Monthly Archives: আগস্ট ২০১২

স্বপ্নের ঢাকা!

চিরচেনা ঢাকার চিত্র এটা নয়। রাস্তায় জ্যাম নেই, নগরে মানুষ নেই; কোথাও প্রয়োজনীয় যান নেই। আবার কোথায়ও ভূরি ভূরি যান দাঁড়িয়ে আছে অথচ যাত্রী নেই, ট্রাফিক সিগন্যাল নেই, শব্দদূষণ নেই। দোকানে-মার্কেটে ভিড় নেই, গুলিস্তান ফাঁকা, ফার্মগেট ফাঁকা। ফাঁকা এরকম প্রধান স্পটগুলো। যাদের ব্যক্তিগত যান আছে তারা কয়েক মিনিটেই ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দাপিয়ে বেড়াতে পারছেন। কোলাহলমুক্ত এক শান্ত ঢাকা। ফাঁকা ঢাকা। ঈদের বন্ধেই সাধারণত ঢাকার এই চিত্র দেখা যায়। এ সময় যারা ঢাকায় থাকেন, তাদের কাছে এটাই স্বপ্নের ঢাকা, প্রত্যাশিত ঢাকা। এ সময় অনেকে বলেন, ‘সারা বছর যদি ঢাকা এমন থাকত’! আবার অনেকে লেখেন, ‘ঢাকা যদি এমন হতো’!

ঈদের ষষ্ঠ দিন হিসেবে আজও হয়তো এ চিত্র দেখা যাবে। কিন্তু কাল থেকে কে ঠেকাবে ঢাকাকে? মানুষের কোলাহল বাড়বে, যানজট বাড়বে; অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে। ঢাকা ফিরে পাবে তার আপন পরিচিতি। এই তো ঢাকা। এটাই তার চিরন্তন চেহারা। যে চেহারা দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে ফোর্বস ম্যাগাজিনে স্থান করে নিয়েছে। যে চেহারা ঘুম কেড়ে নিয়েছে নগরবিদদের। যে চেহারায় শ্রান্তি নেই ট্রাফিক পুলিশের। সরকারেরও তো মাথাব্যথার অন্ত নেই। ইতিমধ্যে নগর দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। আরও কত পদক্ষেপ যে রয়েছে তার অন্ত নেই! আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকা নগরবাসীর কথা তো বলার অপেক্ষাই নেই। এখানে চোর আছে, ডাকাত আছে; ফুটপাতে মানুষ আছে। এখানে ছিনতাই হয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়। নিজ বাসায় মানুষ খুন হয়। এসব মিলিয়েই ঢাকা। গবেষকরা হিসাব করেন, প্রতিদিন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নতুন করে ঢাকায় আসেন। আরও হিসাব করেন, প্রতি বছর ঢাকার পানির স্তর নামছে তিন মিটার হারে। ঢাকার বিষাক্ত নদীগুলো নিয়েও তো আলোচনার কমতি নেই। উইকিপিডিয়া দেখাচ্ছে, পৃথিবীর ২৭টি মেগাসিটির মধ্যে ঢাকার অবস্থান ২০, যেখানে বাস করে এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ। ঢাকা নিয়ে এরকম হিসাব আর গবেষণার সংখ্যা যে কত তারও ইয়ত্তা নেই!
ঠিক এর বাইরে এসে ঈদের চিত্রটা কেমন যেন বেখাপ্পা। ঈদের ছুটিতে কত মানুষ বাড়ি যায় তার একটা আনুমানিক হিসাব করে ১৫ আগস্ট বিবিসি বাংলা দেখিয়েছে_ ৫০ লাখ। অনেকে ধারণা করেন, অর্ধেক মানুষই গ্রামে যায়। সে হিসাবে ৭০ লাখ। সংখ্যায় যা-ই হোক, এ বিপুল সংখ্যক নগরবাসী ঢাকা ছাড়লেই বোঝা যায় ঢাকার চাপ কতটা কমেছে। ফলে এ সময় যারা ঢাকা থাকেন, একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। একটা স্বপ্নের ঢাকার নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং ঈদের সময়ের মতো যেন সারা বছর ঢাকা থাকে, তার প্রত্যাশা করেন।

