Monthly Archives: অক্টোবর ২০১১

ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) দেশের ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আপডেটিং গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ অব বাংলাদেশ নামে। তাতে গত সাত বছরের ভূগর্ভস্থ পানির চিত্র দেখানো হয়েছে। তাতে বলা হয়, সাত বছরে ঢাকার পানির স্তর নেমেছে ছয় মিটার। আজকের আলোচনা ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে এর সঙ্গে ঢাকার নদীগুলোও আসবে।
প্রায় সোয়া কোটি নগরবাসীর প্রতিদিন পানি জোগানের দায়িত্বে রয়েছে ওয়াসা। ওয়াসা জানাচ্ছে, প্রতিদিন পানির চাহিদা রয়েছে ২ হাজার ২৫০ মিলিয়ন লিটার। ওয়াসা প্রতিদিন ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন লিটার পানি জোগান দিতে পারে। চাহিদার তুলনায় ওয়াসা পানি কম সরবরাহ করছে, কিংবা সরবরাহকৃত পানির মানের প্রশ্ন আছে, সেটা বিষয় নয়। বিষয়টা হলো ৮৭ শতাংশই তোলা হচ্ছে মাটির নিচ থেকে।
ওয়াসা পানির ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, এতে পানির স্তর দিন দিন দ্রুত নিচে নেমে যাবে, এটা স্বাভাবিক। এখন গবেষণা হচ্ছে, পানির স্তর কতটা নিচে নেমে যাচ্ছে তা নিয়ে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সাত বছরে নেমেছে ছয় মিটার। ২০০৪ সালে যেখানে সমুদ্রস্তর থেকে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি ছিল ৪৬ মিটার নিচে, ২০১১-এ তা বেড়ে হয় ৫২ মিটার। অবশ্য ‘ওয়াটার এইড বাংলাদেশ’ বলছে, প্রতি বছর ঢাকার পানির স্তর নামছে তিন মিটার হারে।
পানির স্তর এভাবে দ্রুত নামায় একদিকে যেমন ওয়াসার পাম্প কিংবা গভীর নলকূপ থেকে পানি ওঠানো অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে এটা নগরবাসীর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বিরাট প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি হবে। ভূমিধস, খরা, পরিবেশ বিপর্যয় থেকে শুরু করে বাস্তুসংস্থান শৃঙ্খলা ভেঙে দেবে। আমাদের সামনে যে বাঁচা-মরার কঠিন বাস্তবতা উপস্থিত হয়েছে, এটা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার আগে নদী বিষয়ে যাওয়া যাক।
ওয়াসা ভূগর্ভ থেকে ৮৭ শতাংশ পানি উত্তোলন করে। বাকি ১৩ শতাংশ আসে নদী থেকে। ঢাকার চারপাশে চারটি নদী— বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা। এর মধ্যে শীতলক্ষ্যা থেকে আসে ১০ শতাংশ, বাকি ৩ শতাংশ পানি বুড়িগঙ্গার। নদী থেকে উত্তোলিত পানি শোধনাগার থেকে শোধন করে বিতরণ করা হয়। মজার বিষয় হলো, ওয়াসার পানি নিয়ে গ্রাহকদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে— খাওয়ার অযোগ্য, দুর্গন্ধ, দূষিত, ডায়রিয়ার কারণ প্রভৃতি নদীর পানির জন্য। অর্থাত্ আমাদের নদীগুলো এতটাই দূষিত যে, তা শোধনের অযোগ্য। এই ১৩ শতাংশ দূষিত পানি ওয়াসার অন্য উেসর সঙ্গে মিশে পানিকেই ব্যবহারের অযোগ্য করে ফেলে।
চারটি নদীর সবগুলোর দূষণের মাত্রা বলার অপেক্ষা রাখে না। দূষণ আর দখলে এগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। সদরঘাটে গিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়ালে যে কেউ অসুস্থ হতে পারেন। এ দূষণও আমাদের দ্বারাই হচ্ছে। হাজারীবাগ ট্যানারির বর্জ্য, ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন, কলকারখানার বর্জ্য প্রভৃতির মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে আমরা বুড়িগঙ্গাকে ধ্বংস করেছি। কঠিন ও তরল বর্জ্যে এর অক্সিজেনের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে, সাম্প্রতিক পরিবেশ অধিদফতরের পরীক্ষায় বলা হয়েছে, এখানে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারবে না।
আমাদের নদীগুলোকে এভাবে না মারলে ঢাকা শহরে পানির কোনো সমস্যাই থাকত না। পরিকল্পনা ছাড়াই আমরা পানির বিষয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করেছি আর নদীগুলোকে ইচ্ছামতো দূষিত করেছি। অথচ ঢাকাবাসী শুরু থেকেই পানির বিষয়ে যদি নদীর ওপর নির্ভরশীল হতো, নদীগুলোকে ব্যবহার করে পানির চাহিদা মেটাত, তখন নগরবাসীর স্বার্থেই নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে হতো কিংবা একে ভালো রাখার সব পদক্ষেপ প্রশাসন নিত।
এখন আমরা সব হারিয়েছি। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে এর স্তর কমিয়ে জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়েছি, নদীগুলোকে দূষিত আর দখল করে বর্জ্য ফেলে মৃত করেছি। এসব পর্ব যখন শেষ, তখনই নদী উদ্ধারের তোড়জোড় দেখছি, ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। নদী উদ্ধারে হাইকোর্ট পর্যন্ত নির্দেশনা দিয়েছে। গত বছর ‘বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ রিভার ক্লিনিং প্রজেক্টের’ নামে বাবুবাজার থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত নদীর তলদেশের বর্জ্য অপসারণ শুরু হয়েছিল। সেটাও এখন বন্ধ। আবার ওই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাগত সমস্যায় নদীতেই পড়ছে।
ঢাকাবাসীর পানির সংকট উত্তরণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে উপরিভাগের বিশেষ করে নদীর পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো ছাড়া বাঁচার কোনো পথ নেই। কর্তাব্যক্তিরাও তা মনে করছেন। ওয়াসাপ্রধান এ কথাই বলেছেন, ‘আমরা ২০২১ সাল নাগাদ ভূ-উপরিভাগের পানি বর্তমানে ১৩ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করব, আর ভূগর্ভস্থ পানি ৮৭ থেকে নামিয়ে ৩০ শতাংশে নিয়ে আসব।’ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ২০০৪ সালে ওয়াসার গভীর নলকূপ ছিল ৪৪০টি, এখন তা হয়েছে ৫৬০টি। তবুও আমরা আশাবাদী। আশা ছাড়া বাঁচার আর কোনো পথ খোলা আছে কি!

