Monthly Archives: জুন ২০১২

মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় কেন আগ্রহী নয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে এসেছে বা পড়াশোনা করছে এরকম কাউকে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায় কিনা? প্রশ্নটি করলে অধিকাংশের ক্ষেত্রে একটা সহি উত্তর আসতে পারে- না। শিক্ষকতা পেশা হিসেবে মহান হলেও এবং এরা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকতা করলেও, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে ক্ষেত্রে এই না আসার একটাই কারণ বেতন-ভাতা। বিষয়টা আলোচনার জন্য সমকালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি গুরুত্বপুর্ণ। ২৪ জুন প্রকাশিত পত্রিকাটি ‘শিক্ষকতায় অনীহা মেধাবীদের’ শিরোনামে বলছে দেশের মেধাবী তরুণ-তরুনীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে দিন দিন অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনটি বিশেষত: দুটি বিষয়কে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে- কম বেতন ভাতা এবং কম সামাজিক সম্মান ।
প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক হলেও এ বিষয়টি আসলে আমাদের দেশের অনেক আগের সমস্যা। এটা নিয়ে লেখালেখি বা আলোচনা-সমালোচনা এবং একইসঙ্গে  সরকারের প্রতিশ্রুতি যে কম হয়েছে তাও নয়। এ পেশায় আসার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে যে বিষয়গুলো রয়েছে তা দেখলে সহজেই এটা বলা যায়Ñ অনীহা আসলে মেধাবীদের নয়, বরং সমাজ এবং রাষ্ট্রই মেধাবীদের এই পেশায় আসতে দিচ্ছে না। কোন পেশা যত মহতই হোক তারা দ্বারা যদি কারও পেট না চলে সে পেশায় আসবে না এটাইতো স্বাভাবিক। সমকাল দেখাচ্ছে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে এবং কলেজ পর্যায়ের প্রারম্ভিক বেতন কাঠামো ৪ থেকে ৮ হাজারের মধ্যে। কলেজ পর্যায়ে কিছুটা বাড়লেও প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে শিক্ষকদের খুবই অল্প টাকায় জীবন ধারণ করতে হয়। এর চেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো অনেক সময় বেসরকারি শিক্ষকরা ঠিকমতো মাসে মাসে এই কম বেতনটুকু ও পাচ্ছেন না। এবং সাম্প্রতিক সময়ে যেটা দেখা গেছে তারা থাকেন আন্দোলনে, রাস্তায় রাস্তায়, এমনকি আন্দোলনে শিক্ষক মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এই শিক্ষকতা পেশাকে আমরা যেভাবে অপমানিত অপদস্থ করেছি সেখানে কিভাবে আমরা মেধাবী দক্ষদের দেখার আশা করতে পারি?
আমাদের সরকার, প্রশাসন বরাবরই শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতারণা করে গেছেন। তাদের বিষয়ে প্রতিনিয়ত কত কত প্রতিশ্রুতির ফলঝুড়ি শোনা যায়, কাজের কাজ কিছুই হয় না। শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামোর কথাতো আমরা কম শুনিনি। এটা ঠিক সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণী করেছেন আবার রেজিষ্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় করণের ঘোষণা দিয়েছেন। এগুলো আসলে খুবই সামান্য। দেখতে হবে সরকারি মাধ্যমিক  বিদ্যালয়ের সংখ্যা গোটা বিদ্যালয় সংখ্যার তুলনায় খুবই নগন্য; যেখানে মোট ১৯ হাজার ৪০ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় সংখ্যা মাত্র ৩১৭। আবার ধরা যাক রেজিষ্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় করণ হবে কিন্তু জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের সুযোগ সুবিধাইতো নাই। এর বাইরেও কলেজ শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধাও তেমন নেই এমনকি বিসিএসের অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় শিক্ষা ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধা যেকোন মূল্যে কম।
অথচ গোটা দুনিয়া শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগে ব্যস্ত। ফলে সেখানে তারা ঠিকই মেধাবী আর দক্ষদের শিক্ষক হিসেবে পাচ্ছেন, সেখানে শিক্ষার মান ভালো। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, সুযোগ সুবিধার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ফারাক তা কোথাও নেই। ভারতে শিক্ষকদের বেতন বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী প্রত্যেকটি দেশেই শিক্ষকদের বেতন বেশি। আর উন্নত বিশ্বের চিত্র worldsalaries.org দেখাচ্ছে, আমেরিকার একজন শিক্ষক মাসে গড়ে পান বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৪ লাখ টাকা, ইংল্যান্ডের শিক্ষক পান সাড়ে ৩ লাখের মতো, জার্মানির শিক্ষকের বেতন সাড়ে ৪ লাখ প্রায় আর জাপানের শিক্ষকদের বেতনও সাড়ে ৩ লাখের বেশি। এসব দেশের শিক্ষকদের বেতনের একটা অংশ (২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ) কেটে রাখা হয় এবং শিক্ষকদের কাজের সময় নির্ধারণ করা হয় সপ্তাহে ৩২ থেকে ৪০ ঘণ্টা।

