reading

‘বঞ্চনার কারণেই বাংলাদেশের জন্ম’

মূল : বাবর আয়াজ

নওয়াজ শরিফ একবারে সত্যবাদী বা বিশ্বস্ত না-ও হতে পারেন; তবে পূর্ব পাকিস্তানের বিভক্তি ও বাংলাদেশের জন্মের ব্যাপারে তিনি পাকিস্তানকে যে আত্মানুসন্ধানের কথা বলেছেন, তা ভুল বলেননি। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার পরিবর্তে কিছু উগ্র দেশপ্রেমিক সংবাদমাধ্যমে তাকে একহাত নিয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের বোকামির কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন- নওয়াজের এ কথায় বেশ চটেছেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) এক জ্যেষ্ঠ নেতা।

আমিও নওয়াজ শরিফের বক্তব্য সমর্থন করে বলছি, এখনি সত্য স্বীকারের উপযুক্ত সময়, সেটি যতই তিক্ত হোক না কেন।

বাংলাদেশের জন্ম কেবল পূর্ব পাকিস্তানে আট মাসের সামরিক যুদ্ধের ফল নয়; বরং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে উপনিবেশস্বরূপ যে আচরণ করেছে, তারই ফল। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারত সমর্থন করে, এর মাধ্যমে তারা দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা বিশ্বের কাছে দেখানোর সুযোগ পায়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্ট করেন। এরপর ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, বাংলা প্রদেশের ভাষা হতে পারে বটে; তবে আমি স্পষ্ট করে বলছি, অন্য কোনো ভাষা নয়, উর্দুই হতে পারে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এটি বাঙালিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কারণ এতে তারা পাঞ্জাবি বা পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যারা ভালো উর্দু বুঝত, তাদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে।

Continue reading

রোহিঙ্গা সংকট : বিশ্বের লজ্জাজনক নীরবতা

মূল : মাইকেল শাম্মাস

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, ত্রাণের আশায়…

চার বছর আগে একদিন আরামদায়ক এক কফিশপে বসে সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে হাফিংটন পোস্টের জন্য লিখছিলাম। দুঃখজনকভাবে সে যুদ্ধ এখনও প্রাসঙ্গিক। কারণ, সিরিয়ায় মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদের মৃত্যুর কারণ একটাই- ঘাতকরা তাদের চেয়েও শক্তিশালী। এত মানুষ মারা গেল, অথচ বিশ্ব কিছুই করল না। আমাদের দেশও (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) কিছু করল না। মুখোশ পরিহিত কিছু ব্যক্তি সিরিয়ার হাওলা ও ইদলিব নগরীর হোমস ও লাতাকিয়া ঘুরল; তারা স্বামীকে হত্যা করে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে সন্তানদের গণ্ডদেশে পিস্তল ধরে; একটু আগে যেখানে মা-বাবা আদরের পরশ বুলিয়েছিল। ঘটনাটি দেখল বিশ্ব। নির্দয়ভাবে শিশুটির মাথায় গুলি চালায়। আজও একই ঘটনা সেখানে ঘটছে। আমিও কফিশপে বসে নতুন লেখা লিখছি। কারণ আপনারা আমার লেখা পড়ছেন।

তখন এ রকম যে কোনো ঘটনা ঘটার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১৩-১৭) জন কেরি অফিস ত্যাগের ঠিক আগে হত্যার কথা স্বীকার করে বলেন, সিরিয়ায় সরকারি ও বিরোধী উভয়েই গণহত্যা চালাচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানবতা সম্পর্কে এখন দুটি বিষয় সত্য- একটি হলো, মানবতা প্রায়শ নিষ্ঠুরতার পথ দেখায়। দ্বিতীয়টি হলো, আমাদের স্মৃতিশক্তি কম। কারণ, মিয়ানমারে সিরিয়া ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি দেখলাম আমরা, সংঘটিত হলো রোহিঙ্গা গণহত্যা। এক বর্বর শাসন কেবল মুসলিম বিশ্বাসের কারণে হত্যাযজ্ঞ চালায়। বিশ্বের প্রতিক্রিয়া হয় কমই; বলা চলে এখন সবাই নীরব।