বণিক বার্তা, 30 অক্টোবর ২০১১

শিক্ষকের অর্থনীতি ও কোচিং সেন্টার

কোচিং সেন্টার নিয়ে আমাদের দেশে একটা ‘তোড়জোড়’ লক্ষণীয়। এর ব্যাখ্যাটা দুই রকম হতে পারে— কোচিংয়ের পক্ষে এবং বিপক্ষে। দিন দিন নতুন কোচিং সেন্টার হচ্ছে। শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ, বিজ্ঞাপন। রমরমা বাণিজ্য হচ্ছে এগুলোয়। অনেকেই হচ্ছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। এসব পক্ষের তোড়জোড়। আর বিপক্ষের কথা সবার জানা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিংয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ প্রভৃতি। মূল কথাটা এখনো আসেনি, খোদ কোচিং বন্ধের তোড়জোড়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষক থেকে শুরু করে অনেক অভিভাবকও এ ব্যাপারে একাট্টা হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়। ১৭ অক্টোবরে হাইকোর্টের রুল গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেকের জানা।
কোচিং সেন্টারকে প্রমোট করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনার পরিবর্তে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখা যাক। ১৮ অক্টোবর জাতীয় দৈনিকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল ‘স্কুলশিক্ষকদের কোচিং বন্ধে কেন নির্দেশ নয়: হাইকোর্ট’। ‘অভিভাবক ঐক্য ফোরাম’ নামে একটি সংগঠনের সভাপতির করা রিটের ভিত্তিতে এ রুল, যাতে বলা হয় সরকারি ও এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের কোচিং বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না। অবশ্য এ সংক্রান্ত রুল এটাই প্রথম নয়, ২০০৮ সালেও হাইকোর্ট এ রকম নির্দেশনা দেন। সেটা যে কার্যকর হয়নি তা বোঝাই যাচ্ছে। তবে কোচিং বন্ধের আলোচনা থেমে থাকেনি। ১৭ অক্টোবরে রুলের আগেও ২১ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধানরা কোচিং বন্ধের দাবিতে একমত হয়েছেন।
হাইকোর্টের এবারের রুল একটু অন্য রকম। যেখানে গোটা কোচিং বন্ধের চেয়েও শিক্ষকদের কোচিং বন্ধের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা দেশ থেকে কোচিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দিতে চাই।’ আলোচনায় ফেরা যাক। একটা প্রশ্ন— বাংলাদেশে কি কোচিং সেন্টার বন্ধ করা সম্ভব? এক কথায় উত্তর দেয়াটা কঠিন। উত্তরটা যেমন কঠিন, কোচিং সেন্টার বন্ধ করাও তেমন কঠিন। কঠিন মানে কিন্তু অসম্ভব নয়। সম্ভব।
তার আগে কোচিং সেন্টার থাকার যে পূর্বশর্ত আমরা তৈরি করে রেখেছি, তার একটা দফারফা করতে হবে। এখানে অনেক বিষয় আছে যেমন— শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় সমস্যা, মূল্যায়ন পদ্ধতির ত্রুটি প্রভৃতি। তার চেয়ে আবার শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ। আজকের আলোচনা শিক্ষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শিক্ষকরা কেন একটা কোচিং সেন্টার দেবেন বা কেন তা করাবেন। বাস্তবতা হলো, টাকার জন্য। শিক্ষকতা করে তিনি যে টাকা পান তা যথেষ্ট নয়। অন্যভাবে বললে একজন শিক্ষকের জীবন ধারণের জন্য যত টাকা প্রয়োজন, তা সরকার তাকে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তিনি আয়ের অন্য পথ ধরছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো কোচিং করানো। কোচিং করিয়ে তিনি বেতনের কয়েক গুণ বেশি টাকা আয় করতে পারেন, এভাবে কোচিং করানোর পক্ষে হাজারো যুক্তি দেয়া সম্ভব। তবে কোচিং করান না, এ রকম শিক্ষক যে নেই তা নয়। তাদের কথা বাদ দিয়ে যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের কথা বলছি। চাহিদার অনুসারে বেতন না দেয়ার ফলে, জীবন বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে তারা যেটা করছেন, তা কীভাবে বন্ধ করার কথা বলতে পারি। অর্থাত্ শিক্ষকের অর্থনৈতিক অবস্থাই কোচিং করানোর পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশে শিক্ষকদের মাসিক বেতন দেখি। জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেসিক স্কেল হলো ৪ হাজার ৭০০ টাকা। মাধ্যমিক ৮ হাজার এবং কলেজ শিক্ষকের ১১ হাজার টাকা। এর বাইরে বাড়ি ভাড়া, মেডিকেল বাবদ তারা যা পান তা সামান্য। এ বেতনে একজন শিক্ষক কীভাবে নিত্যকার ব্যয়ভার বহন করবেন? প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের শিক্ষকদের কথা বলাই বাহুল্য। শিক্ষকদের অন্য কোনো সুবিধা নেই। এ অবস্থায় তারা কোথায় যাবেন। কোচিং ছাড়া ভালো কী পথ খোলা আছে?