দাবি আদায়ে অন্দোলন করছেন শিক্ষকরা

এতসবের পরেও মেধাবী কিংবা দক্ষরা আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশায় যে একেবারে আসছেন না তা নয়। আসলেও বাস্তবতা দেখে তাদের চাকরিতে জব সেটিসফেকশন আসার কথা নয় আর কর্মে অতৃপ্তি নিয়ে শিক্ষকতা যিনি করবেন, তিনি কখনোই মানসম্মত শিক্ষক হতে পারেননা।
এর জন্য আমরাই মানে আমাদের সরকার, রাষ্ট্রই দায়ী যে কথাটি আগেও এসেছে। সবাই শিক্ষকদের ভালোভাবে জীবন ধারণের সুযোগ সুবিধা না দিলেও শিক্ষার গুণগান ভালোই গান। অথচ দিন দিন শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের সংখ্যা কমে গেলে আমাদের শিক্ষার অবস্থা যা আছে আরও শোচনীয় হবে। ভালো, দক্ষ শিক্ষক ছাড়া যত তোড়তোড়ই করা হোক না কেন কাজের কাজ কিছুই হবে না।

সংগ্রামী মেধাবীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি

প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষা ফল প্রকাশের পরই গণমাধ্যমে কিছু অদম্য মেধাবীর সন্ধান পাওয়া যায়। যারা বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা করে সম্মানজনক ফল করে থাকে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ ৫ হিসেবে, সাধারণত যারা ‘এ প্লাস’ পেয়ে থাকে, তারাই গণমাধ্যমে আসে; তবে সব সংগ্রামী প্লাসধারীই আসে এমনটা নয়। এ প্লাসধারী কিংবা যারা এ প্লাস পায়নি, এমন সব শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক সংগ্রামই উঠে আসে তাতে। ৮ মে এসএসসির ফল প্রকাশ পেল। এর পরই এমন কিছু অদম্য মেধাবীর কথা পত্রিকায় এলো, যাদের শিরোনামে পত্রিকাগুলো বলছে— দিনমজুর অদম্য মেধাবী, দারিদ্র্যজয়ী অদম্য মেধাবী বা গৃহপরিচারিকার কাজ করে জিপিএ ৫ পেয়েছে অদম্য মেধাবী। এসব শিরোনামই বলে এদের সংগ্রামটা অর্থনৈতিক।
পাবলিক পরীক্ষার পর এ ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধে জয়ীদের যেমন দেখা যায়, ঠিক একই সঙ্গে বছরের বিভিন্ন সময়ে হাসিমাখা কিছু মুখ দেখা যায়; যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে থাকে। আমরা অবশ্য জানি না এ হাসিমাখা মুখগুলো আসলে ওই সংগ্রামী মেধাবীরা কি না। এ বিষয়ে যাওয়ার আগে শিক্ষাবৃত্তিতে আসি। বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রতি বছর শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের কথা বললে মোটা দাগে ব্যাংকগুলোর কথাই বলতে হবে। অনেক ব্যাংকই, বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রতি বছর দরিদ্র ও মেধাবীদের এ শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। এ তালিকায় শীর্ষ ব্যাংক হলো ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকসহ আরও অনেক ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন গত ২৭ মে বণিক বার্তার খবর হলো ‘সুবিধাবঞ্চিত ২০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিল লংকাবাংলা ফাউন্ডেশন।’
এ ধরনের ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যত বাড়বে, বাংলাদেশের শিক্ষার জন্য ততই মঙ্গল। প্রতি বছর ঠিক কত শিক্ষার্থী এ রকম শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে থাকে, তা বের করা কঠিন। তবে টাকার অঙ্কটা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেখিয়েছেন ৪০ কোটি অর্থাৎ তিনি ব্যাংকগুলোর ২০১০ সালে শিক্ষাবৃত্তি বাবদ ব্যয়কে ধরে বলেছেন, বছরে তারা ৪০ কোটি টাকা ব্যয় করছে। ৪০ কোটি সামান্য টাকা নয়। আবার আমরা দেখছি, গত বছর কেবল ডাচ্-বাংলা ব্যাংকই তিন হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছে। অন্যান্য ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান মিলে এ সংখ্যাটা আরও কয়েক হাজার বাড়বে। সংখ্যাটা সার্বিক সংখ্যার চেয়ে হয়তো কম, তবে নেহাত কম নয়। প্রশ্নটা অন্য জায়গায় সেটা হলো, যাদের এ বৃত্তি পাওয়া উচিত, তারা পাচ্ছে কি না?
প্রশ্নটা করা হচ্ছে, যারা সত্যিকারার্থে অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করছে কিংবা যাদের পরিবার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগান দিতে একেবারে অক্ষম বা টাকা-পয়সা ছাড়া যাদের পড়াশোনা বন্ধ হবে, এ রকম শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছে কি না এর একটা উত্তর এমন হবে যে, নিশ্চয়ই তেমন শিক্ষার্থীই বৃত্তি পাচ্ছে। এটা ঠিক যারাই বৃত্তিটা পাচ্ছে, ফলাফলের দিক থেকে তারা মেধাবী। যেহেতু বলা চলে ব্যাংক নির্বাচক কমিটি শিক্ষাবৃত্তি দেয়ার ক্ষেত্রে রেজাল্টই প্রথমে দেখে। তবে অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে সবার এক রকম অবস্থা নয়। অনেকের হয়তো ভালো অবস্থাও থাকতে পারে।