আন্তর্জাতিক বিশ্বের উদাসীনতার সুযোগে মিয়ানমার যেন বাশার আল আসাদের অমানবিকতাকে অনুসরণ করছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে, তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে বৌদ্ধদের সহায়তায় হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। গোঁড়া বার্মিজরা বলছে, রোহিঙ্গা কেবল বার্মিজদেরই নয়, মানবতারও শত্রু। তারা কীটপতঙ্গের মতো। এদের মানবাধিকার রক্ষায় আমরা দায়বদ্ধ নই। বরং আমরা তাদের নির্মূল করি। Continue reading

আসামে নতুন তালিকার রাজনীতি

মূল : দেবর্ষি দাস

আসামে নাগরিক তালিকার মাঠ পর্যায়ের নিরীক্ষা

আসামে নতুন করে নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধন বা এনআরসির প্রথম খসড়া তালিকা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে সর্বানন্দ সান্যাল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়েরই কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে। এ সমস্যাকে অসমিয় বনাম বাঙালি কিংবা স্থানীয় বনাম অভিবাসী, এমনকি হিন্দু বনাম মুসলিম সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি আরও জটিল সমস্যা।

আসামে বিদেশি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অনেক দিন ধরেই চলছে। স্নেহলতা দত্ত নামে ৮৬ বছরের এক অর্ধ-পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধকে তিন মাস ধরে অবৈধ অভিবাসী আইনে কারারুদ্ধ করা হয়। অথচ তার জামাতা মুকুল দের মতে, স্নেহলতার পরিবার দেশভাগের আগে থেকেই আসামে বাস করে আসছে। মারিজান বিবির (৪১) ঘটনা এ রকমই। সঠিক কাগজপত্র দেওয়ার পরও তাকে বিদেশি শিবিরে আটক করা হয় এবং তাকে তার দেড় বছর বয়সী সন্তান থেকে পৃথক করা হয়। আমার এক আত্মীয়কেও এভাবে আটক করে এক মাস রাখা হয়। কারণ বিয়ের আগে ও পরের নামে মিল ছিল না।

আসামে বিদেশি গ্রেফতারের নামে আসলে এ রকম চরিত্রেরই মঞ্চায়ন করা হচ্ছে। নাগরিক নিবন্ধনের নতুন তালিকা করা বিদ্যমান তালিকার চেয়েও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। ১৯৮০’র দশকে বিদেশি নাগরিকদের আটক করার জন্য আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এটি ১৯৮৫ সালে আসাম অ্যাকর্ড নামে পরিচিত- যেখানে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর যারা আসামে প্রবেশ করেছে তারাই বিদেশি। তাদের শনাক্ত করে বিতাড়িত করা হবে। কিছু মানুষ বিতাড়ন করাও হয়। ২০১২ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা ২৪৪২। তবে ৫৪ হাজার জনকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাহলে কি খুব বেশি মানুষকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি? Continue reading