অন্য দেশগুলোয় শিক্ষকদের সম্মানীটা দেখা যাক। ভারতে শিক্ষকদের বেতন বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী প্রত্যেকটি দেশেই শিক্ষকদের বেতন বেশি। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই। .িড়িত্ষফংধষধত্রবং.ড়ত্ম দেখাচ্ছে, আমেরিকার একজন শিক্ষক মাসে গড়ে পান বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৪ লাখ টাকা, ইংল্যান্ডের শিক্ষক পান সাড়ে ৩ লাখের মতো, জার্মানির শিক্ষকের বেতন সাড়ে ৪ লাখ প্রায় আর জাপানের শিক্ষকদের বেতনও সাড়ে ৩ লাখের বেশি। এসব দেশের শিক্ষকদের বেতনের একটা অংশ (২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ) কেটে রাখা হয় এবং শিক্ষকদের কাজের সময় নির্ধারণ করা হয় সপ্তাহে ৩২ থেকে ৪০ ঘণ্টা। এগুলো অবশ্য ২০০৫ সালের তথ্য। তবে বাংলাদেশে প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা কোনো দেশেই নেই। শিক্ষকরা এখানে ক্লাস নিতে নিতে ক্লান্ত।
শিক্ষকরা কম বেতন পান বা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে কোচিং সেন্টার চালু রাখার ন্যায্যতা তৈরির জন্য এ লেখা নয়। বলার বিষয় হলো, একজন শিক্ষক সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তাদের জীবন ধারণের জন্য অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন হতেই পারে। সে জন্য শিক্ষক অন্য কোনো কাজ করতে পারেন। শিক্ষকতা মহান পেশা। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকরাই এ পেশার কলঙ্ক। বিশেষ করে, ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষক পরিমল কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাসহ এ রকম আরও ঘটনা ঘটেছে। পরিমলের এ ঘটনা কিন্তু কোচিং থেকেই ঘটেছে। কোচিংয়ে যেসব শিক্ষক ক্লাস নেন, তাদের বিষয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ঠিকমতো ক্লাস নেন না, যেসব শিক্ষার্থী কোচিং করে না, তাদের নম্বর দেন না প্রভৃতি। এতে গরিব শিক্ষার্থীরা অসহায়ই থাকছে।
কোচিং সেন্টারের প্রসারটা আমাদের দেশ আর ভারতেই বিদ্যমান। পৃথিবীর আর কোথাও এ রকম কোচিং নেই। অন্য কোচিং আছে যেমন— লাইফ কোচিং, স্পোর্টস কোচিং, বিজনেস কোচিং। তবে অন্যান্য দেশে একাডেমিক ক্লাসের পাশাপাশি গৃহশিক্ষকতা আছে, যেটা তাদের ভাষায় ঝযধফড় িঊফঁপধঃরড়হ, তাও বাংলাদেশ আর ভারতের প্রাইভেট ও কোচিংয়ের মতো এত বেশি নয়।
কোচিং সেন্টারের ব্যাপকতা আমাদের দেশে কত বেড়েছে, তা খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। সরকারের কাছেও হয়তো ঠিক কতসংখ্যক কোচিং সেন্টার রয়েছে তার হিসাব নেই। শহরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য কোচিং সেন্টার রয়েছে। একাডেমিক, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, স্কুল ভর্তি, বিসিএস, ইংরেজি কোচিং প্রভৃতি ধরনের কোচিংয়ের ফাঁদে পড়ে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আছেন শিক্ষকরা। ফলে কোচিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা শিক্ষকদের দ্বারাই সম্ভব। মজার বিষয় হলো, আমরা পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় ভালো রেজাল্টধারী হিসেবে যাদেরই দেখছি, বলা চলে সবাই কোচিংয়ের প্রোডাক্ট। যারা পড়াশোনা মানে ভালো রেজাল্টই বোঝে। ফলে দিন দিন ‘এ প্লাস’ বাড়ছে ঠিকই; কিন্তু শিক্ষার মান বাড়ছে না।
প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বলে আসছেন, শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো হবে। গত ২ আগস্ট শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালেও প্রধানমন্ত্রী এ আশ্বাস দিয়েছেন। এটা খুবই যৌক্তিক এবং প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষকদের সত্যিকারার্থে স্বাবলম্বী না করে কেবল হাইকোর্টে রুল জারি করে কাজের কাজ কিছু হওয়ার কথা নয়। কোচিং সেন্টার বন্ধ করাসহ শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকাই প্রধান। তাই শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগে সরকারের দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক।

শিক্ষকের অর্থনীতি ও কোচিং সেন্টার