ধরা যাক সব ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান মিলে প্রতি বছর ছয়-সাত হাজার শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়। প্রয়োজন হয়তো আরও কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর। যেহেতু অনেকেরই প্রয়োজন, ফলে প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকুক, যাদের প্রয়োজনটা অন্যদের চেয়ে বেশি। বলা হয়, প্রয়োজন হলেও এরাই যে পাচ্ছে তা নয়; অন্যরাও পাচ্ছে। অন্যরা পাবে কেন? অন্যরা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় নিশ্চয়ই আছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবৃত্তির প্রচারের কথাটা শুরুতেই আসবে। দেখা গেল কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষাবৃত্তির বিজ্ঞপ্তি দিল। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, ব্যাংকগুলো একটা পত্রিকায়ই বিজ্ঞপ্তি দেয়; অনেকে আবার দুটায়ও দিয়ে থাকে। এ বিজ্ঞপ্তি ঠিক যে শিক্ষার্থীর দেখা উচিত, সে হয়তো দেখল না। সে না দেখলে বা না জানলে তো আবেদন করতে পারবে না। অথচ বৃত্তিটা তারই প্রয়োজন। যারা একেবারে গ্রামে থাকে, তাদের পত্রিকার মাধ্যমে জানানো অসম্ভবই বলা চলে। ফলে বৃত্তি প্রচারের কাজটা জরুরি। অন্তত শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো দরকার। সব প্রতিষ্ঠান বৃত্তির খবর পেলে সব শিক্ষার্থীও সহজে
বিষয়টা জানতে পারবে।
শিক্ষাবৃত্তি যেহেতু ব্যাংকগুলোই বেশির ভাগ দিয়ে থাকে, ফলে সব ব্যাংক একত্রে বৃত্তিটা দিতে পারে। সাধারণত প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর ব্যাংকগুলো এ বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাকে। সব ব্যাংক যদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচার চালিয়ে একসময়ে বৃত্তি আবেদনপত্র গ্রহণ করে এবং তা দেয়ার ক্ষেত্রে পরস্পর সমন্বয় করে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে যাদের প্রয়োজন, আশা করা যায় তারা বৃত্তিটা পাবে এবং উপকৃত হবে।
আরেকটা বিষয় হলো, ব্যাংকগুলো বৃত্তি দেয় এসএসসি-এইচএসির ফলের ভিত্তিতে— এইচএসসি এবং অনার্স লেভেলে ভর্তির পর। এটার যৌক্তিকতা আছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভালো ফল করা সত্ত্বেও অবস্থা এতটা শোচনীয় যে, পরবর্তী পর্যায়ে ভর্তির জন্য টাকা নেই। এখন কলেজে ভর্তি হতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি হতে ফরম কিনতেই হয়তো কয়েক হাজার টাকা লেগে যায়। যাদের পক্ষে এসব খরচ বহন করা সম্ভব নয়, তাদের ভর্তি অনেকটা অনিশ্চিত। গ্রামের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আসলেই টাকার অভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারে না। হয়তো এসব শিক্ষার্থী সহযোগিতা পেলে উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতায় তাদের স্থান করে নিতে সক্ষম হতো। কারণ গ্রামের যে
শিক্ষার্থীটি অন্তত জিপিএ৫ এর কাছাকাছি পেয়েছে, তার মেধা শহরের জিপিএ৫-এর তুলনায় বেশি বলা যায়। এ ক্ষেত্রে তাদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে বৃত্তিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু করতে পারে কি?। সাধারণত ব্যাংকগুলো যে বৃত্তি দেয়, তাতে শিক্ষার্থীরা নিশ্চিত থাকে না যে সেটি পাবে; যেহেতু তাকে আবেদন করতে হচ্ছে এবং তার মতো আরও অন্যদের ছাড়িয়ে সে পাবে কি না, সে নিশ্চয়তাও তার নেই। এখন যাদের কথা বলা হচ্ছে, তাদের একটা নিশ্চয়তা দরকার, আমি উচ্চশিক্ষায় সুযোগ পেলে ভর্তিসহ পড়াশোনা চালানোর নিশ্চয়তা পাব। তাদের বিষয়টা আপাতত প্রস্তাব আকারেই থাক।
উচ্চশিক্ষা বিস্তারে ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাবৃত্তি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এভাবে সবাই সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে এগিয়ে এলে আমাদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণসহ সার্বিক চেহারাটা বদলে যেত। আগামী দিনে সত্যিকার অদম্য মেধাবীদের অন্তত টাকার অভাবে উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হতে দেবে না আমাদের সমাজ; এ প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।