ট্রাম্পের টুইট, কেএফসির প্যারোডি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের মধ্যকার শত্রুতা, বাগ্‌যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার বারবার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা বিশ্বে আলোচনায় এসেছে এবং দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় ট্রাম্প-কিমের মধ্যে বাদানুবাদ হয়েছে। কিম যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেন, ট্রাম্পও পাল্টা জবাব দেন। নতুন বছরে কিম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বার্তা দেন যে, সবসময়ই পারমাণবিক অস্ত্রের বোতাম থাকে তার টেবিলে। প্রত্যুত্তরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩ জানুয়ারি টুইটারে যা লেখেন, বাংলা করলে দাঁড়ায়- উত্তর কোরিয়ার নেতা একটু আগেই বলেছেন যে, ‘সব সময় পারমাণবিক অস্ত্রের বাটন তার টেবিলে থাকে।’ কেউ কি তার গ্রাসকৃত ও ক্ষুধার্ত শাসন থেকে তাকে জানাবেন যে, আমারও একটি পারমাণবিক বোতাম রয়েছে, যেটি তারটির চেয়েও বড় ও শক্তিশালী। আর বোতাম কিন্তু যথার্থ অর্থেই কাজ করে! ট্রাম্পের এ বার্তা আলোচনার আগেই এ বার্তাকে কেন্দ্র করে আরেক বার্তা সামনে আসে। যেটি কিমের নয়, কেএফসির! হ্যাঁ, ফায়েড চিকেনের জন্য বিখ্যাত কেএফসির। যুক্তরাষ্ট্র ও আয়ারল্যান্ডের কেএফসি ট্রাম্পের টুইটের ভাষা অনুসরণে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাকডোনাল্ডের উদ্দেশে প্যারোডি করে টুইট করে: ম্যাকডোনাল্ডের নেতা রোনাল্ড মাত্রই বলেছেন যে, ‘তার টেবিলে সবসময় বার্গার থাকে।’ কেউ কি তার বড় জুতা ও লাল নাকের শাসন থেকে তাকে জানাবেন যে, আমার টেবিলেও বার্গার থাকে। তবে আমারটা বাক্সে থাকে, এটি তারটির চেয়ে বড় ও শক্তিশালী। আর আমারটায় কিন্তু মাংসের ঝোলও আছে! Continue reading

ইরানে বিক্ষোভের নেপথ্যে

মূল : আহমাদ সাদরি

ইরানে চলমান বিক্ষোভের সূচনা ২০০৯ সালে, তেহরানের মধ্যবিত্তরা ছিল এর নেতৃত্বে। এখন সেখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে নিম্নবিত্ত ও প্রাদেশিক শহরের দরিদ্র প্রতিবেশী বেকাররা। সংকট গভীর হয়েছে ইরানে স্বৈরাচারী শাসনের ফলে। সেখানে সংস্কার আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে; কারণ, সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতা সর্বাধিক ক্ষমতার অধিকারী। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও সংসদের সে ক্ষমতা নেই। ফলে প্রশাসনিক পদ্ধতি অস্বচ্ছই থাকছে। এসব বিষয় জনগণের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তবে ২০০৯ সালের বিক্ষোভ একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে দক্ষ নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের দ্রুতই গ্রেফতার, নির্যাতন ও আটক করা হয়। রাস্তার আন্দোলন নির্দয়ভাবে দমন করা হয়।

আহমেদিনেজাদের দ্বিতীয় মেয়াদ প্রথম মেয়াদ থেকেও খারাপ ছিল। জাতিসংঘের অবরোধের ফলে অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০১৩ সালে মানুষ হাসান রুহানিকে মধ্যপন্থি হিসেবে নির্বাচিত করে। তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু মৌলিক কোনো সংস্কার বা উদারীকরণ হয়নি।
প্রথম মেয়াদে হাসান রুহানি মুদ্রাস্ম্ফীতি রোধ করেছিলেন। বেকারত্বও অনেকাংশে কমে আসে। ইতিমধ্যে ইরানের চিরবৈরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিও সম্পন্ন হয়। কিন্তু তার দ্বিতীয় মেয়াদ কাঙ্ক্ষিতভাবে শুরু হয়নি।
প্রথমত, রুহানি ডানপন্থিদের চাপে একটি রক্ষণশীল মন্ত্রিসভা গঠন করেন। হতাশ হয়ে আমরা যেন খাতামির দ্বিতীয় মেয়াদ দেখছিলাম। বিষয়টি আরও খারাপ হয়, যখন ট্রাম্পের আমেরিকা পরমাণু চুক্তির শর্ত ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে। ফলে একটি আশার আলো অঙ্কুরেই বিনাশ হলো।
Continue reading