কোচিং সেন্টার নিয়ে আমাদের দেশে একটা ‘তোড়জোড়’ লক্ষণীয়। এর ব্যাখ্যাটা দুই রকম হতে পারে— কোচিংয়ের পক্ষে এবং বিপক্ষে। দিন দিন নতুন কোচিং সেন্টার হচ্ছে। শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ, বিজ্ঞাপন। রমরমা বাণিজ্য হচ্ছে এগুলোয়। অনেকেই হচ্ছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। এসব পক্ষের তোড়জোড়। আর বিপক্ষের কথা সবার জানা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিংয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ প্রভৃতি। মূল কথাটা এখনো আসেনি, খোদ কোচিং বন্ধের তোড়জোড়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষক থেকে শুরু করে অনেক অভিভাবকও এ ব্যাপারে একাট্টা হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়। ১৭ অক্টোবরে হাইকোর্টের রুল গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেকের জানা।
কোচিং সেন্টারকে প্রমোট করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনার পরিবর্তে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখা যাক। ১৮ অক্টোবর জাতীয় দৈনিকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল ‘স্কুলশিক্ষকদের কোচিং বন্ধে কেন নির্দেশ নয়: হাইকোর্ট’। ‘অভিভাবক ঐক্য ফোরাম’ নামে একটি সংগঠনের সভাপতির করা রিটের ভিত্তিতে এ রুল, যাতে বলা হয় সরকারি ও এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের কোচিং বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না। অবশ্য এ সংক্রান্ত রুল এটাই প্রথম নয়, ২০০৮ সালেও হাইকোর্ট এ রকম নির্দেশনা দেন। সেটা যে কার্যকর হয়নি তা বোঝাই যাচ্ছে। তবে কোচিং বন্ধের আলোচনা থেমে থাকেনি। ১৭ অক্টোবরে রুলের আগেও ২১ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধানরা কোচিং বন্ধের দাবিতে একমত হয়েছেন।
হাইকোর্টের এবারের রুল একটু অন্য রকম। যেখানে গোটা কোচিং বন্ধের চেয়েও শিক্ষকদের কোচিং বন্ধের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা দেশ থেকে কোচিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দিতে চাই।’ আলোচনায় ফেরা যাক। একটা প্রশ্ন— বাংলাদেশে কি কোচিং সেন্টার বন্ধ করা সম্ভব? এক কথায় উত্তর দেয়াটা কঠিন। উত্তরটা যেমন কঠিন, কোচিং সেন্টার বন্ধ করাও তেমন কঠিন। কঠিন মানে কিন্তু অসম্ভব নয়। সম্ভব।
তার আগে কোচিং সেন্টার থাকার যে পূর্বশর্ত আমরা তৈরি করে রেখেছি, তার একটা দফারফা করতে হবে। এখানে অনেক বিষয় আছে যেমন— শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় সমস্যা, মূল্যায়ন পদ্ধতির ত্রুটি প্রভৃতি। তার চেয়ে আবার শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ। আজকের আলোচনা শিক্ষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শিক্ষকরা কেন একটা কোচিং সেন্টার দেবেন বা কেন তা করাবেন। বাস্তবতা হলো, টাকার জন্য। শিক্ষকতা করে তিনি যে টাকা পান তা যথেষ্ট নয়। অন্যভাবে বললে একজন শিক্ষকের জীবন ধারণের জন্য যত টাকা প্রয়োজন, তা সরকার তাকে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তিনি আয়ের অন্য পথ ধরছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো কোচিং করানো। কোচিং করিয়ে তিনি বেতনের কয়েক গুণ বেশি টাকা আয় করতে পারেন, এভাবে কোচিং করানোর পক্ষে হাজারো যুক্তি দেয়া সম্ভব। তবে কোচিং করান না, এ রকম শিক্ষক যে নেই তা নয়। তাদের কথা বাদ দিয়ে যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের কথা বলছি। চাহিদার অনুসারে বেতন না দেয়ার ফলে, জীবন বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে তারা যেটা করছেন, তা কীভাবে বন্ধ করার কথা বলতে পারি। অর্থাত্ শিক্ষকের অর্থনৈতিক অবস্থাই কোচিং করানোর পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশে শিক্ষকদের মাসিক বেতন দেখি। জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেসিক স্কেল হলো ৪ হাজার ৭০০ টাকা। মাধ্যমিক ৮ হাজার এবং কলেজ শিক্ষকের ১১ হাজার টাকা। এর বাইরে বাড়ি ভাড়া, মেডিকেল বাবদ তারা যা পান তা সামান্য। এ বেতনে একজন শিক্ষক কীভাবে নিত্যকার ব্যয়ভার বহন করবেন? প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের শিক্ষকদের কথা বলাই বাহুল্য। শিক্ষকদের অন্য কোনো সুবিধা নেই। এ অবস্থায় তারা কোথায় যাবেন। কোচিং ছাড়া ভালো কী পথ খোলা আছে?