শিক্ষকদের সম্মান করতে দিন

প্রাথমিক বিদ্যালয় অবকাঠামো


আকলিমারা শিক্ষকদের সম্মান করতে চায়। শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করলে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা করতে চায়। চাইলেও তারা তা পারছে না। প্রতিক্রিয়ায় আকলিমারা বলছে, ‘স্যারদের দেখে না দাঁড়ালে খারাপ লাগে’। প্রতিবেদনটি সমকালের। ৭ জুন প্রকাশিত পত্রিকাটির এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘শ্রেণীকক্ষে দাঁড়ালেও বিপত্তি!’ যেটি বলছে টাঙ্গাইলের সখীপুরের লাঙ্গুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ভবনের মেঝের প্লাস্টার উঠে গেছে। মেঝেতে অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় বেঞ্চ বসে না। শিক্ষকরা ক্লাসে ঢুকলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সম্মান জানাতে দাঁড়াতে গেলেই ঘটে বিপত্তি। বেঞ্চ উল্টে গিয়ে চতুর্থ শ্রেণীর এক ছাত্রের পা ভাঙার পর শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে দাঁড়াতে নিষেধ করে দেন শিক্ষকরা। ২০০৭ সাল থেকে ভবনটির এ অবস্থা হলেও এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত ভবন সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সমকালের এ প্রতিবেদনটি প্রকাশের দিনই প্রথম আলো আরেকটি বিদ্যালয়ের অবস্থা দেখাচ্ছে ‘বিদ্যালয় ভবন পরিত্যক্ত: পাঠদান বন্ধের উপক্রম’। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন বা অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে কেবল এই দুইটি প্রতিবেদনই নয়; এরকম অহরহ প্রতিবেদনই প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে আসছে। ঝুকিপুর্ণ ভবনের কারনে কোথাও শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে গাছের নিচে, কোথাও অন্য বাড়িতে, কোথাও আশ্রয়কেন্দ্রে আবার কোথাও জীবনের ঝুকি নিয়েই ঝুকিপুর্ন ভবনে ক্লাস করছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গোটা বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর চিত্র বলাচলে এরকমই। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ৮১ হাজার ৫০৮ টি এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় ৩৭ হাজার ৬৭২।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কিংবা ক্লাসরুমের এই চিত্রের বাইরের চিত্র যে নেই, তা নয়। যেমন ২০ মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের ৫শ’ বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম উদ্বোধন করেন। এ ৫শ’ বিদ্যালয়ের চিত্র দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশনের কথা বলে সরকার হয়তো এ বিদ্যালয়গুলোই দেখাবে। কিন্তু বাস্তবে এটিই যে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র নয়, ওপরের প্রতিবেদনই তার প্রমাণ। সরকার ৫০৩টি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেই যে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশনের ঢেঁকুর তুলছে, তার অসারতাই ওপরের বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা। অবশ্য মডেল স্কুলগুলোর চিত্রকে একেবারে নাকচও করা যায় না। যেহেতু সরকারের পক্ষে একই দিনে গোটা দেশে একই সঙ্গে সব বিদ্যালয়কে ডিজিটাল করা সম্ভব নয়। এ জন্য যে অর্থ দরকার, সেটা হয়তো সরকারের একসঙ্গে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। সেটা না হয় মানা গেল; কিন্তু তাই বলে কোনো বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে ক্লাস করতে পারবে না, অথচ আরেক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাল্টিমিডিয়া উপভোগ করবে_ এটা কীভাবে মানা যায়! সবাই একই সঙ্গে মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস করার প্রত্যাশা নাও করতে পারে, তারাতো অন্তত ক্লাসরুমে ক্লাস করার অধিকার রাখে।


