Monthly Archives: মে ২০১২

আমাদের ক্ষমা করবেন না, স্যার

স্যার, আমাদের ক্ষমা করবেন না। জাতির সন্তানদের শিশুকালে পড়িয়ে খেদমত করে গেছেন স্যার। চাহিদামাফিক খাদ্য, পোশাক কিংবা বাসস্থানের অভাব হলেও আপনার দায়িত্বে এতটুকু কার্পণ্য করেননি। কিন্তু যখন আপনাদের দিন চলছে না; যখন আপনাদের পেটের সঙ্গে পিঠ লেগে গেছে; যখন আপনাদের অবস্থা, আপনাদের নূ্যনতম চাহিদা সমাজ বুঝতে চেষ্টা করেনি; যখন আপনারা রাজপথে নামতে বাধ্য হলেন; যখন আপনারা প্রয়োজন বোঝাতে চেষ্টা করলেন; যখন আপনারা সরকারকে জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনীয় দাবি জানানোর চেষ্টা করলেন_ আপনাদের আমরা তো সহযোগিতা করিইনি, উল্টো লাঠিপেটা করেছি, জলকামান দাগিয়েছি এবং অবশেষে আপনাকে লাশ পর্যন্ত করেছি। স্যার, এ যে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
আমাদের ক্ষমা করবেন না, স্যার।
কেন ক্ষমা করবেন স্যার, আপনারা তো কোনো অযৌক্তিক আন্দোলন করেননি। আপনাদের কেবল এক দফা আন্দোলন : চাকরি জাতীয়করণ। বেসরকারি শিক্ষক হিসেবে মাসে চার হাজার নয়শ’ টাকা দিয়ে তো আপনাদের চলার কথা নয়। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৯ হাজার টাকা পেলে আপনারা পাবেন না কেন; যেখানে উভয়ের মান সমান, শিক্ষকদের যোগ্যতা সমান, বিদ্যালয়গুলোর ফলাফলও সমান_ সেখানে এই বৈষম্য তো মেনে নেওয়ার নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো স্যার, আপনারা এতদিন ধরে আন্দোলন করছেন, নানাভাবে সরকার আপনাদের আশ্বস্তও করেছে কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। ২০১০-এ আন্দোলন করেছেন; শিক্ষামন্ত্রী দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০১২-এর প্রথমদিকে বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে ধর্মঘট করেছেন; তাতে প্রতিশ্রুতির পরও তা হয়নি।
কীভাবে ক্ষমা করবেন স্যার? ১৫ এপ্রিল আপনারা কোনো বিশৃঙ্খলা করতে চাননি। আপনারা কেবল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন; কেবল তার কাছে স্মারকলিপি পেশ করতে চেয়েছিলেন; এটা তো আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। জবাবে পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন আপনারা। যে পুলিশের লাঠিপেটায় আপনারা আহত হয়েছেন, সে পুলিশ একদিন আপনাদের ছাত্র ছিল। অথচ এরা আপনাকে সম্মান দিতে জানেনি।
ক্ষমা তো এত সহজ নয়, স্যার। আপনারা এতদিন ধরে আন্দোলন করছেন অথচ আশ্বাস ছাড়া কোনো ফল পাচ্ছেন না, এটা কীভাবে সম্ভব। আপনার লাশ হওয়ার মধ্য দিয়ে আরেকটা আশ্বাস পাওয়া গেল, যার মাধ্যমে এই দফায়ও প্রাথমিক শিক্ষকরা অবস্থান ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন। এখন আসলে এই আশ্বাসের বাস্তবতা দেখার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ নেই। তবে সরকার ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলছে আর প্রাথমিক শিক্ষার ঝরে পড়ার হারও কমানোর কথা বলছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রাথমিক শিক্ষার সর্বকালের রেকর্ড বাজেট নিয়ে পিইডিপি-৩ বাস্তবায়নের পথে। এতসব স্বপ্ন আর পরিকল্পনার গোড়ায় রয়েছেন আপনারা শিক্ষকরা। অথচ আপনাদের বিষয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই।
স্যার, আপনি চলে গেছেন। আপনার চলে যাওয়া নিশ্চয়ই প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনের একটা রসদ হবে এবং হয়তো আপনাদের চাকরিটা জাতীয়করণও হবে কিন্তু কিছুই আপনি দেখে যেতে পারেননি। আপনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, আপনাকে জাতি সম্মান দিতে পারেনি। আপনার মৃত্যুর জন্য আমরাই দায়ী। আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন না। কারণ আমাদের লজ্জা নেই, আমাদের বিবেক ভোঁতা হয়ে গেছে। আপনার মৃত্যুর মতো এ রকম অস্বাভাবিক বিষয় আমাদের কাছে এতটা সহজ হয়ে গেছে যে আমাদের হৃদয় বলতে কিছু নেই। আমাদের ক্ষমা করবেন না স্যার।