অন্য দেশগুলোয় শিক্ষকদের সম্মানীটা দেখা যাক। ভারতে শিক্ষকদের বেতন বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী প্রত্যেকটি দেশেই শিক্ষকদের বেতন বেশি। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই। worldsalaries.org দেখাচ্ছে, আমেরিকার একজন শিক্ষক মাসে গড়ে পান বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৪ লাখ টাকা, ইংল্যান্ডের শিক্ষক পান সাড়ে ৩ লাখের মতো, জার্মানির শিক্ষকের বেতন সাড়ে ৪ লাখ প্রায় আর জাপানের শিক্ষকদের বেতনও সাড়ে ৩ লাখের বেশি। এসব দেশের শিক্ষকদের বেতনের একটা অংশ (২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ) কেটে রাখা হয় এবং শিক্ষকদের কাজের সময় নির্ধারণ করা হয় সপ্তাহে ৩২ থেকে ৪০ ঘণ্টা। এগুলো অবশ্য ২০০৫ সালের তথ্য। তবে বাংলাদেশে প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা কোনো দেশেই নেই। শিক্ষকরা এখানে ক্লাস নিতে নিতে ক্লান্ত।
শিক্ষকরা কম বেতন পান বা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে কোচিং সেন্টার চালু রাখার ন্যায্যতা তৈরির জন্য এ লেখা নয়। বলার বিষয় হলো, একজন শিক্ষক সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তাদের জীবন ধারণের জন্য অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন হতেই পারে। সে জন্য শিক্ষক অন্য কোনো কাজ করতে পারেন। শিক্ষকতা মহান পেশা। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকরাই এ পেশার কলঙ্ক। বিশেষ করে, ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষক পরিমল কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাসহ এ রকম আরও ঘটনা ঘটেছে। পরিমলের এ ঘটনা কিন্তু কোচিং থেকেই ঘটেছে। কোচিংয়ে যেসব শিক্ষক ক্লাস নেন, তাদের বিষয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ঠিকমতো ক্লাস নেন না, যেসব শিক্ষার্থী কোচিং করে না, তাদের নম্বর দেন না প্রভৃতি। এতে গরিব শিক্ষার্থীরা অসহায়ই থাকছে।
কোচিং সেন্টারের প্রসারটা আমাদের দেশ আর ভারতেই বিদ্যমান। পৃথিবীর আর কোথাও এ রকম কোচিং নেই। অন্য কোচিং আছে যেমন— লাইফ কোচিং, স্পোর্টস কোচিং, বিজনেস কোচিং। তবে অন্যান্য দেশে একাডেমিক ক্লাসের পাশাপাশি গৃহশিক্ষকতা আছে, যেটা তাদের ভাষায় shadow education, তাও বাংলাদেশ আর ভারতের প্রাইভেট ও কোচিংয়ের মতো এত বেশি নয়।
কোচিং সেন্টারের ব্যাপকতা আমাদের দেশে কত বেড়েছে, তা খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। সরকারের কাছেও হয়তো ঠিক কতসংখ্যক কোচিং সেন্টার রয়েছে তার হিসাব নেই। শহরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য কোচিং সেন্টার রয়েছে। একাডেমিক, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, স্কুল ভর্তি, বিসিএস, ইংরেজি কোচিং প্রভৃতি ধরনের কোচিংয়ের ফাঁদে পড়ে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আছেন শিক্ষকরা। ফলে কোচিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা শিক্ষকদের দ্বারাই সম্ভব। মজার বিষয় হলো, আমরা পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় ভালো রেজাল্টধারী হিসেবে যাদেরই দেখছি, বলা চলে সবাই কোচিংয়ের প্রোডাক্ট। যারা পড়াশোনা মানে ভালো রেজাল্টই বোঝে। ফলে দিন দিন ‘এ প্লাস’ বাড়ছে ঠিকই; কিন্তু শিক্ষার মান বাড়ছে না।
প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বলে আসছেন, শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো হবে। গত ২ আগস্ট শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালেও প্রধানমন্ত্রী এ আশ্বাস দিয়েছেন। এটা খুবই যৌক্তিক এবং প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষকদের সত্যিকারার্থে স্বাবলম্বী না করে কেবল হাইকোর্টে রুল জারি করে কাজের কাজ কিছু হওয়ার কথা নয়। কোচিং সেন্টার বন্ধ করাসহ শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকাই প্রধান। তাই শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগে সরকারের দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক।

বণিক বার্তা, 26 অক্টোবর ২০১১

অর্থনীতির নোবেল সমাচার