 



এ-তো গেলো বিদ্যালয় বিদ্যমান থাকা কিংবা অবকাঠামোগত সমস্যার কথা। আর যেখানে বিদ্যালয়ই নেই সেটা কেমন? ২০০৯ সালের শেষদিকে একটি জাতীয় দৈনিক প্রাথমিকও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের জরিপসূত্রে বলেছিলো- ‘দেশের ১৬ হাজার ১৪২টি গ্রামে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। অবশ্য এর মধ্যে সরকারি নীতিমালা আর জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনা করে সরকার বলছে ১৬ হাজার নয় বরং ১ হাজার ৯৭২টি গ্রামে বিদ্যালয় নেই। সরকারি হিসেব ধরলেও প্রায় দুই হাজার গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বঞ্চিত। যদিও গত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ১৫শ’ বিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলেছিলেন, অবশ্য এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী তার আপডেট জানিয়ে বলেছেন, এর মধ্যে ৭৮০টি নতুন বিদ্যালয়ের কাজ সমাপ্তির পথে। সেটা নিশ্চয়ই ভালো খবর। তবে মনে রাখতে হবে, সরকার ১৬ হাজার থেকে কমিয়ে ২ হাজারে এনেছে, যেখানে বিদ্যালয় স্থাপন না করলে সেখানকার শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে না। এ রকম জরুরি প্রতিটি স্থানে দ্রুত বিদ্যালয় স্থাপন আবশ্যক। ৭৮০ বিদ্যালয়ের কাজ দ্রুত শেষ করে অন্যগুলোর কাজও শুরু করা উচিত।

প্রাথমিক বিদ্যালয় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম: ওপরের চিত্রগুলো এখানে অসহায়!
   

সরকার তার নির্বাচনী মেনিফেস্টো, শিক্ষানীতি এমনকি এবারের বাজেটেও বলেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ তারা নিশ্চিত করবে। এবং এ কথাও এসেছে, তারা এসব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫৮ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বৃহৎ একটি (তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি, পিইডিপি-৩) বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। আমরা এসব বাস্তবায়নের প্রত্যাশাই করব।
আকলিমাদের নিয়ে শুরু করেছিলাম, যারা শিক্ষকের মর্যাদা বোঝে, শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক এলে তাদের সম্মানে তারা দাঁড়িয়ে আসছে। এখন বিদ্যালয় পরিস্থিতি তাদের সেটা করতে দিচ্ছে না। শিক্ষকদের সম্মান করতে না পেরে তাদের খারাপ লাগছে। যারা প্রশাসনে আছেন, তাদের খারাপ লাগছে কি-না জানি না। তবে অনুরোধ, শিক্ষকদের আমরা সম্মান করি আর না-ই করি, অন্তত আকলিমাদের শিশুমন রক্ষায় তাদের বিদ্যালয়ের সংস্কার কাজটা দ্রুত করুন।

  •  Photo: Courtesy

http://samakal.net/details.php?news=20&view=archiev&y=2012&m=06&d=10&action=main&menu_type=&option=single&news_id=266767&pub_no=1079&type=