তাদের প্রত্যাশিত এই ঢাকাই কি সত্যিকার স্বপ্নের ঢাকা? যেখানে কোলাহল নেই, প্রাণচাঞ্চল্য নেই। এ তো যেন ঘুমের নগরী, মৃত নগরী। এটা বাস করার জন্য স্বপ্নের শহর হয় কীভাবে। একদিকে যেমন এর স্থায়িত্ব কম, মানে মাত্র সপ্তাহখানেক সময়ের জন্য এটি আসে। অন্যদিকে এ সময় নেই কোনো অফিসিয়াল কর্মকাণ্ড। ব্যাংক বন্ধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, অফিস-আদালত বন্ধ। এ অবস্থা আসলে চলতে পারে না। ঢাকায় প্রত্যেক মানুষ কোনো না কোনো ধান্দায় আসেন এবং প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে কাজ পাচ্ছেন, থাকছেন। প্রত্যেকের বাস করার মাধ্যমেই এই ঢাকার উৎফুল্লতা। প্রাণহীন কোনো নগরী নয়। তাহলে স্বপ্নের নগরী কি অধরাই থাকছে? উত্তর হলো_ না। ঢাকার বর্তমান সব অবকাঠামো, জনসম্পদ এবং পারিপার্শ্বিকতা চিন্তা করেই স্বপ্নের ঢাকার কথা ভাবতে হবে। যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে না হোক, মোটামুটি সবাই থাকতে পারবে। তার দৈনন্দিন জীবন যাপন করতে পারবে। এ জন্য যথাযথ পরিকল্পনা দরকার। সেটা এখানকার বিষয় নয়, সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই এ নিয়ে মাথা ঘামাবেন।

গুদামে করুণ মৃত্যুর দায় কার?