নোবেল পুরস্কার ২০১১ কারা পেলেন তা ১০ অক্টোবরের মধ্যেই সবাই জেনে গেছে। হাল দুনিয়ায় যত বিতর্কই থাকুক, নোবেলটাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। আমাদের এটা বুঝতে মোটেও কষ্ট হয় না। কারণ সুইডেন থেকে হোক কিংবা নরওয়ে থেকেই হোক, অক্টোবরের প্রথম থেকে পুরস্কার ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশের পত্রিকায় পরদিন সে সংবাদ ছাপা হচ্ছে। আর যারা অনলাইনে থাকেন, তারা তো সঙ্গে সঙ্গেই জানতে পারেন। তবে ‘আদার বেপারীর জাহাজের খবর নেয়া’ আর আমাদের নোবেল পুরস্কারের খবর নেয়া অনেকটা একই কথা। অর্থনীতির কথা তো বলাই বাহুল্য। অবশ্য শান্তিতে একটা পুরস্কার আছে বলে আমাদের রক্ষা।
পদার্থ, রসায়ন, চিকিত্সা, শান্তি, সাহিত্য ও অর্থনীতি— নোবেল পুরস্কারের এ ছয়টি বিষয়ের মধ্যে অর্থনীতির মাহাত্ম্য একটু অন্যরকম। এ পর্যন্ত কোনো মুসলমান এ পুরস্কার পাননি। অবশ্য আট শতাধিক নোবেল মুকুটপ্রাপ্তদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র ১২। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, ইহুদিদের সংখ্যাটা ১৬০-এর কম নয়। অর্থনীতিতে সর্বপ্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী নোবেলবিজয়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এলিনর অস্ট্রম। যদিও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের অধিকাংশই আমেরিকান।
অর্থনীতির পুরস্কারের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল পুরস্কারের সময় এটা ছিল না। অর্থাত্ এ পুরস্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেলও অর্থনীতিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেননি বা করে যেতে পারেননি। পরে ১৯৬৮ সালে সেরিজ রিকস ব্যাংক প্রাইজ নামে অর্থনীতিতে পুরস্কার চালু হয়। এটা অবশ্য আলফ্রেড নোবেলের স্মরণেই এবং এ বিষয়ের গুরুত্বের কথা বিবেচনায় রেখেই করা হয়।
নোবেল বিজয়ীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়সে পুরস্কার বিজয়ী লিওনিদ হারউইজ। তিনি ৯০ বছর বয়সে অর্থনীতিতে পুরস্কার পান। প্রথম এশীয় হিসেবে অর্থনীতির নোবেল বিজয়ী হলেন অমর্ত্য সেন। তিনি ১৯৯৮ সালে কল্যাণ অর্থনীতি, সামাজিক চয়ন তত্ত্বের (দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য) জন্য এ পুরস্কার লাভ করেন। অর্থনীতির পুরস্কার ঘোষণা ও বাছাই করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমী অব সায়েন্স। যদিও তারা কেবল অর্থনীতির পুরস্কারই নয়, একই সঙ্গে পদার্থ এবং রসায়নের পুরস্কারও দিয়ে থাকেন।
এ বছরের অর্থনীতির বিষয়ে আসা যাক, নোবেলের ছয়টি বিষয়ের মধ্যে সবার শেষে ঘোষণা হয় অর্থনীতি। অক্টোবরের প্রথম থেকে পুরস্কার ঘোষণা হয়, ১০ অক্টোবর অর্থনীতির ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ঘোষণা। আমরা সাদামাটাভাবে যে অর্থনীতি ব্যবহার করছি, নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.nobelprize.org তাকে বলছে Economic Sciences । এ বছর অর্থনীতির পুরস্কার জয়ীরা হলেন টমাস সার্জেন্ট ও ক্রিস্টোফার সিমস।
উইকিপিডিয়ায় শুরু থেকে এ পর্যন্ত অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীদের একসঙ্গে ছবিসহ যে লিস্ট আছে তাতে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ বছরই একাধিক অর্থনীতিবিদ একসঙ্গে এ পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দুজন পেয়েছেন। কখনো তিনজন মিলে পেয়েছেন। একজনও পেয়েছেন, তবে সেটা কম। সাম্প্রতিক সময়ে এক বছরে একজন নোবেল পুরস্কার পাওয়া অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান। তিনি এ পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৮ সালে।
এ বছর যে দুজন নোবেল পান, উভয়ের মাঝেই কিছু মিল আছে। তারা উভয়েই অধ্যাপক এবং আমেরিকান। ১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে ৪০ বারের মতো এ পুরস্কার জিতলেন মার্কিনিরা। বয়সেও তারা সমান, বয়স ৬৮। তবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্ন। টমাস সার্জেন্ট নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা ও অর্থনীতির অধ্যাপক। অন্যদিকে ক্রিস্টোফার সিমস প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ের অধ্যাপক। নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে উভয়ের ছবিসহ বিস্তারিত দেয়া আছে। যাতে একটি অপশন হলো ‘কনগ্র্যাচুলেট দ্য নিউ লরিয়েটস’। এতে প্রায় এক হাজার মানুষ তাদের অভিনন্দন জানিয়েছে। এর মধ্যে এক নেপালির অভিনন্দনের ভাষাটা ছিল এ রকম— ‘Congratulation and Salute to both of you.’