  •  লেখাটি সমকালে ১৯ মে তারিখে প্রকাশিত
  • ছবি কৃতজ্ঞতা: প্রথম আলো

অবহেলায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা

লেখাটি যখন লিখছি, তখন বাংলাদেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো উত্তাল। আন্দোলন করছেন পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা; যারা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে অবনমনের ‘পরিকল্পনা’ নাকচ করেছেন। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পদমর্যাদায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ রকম পরিকল্পনা সরকারের নেই। একটি জাতীয় দৈনিকে এ-সংক্রান্ত (ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় শ্রেণী করা) যে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে, তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার কথা বলেছে মন্ত্রণালয়।
বিষয়ে যাওয়ার আগে একটি পরিসংখ্যান দেখা যাক, ৭ মে প্রকাশিত হয় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। এ বছর পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ লাখ ১২ হাজার ৩৭৯ জন। পাস করেছে ১২ লাখ ১৯ হাজার ৮৯৪ শিক্ষার্থী। কারিগরি বোর্ডে এবার অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ৯১ হাজার ১৭০ জন। পাস করেছে ৭৩ হাজার ৫৬৬ জন। এ পরিসংখ্যান থেকে আমরা সহজেই দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার অবস্থাটা বুঝতে পারি। সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার একটা আকাশ-পাতাল তফাত দেখা যাচ্ছে। যেখানে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী ১৩ লাখের ওপরে, সেখানে কারিগরির শিক্ষার্থী ১ লাখও নয়।
এ রকম হওয়ার একটা কারণই প্রধান। সেটা হলো, এ শিক্ষার প্রতি অবহেলা। সরকার একে সেভাবে প্রমোট করতে পারেনি। অন্যদিকে অভিভাবকরাও সাধারণ শিক্ষার বাইরে কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার কথা ভাবতে অভ্যস্ত নন। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে, যারা সাধারণ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তি হতে পারে না, তারাই কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হয় বা যারা দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তারা ভর্তি হয়। এর উদ্দেশ্য অল্প সময়ে কোনো কাজ করে সহজে আয়ের একটা ব্যবস্থা করতে পারা। এ শিক্ষা সরাসরি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে কেউ এখানে পড়াশোনা করে তার টেকনিক্যাল জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগাতে পারে।
আমাদের কারিগরি বৃত্তিমূলক শিক্ষার বাস্তবতা এমনটা হলেও বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য এ চরিত্র মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এখানে যেভাবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে পায়নি। অথচ শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাধারণ ধারার শিক্ষার সমান হওয়া উচিত কারিগরি শিক্ষা। এটা সত্য, অনেক দেশ কিন্তু এ শিক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। চীন, জাপান, কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ যেসব দেশ আজ উন্নতির শিখরে, তারা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। যেখানে এসব দেশের মোট শিক্ষিত জনসংখ্যার ৬০ ভাগ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণ করছে, সেখানে আমাদের এ হার এখন ১০ ভাগেরও নিচে।
এটা তো এ শিক্ষার প্রতি স্পষ্ট অবহেলা। বিষয়টা বোঝার জন্য দেশে বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যার দিকে তাকানো যাক, প্রাথমিক শিক্ষার পর মাধ্যমিক স্তরেই যেহেতু শিক্ষার্থীদের কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার কথা আসে, সুতরাং মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরটাই এখানে বিবেচ্য— বাংলাদেশে বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৩। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩১৭টি, স্কুলসংযুক্ত কলেজ ৬৩৯টি, ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ১ হাজার ১৮৫টি। অথচ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় একই স্তরে আমরা দেখছি ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এ ছাড়া রয়েছে কিছু টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, লেদার টেকনোলজি কলেজ, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউট ইত্যাদি।
যদিও শিক্ষানীতি ২০১০-এ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ হয়েছে। শিক্ষানীতির ৫ নম্বর অধ্যায়ে দেশ ও বিদেশের চাহিদা বিবেচনায় রেখে এ শিক্ষা সম্প্রসারণে তাগিদ দিলেও বাস্তব ভূমিকা সামান্যই। শিক্ষানীতি আসলে কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, যেখানে প্রতি উপজেলায় মাত্র একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। আবার পলিটেকনিক, টেক্সটাইল ও লেদারসহ অন্যান্য ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে শিক্ষানীতি খুব উচ্চকিত নয়। প্রতিটি উপজেলায় মাত্র একটা প্রতিষ্ঠান দিয়ে এর সম্প্রসারণ কীভাবে সম্ভব? এর জন্য প্রথমত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সুযোগ-সুবিধাও বৃদ্ধি করতে হবে।
পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোয় ৪৫ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য। এ ছাড়া সারা দেশে যেসব বেসরকারি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেগুলোর মানও নিম্ন। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আকৃষ্ট করতে প্রথমবারের মতো ২০১০ সালে ‘কারিগরি শিক্ষা সপ্তাহ’ পালন করেছে সরকার। এর সঙ্গে বিশেষত দেশে তাদের কাজের মর্যাদা ও ক্ষেত্র তৈরির পাশাপাশি বিদেশেও জনশক্তি রফতানির ব্যবস্থা করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় ডিপ্লোমাধারীরা যাতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, তার ব্যবস্থাও নেয়া দরকার।
এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের পদাবনতির বিষয়টা নাকচ করে দিলেও নিশ্চয়ই এখানে একটা ঘাপলা রয়েছে। এ রকম যদি হয়, তা দুঃখজনক। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় শ্রেণী করার কোনো পরিকল্পনা থাকলেও তা যাতে কখনই বাস্তবায়ন না হয়— বিষয়টা অবশ্যই সরকারকে আরও পরিষ্কার করে বলতে হবে। নইলে এর খারাপ প্রভাব গোটা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় পড়বে।
শোনা যাচ্ছে, চাকরির বাজার-উপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের কারিগরি শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর কথা। সরকার এ লক্ষ্যে উন্নয়ন-সহযোগীদের আর্থিক সহযোগিতায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংস্কার’ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এটা ভালো খবর এবং নিঃসন্দেহে এ শিক্ষাকে জনপ্রিয় করতে পারলে তা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।