পাঁচ-পাঁচটি লাশ। বলা হচ্ছে তারা রাতে ঘুমিয়েছেন, ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের ওপর সিমেন্টের বস্তা পড়ায় এই লাশ হওয়া। আলোচনার আগে খবরটা একটু জানা যাক। সমকালসহ প্রায় সবক’টি দৈনিক ৩০ জুলাই ‘নারায়ণগঞ্জে সিমেন্টের বস্তাচাপায় ৫ শ্রমিক নিহত’ শিরোনামে বলেছে_ ঘটনাটি ঘটেছে ২৯ তারিখ রোববার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, যেখানে একটি নির্মাণাধীন বিনোদন পার্কের গুদামে ঘুমানোর সময় কর্মরত পাঁচজন শ্রমিক সিমেন্টের বস্তার নিচে চাপা পড়ে মারা যান। কারণ হিসেবে পার্ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আরকে গ্রিনল্যান্ড বলছে_ ওই দিন সকাল ৮টায় ভূমিকম্পের ফলে সিমেন্টের বস্তার স্তূপ থেকে বস্তা পড়ে তারা নিহত হন।
 ন্যায্যতার বিচারে হয়তো তাদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য এবং ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু শ্রমিকদের সূত্র বলছে, সেদিন সকাল ৭টায় সব শ্রমিক কাজে যোগ দিলেও ওই পাঁচ শ্রমিক যোগ দেননি। এমনকি অন্য শ্রমিকরা তাদের না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে গুদামঘরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রহরীরা তাদের বাধা দেয় এবং গুদামে তালা মেরে চলে যেতে চেষ্টা করে। তখন সময় সকাল সাড়ে ৭টা। আর তারও পর ৮টায় ভূমিকম্প হয় এবং ভূমিকম্পের পর তখন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে পড়লে প্রহরী তালা খুলতে বাধ্য হয়। শ্রমিকরা তখন গুদামে প্রবেশ করে বস্তাচাপা পড়া মৃতদেহগুলো দেখতে পান।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আসলে তাদের মৃত্যু আগেই হয়েছে; ভূমিকেম্প বস্তা চাপা পড়ায় তাদের মৃত্যু  হয়েছে কিনা এ বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে, কারণ ভূমিকম্প হয়েছে আটটায়। আগে যদি মৃত্যু না হতো তাহলে সকাল সাতটায়-ই তারা কাজে যোগ দিতো। এটা আরও স্পষ্ট হয় যখন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে অন্য শ্রমিকরা কোথাও খোজাখুজি করে তাদের সঙ্গীদের পায়নি, তখন গুদামে খুজতে চাইলেও গুদামের প্রহরী তাদেরকে প্রবেশ করতে দেয়নি, যেটা শ্রমিকরা বলছে- আগে গুদাম ঘরে প্রবেশ করতে কখনোই বাধা দেয়া হতো না। এবং এর পক্ষে আরও বলা যায়- কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের অনুরোধ করেছিলো তারা যেন ভূমিকম্পকেই শ্রমিকদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখেন।
মজার বিষয় হলো, ঠিক এ খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরও এ ঘটনায় কোন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি, এমনকি পরের দিন অর্থাৎ ৩১ জুলাই কয়েকটি পত্রিকা ফলোআপ সংবাদ করেছে, যে এ ঘটনায় থানায় কেউ কোন অভিযোগ করেনি, কোন মামলা হয়নি; কেবল থানায় একটি জিডি হয়েছে। কর্মরত শ্রমিকরা এতে হতবাক হয়েছেন। এমনকি রবিবার রাতেই ময়নাতদেন্তর পর লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও তাদেরকে কোন ক্ষতিপূরণ দিয়েছে বলে কোন সংবাদও প্রকাশ হয়নি। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ নিয়ে কেউ কোন কথা বলছে না, এমনকি শ্রমিক সংগঠনগুলোও নিরব ভূমিকা পালন করছে, যারা ব্যবস্থা নিবে সে প্রশাসনতো তারও আগে চুপ।
এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, পাঁচজন জ্যান্ত মানুষ লাশ হলো, অথচ কারোও এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই? সত্যিই যদি ভূমিকম্পেই তারা মারা গিয়ে থাকেন, তার জন্যও তো তদন্ত কমিটি গঠন করা আবশ্যক। সংশ্লিষ্ট কোম্পানী কোনভাবেই এ ঘটনার দায় এড়াতে পারে না, কোনভাবেই তারা এ ঘটনায় পার পেতে পারে না। শ্রমিক অধিকারের কথা বলা এখানে অর্থহীন। তবে এটাতো ঠিক কর্তৃপক্ষ তার কাজ নিরবিচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে নিতে অন্তত তার শ্রমিকদের রাতে মাথা গোজার ঠাই দিবেন। যেখানে ৩০০ শ্রমিক কাজ করেন, শ্রমিকদের অভিযোগ এর মধ্যে কয়েকজনের থাকার মত বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি টিনশেড ঘর আছে। যেগুলোতে একদিকে থাকার পরিবেশ নেই, অন্যদিকে সবার স্থান সংকুলানও হওয়ার মত নয়। বাধ্য হয়েই শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্নস্থানে রাত যাপন করতো, এমনকি সিমেন্টসহ অন্যান্য মাল রাখার গুদাম ঘরেও। কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা এখানে স্পষ্ট এবং একে কোনভাবেই দুর্ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না।
বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রতি মালিকপক্ষের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা সব ক্ষেত্রেই রয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী পাওনা নিয়েই তাদেরকে মাঠে নামতে হয়। শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ নাই, থাকার নিরাপত্তা নাই, তাদের মজুরীও খুব কম। এবং প্রায়শই বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান শ্রমিকরা। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে বিভিন্ন সময়ে আগুনে অনেক শ্রমিক পুড়ে মারা যান। তাদের ক্ষতিপূরনও মালিকপক্ষ দায়সারা গোছের দেন, যেমন ২০১০ এর ২৫ ফেব্রুয়ারী গাজীপুরের একটি কারখানায় আগুন লেগে ২১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ক্ষতিপুরণ হিসেবে তাদের পরিবারকে দেয়া হয় এক লক্ষ টাকা করে, এটা হয়তো টাকার অঙ্কে কম। কিন্তু এ ঘটনায় যেটা দেখাগেলো ক্ষতিপূরণ দিবে দূরে থাক কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়ই স্বীকার করেননি কেবল দুর্ঘটনা বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
মারা যাওয়া পাঁচজন শ্রমিক তিনটি পরিবারের- বাবা ও ছেলে, মা ও ভাগ্নে এবং আরেকজন। তাদের পরিবারগুলোর কথা ভাব যায়? যারা তাদেরকে অবলম্বন করে বেঁচে আছেন, তাদেরকে নিয়েই স্বপ্ন দেখেন। তাদের স্বপ্নগুলো হারিয়ে গেছে- এ শ্রমিকরা কারো স্বামী, কারো ভাই, কারো ছেলে আবার কারো প্রাণপ্রিয় বাবা। তাদের কি হবে? নিশ্চয়ই প্রত্যেকটি পরিবারের মাতম শুরু হয়ে গেছে। তাদের রোজা আর সামনের ঈদ এখন শুধুই হাহাকার। আর আমাদের মালিকপক্ষ আজীবন কেবল শ্রমিকদের ঠকিয়েই যাবে। শ্রমিকদের অর্থ নেই, বিত্ত নেই, আছে কেবল শ্রম দেয়ার ক্ষমতা- হাত, পা, শরীর। যা দিয়ে তারা কলুর বলদের মত খেটেই যান। কিছু হলে এসব মজলুম শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলার কেউ নাই, কেউই নাই।