এবারের অর্থনীতির বিষয় নিয়ে মূল বিষয়টাই বাদ পড়ে গেছে। তাদের অবদান। ম্যাক্রো অর্থনীতি ও সরকারের অর্থনৈতিক কর্মপন্থার ওপর গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। নোবেল কমিটি জানায়, সরকারের নীতি বা কর্মপন্থা কীভাবে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে এ নিয়ে তারা গবেষণা করেছেন। সুদের হারের অস্থায়ী বৃদ্ধি এবং কর হ্রাস অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে এ সম্পর্কীয় একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ হিসেবে ড. ইউনূসকেও এখানে আনা যায়। ড. ইউনূসের পড়াশোনা অর্থনীতি বিষয়ে হলেও তিনি নোবেল পেয়েছেন শান্তিতে। তাকে অর্থনীতিতে পুরস্কার না দিয়ে শান্তিতে দেয়ায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। ২০০৬ সালে দারিদ্র্যবিমোচন ক্ষুদ্র ঋণ প্রবর্তনে গ্রামীণ ব্যাংক এবং তাকে যৌথভাবে এ পুরস্কার দেয়া হয়।
এ বছরের অর্থনীতির এ দুই অধ্যাপক নোবেল পুরস্কার স্বরূপ পাবেন ১ কোটি সুইডিশ ক্রোনার, ডলারে তা ১৪ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশী টাকায় ১৫ কোটি প্রায়। তাদের এ পুরস্কার দেয়া হবে আগামী ১০ ডিসেম্বর।

বণিক বার্তা, 16 অক্টোবর ২০১১

ছবি- উইকিপিডিয়া

নিজস্ব আয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নীতি!

‘বাংলাদেশে বর্তমানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি ফি ও বেতন খুবই সামান্য।’ এ বক্তব্য দিয়ে শিক্ষাব্যয় বাড়ানোর একটা নীতিগত ন্যায্যতা তৈরি করেছে শিক্ষানীতি। অবশ্য এর আগের সব শিক্ষানীতি বা কমিশন— তা কুদরাত-এ খুদাই হোক, মজিদ খান কিংবা শামছুল হক সবাই এ শিক্ষাব্যয় বাড়ানোর সুপারিশই করেছেন
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হারটা দেখার চেষ্টা করি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০০৬-এর হিসাব অনুযায়ী ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী মাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়, যা অন্য অনেক দেশের তুলনায় কম। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের নীতি গ্রহণ করা ছিল বাস্তবতা। ঘটল উল্টোটা। ২০০৬ সালে তৈরি হয় দেশের উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র, যেখানে শিক্ষার সম্প্রসারণের বদলে সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এ কৌশলপত্র অনুযায়ী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বৃদ্ধি করে।
সম্প্রতি (২৫ সেপ্টেম্বর) প্রথম আলো ‘তিন বিশ্ববিদ্যালয়কে টাকা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয় রাজি নয়’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় বলে দেয়া হয় পাঁচ বছর এবং জাতীয় কবি নজরুল ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০ বছরের মাথায় নিজের আয় থেকে নিজস্ব ব্যয় নির্বাহ করতে। পাঁচ বছর পার হওয়ার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আর অন্য দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ১০ বছরের মেয়াদ শেষের আগেই বলছে, এটা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের দিন থেকেই উত্তাল ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অনেক দিনের। বিশেষ করে তারা যখন জানল, সরকার তাদের কাঙ্ক্ষিত ২৭(৪) ধারা বাতিলের দাবিকে অস্বীকার করে জানিয়ে দেয়— এ ধারা বাতিল হবে না। অর্থাত্ তাদের নিজস্ব আয়েই চলতে হবে এবং সরকার কোনো টাকা দিতে পারবে না। ২৫ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর চার দিনের বিক্ষোভ প্রশাসন সামলাতে না পেরে পূজার ছুটির নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২৭(৪) ধারায় বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পৌনঃপুনিক ব্যয় জোগানে সরকার কর্তৃক প্রদেয় অর্থ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাইবে এবং পঞ্চম বত্সর হইতে উক্ত ব্যয়ের শত ভাগ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় ও উত্স হইতে বহন করিতে হইবে।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি দমাতে পুলিশ যেমন তাদের ওপর দমন-পীড়ন করে, তার চেয়ে ছাত্রলীগের পদদলন ছিল দেখার মতো। এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয়— জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ব্লগাররা যখন সোচ্চার, সে আন্দোলন থেকে ৩১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় ব্লগার আসিফকে।
জগন্নাথের বিষয়ে বিস্তর আলোচনার পরিবর্তে আমাদের উচ্চশিক্ষার নীতি দেখব। কারণ জগন্নাথের এ ঘটনাপ্রবাহ এ নীতিরই এক অনিবার্য পরিণতি। ২০০৬ সালে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়ন এবং পরামর্শে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র তৈরি করে। কৌশলপত্রের সুপারিশমালা চার পর্বভিত্তিক মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো— প্রাথমিক পর্ব ২০০৬-০৭, স্বল্পমেয়াদি ২০০৮-১৩, মধ্যমেয়াদি ২০১৪-১৯ ও দীর্ঘমেয়াদি ২০২০-২৬। এতে সরকারের কাছে উচ্চশিক্ষা খাতে সব ধরনের ভর্তুকি বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ব্যয় খুবই কম। সরকারের উচিত উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীদের মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড তৈরি করা।
মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ের ৫০ শতাংশ অর্থ আসতে হবে এর অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ খাতে আয় বাড়ানোর দিকটায় জোর দিতে হবে। মঞ্জুরি কমিশনের এ সুপারিশ এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সরাসরি বেতন-ফি বৃদ্ধি না করেও বিভিন্ন ফির নাম করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিকই টাকা নিচ্ছে। যেমন বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন মাসে ২৫ টাকা। সে হিসাবে বছরে দাঁড়ায় ৩০০ টাকা। অথচ গত দুই সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শুধু পরিবহন চার্জই দিতে হয়েছে বার্ষিক এক হাজার ৮৫ টাকা করে।
২০০৬ সাল থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্নভাবে বছর বছর ফি বাড়াচ্ছে। অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধির কয়েকটি খাতের মধ্যে রয়েছে ছাত্র বেতন বৃদ্ধি, আবাসন ও ডাইনিং চার্জ বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা ভাড়া দেয়া, ক্যাফেটেরিয়া ভাড়া, দোকান ভাড়া, কনসালটেন্সি সার্ভিস, বিশ্ববিদ্যালয়ের বীমা প্রভৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় বাড়ানোর আরেক নজির হলো সান্ধ্য কোর্স চালু।
জগন্নাথসহ সাম্প্রতিক সময়ে যত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে, সবগুলোর চরিত্রই বলা চলে ‘নামে পাবলিক হলেও কর্মকাণ্ডে প্রাইভেট’। বলা যায়, ‘বেসরকারি মডেলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’। যেমন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ চারটি। ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ২০০, ডাইনিং ফি এক হাজার ৮০০ এবং বিদ্যুত্ বিল ও সেমিস্টার ফি বাবদ ৫ হাজার টাকা দিতে হবে প্রতি শিক্ষার্থীকে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার নীতিতে সম্প্রসারণের চেয়ে সংকোচন প্রবণতা স্পষ্ট। আমাদের শিক্ষানীতিগুলোও নীতি হিসেবে সংকোচনকে গ্রহণ করেছে। অবশ্য এবারের চূড়ান্ত শিক্ষানীতিতে কৌশলে এ ধারাটি বাদ দেয়া হয়েছে, যদিও নীতির খসড়ায় তা স্পষ্ট ছিল। উচ্চশিক্ষা অধ্যায়ে কৌশল-১০ এ বলা হয়েছে, ‘সরকারি অনুদান ছাড়াও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যয় নির্বাহের জন্য শিক্ষার্থীর বেতন ব্যবহার করতে হবে এবং ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহের চেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি ফি ও বেতন খুবই সামান্য।’ এ বক্তব্য দিয়ে শিক্ষাব্যয় বাড়ানোর একটা নীতিগত ন্যায্যতা তৈরি করেছে শিক্ষানীতি। অবশ্য এর আগের সব শিক্ষানীতি বা কমিশন— তা কুদরাত-এ খুদাই হোক, মজিদ খান কিংবা শামছুল হক সবাই এ শিক্ষাব্যয় বাড়ানোর সুপারিশই করেছেন। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের পিআরএসপির কৌশলেও ছাত্রদের বেতন-ফি বাড়িয়ে শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ১৭ থেকে ২৩ বয়সী ৪ শতাংশের কিছু বেশিসংখ্যক ছাত্র উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে। ভারতে এ হার ১১ দশমিক ৯, মালয়েশিয়ায় ২৯ দশমিক ৩ ও থাইল্যান্ডে ৩৭ দশমিক ৩ ভাগ। আমাদের উচ্চশিক্ষা সবার জন্য আবশ্যক, সে কথা বলছি না। দেশের বেশির ভাগ মানুষের অবস্থার আলোকে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যভাবে বললে দেশের দরিদ্র কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে ভূমিকা পালন করছে, এ জায়গাটায় বিশ্ববিদ্যালয় যে থাকছে না তা স্পষ্ট। ‘টাকা যার শিক্ষা তার’ নীতির মাধ্যমে শিক্ষা হয়ে পড়ছে কেবল এক শ্রেণীর জন্য। এতে বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্র শিক্ষার্থী।
সরকার উচ্চশিক্ষার জন্য দাতাদের দেয়া প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করে আদৌ লাভবান হওয়ার মতো কোনো বিষয় স্পষ্ট নয়। এমনিতেই আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাল যাচ্ছে। তেমন কোনো গবেষণা নেই, জাতীয়ভাবেও তেমন অবদান রাখতে পারছে না। র্যাংকিংয়ে দিন দিনই পিছিয়ে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং নিয়ে গণমাধ্যম প্রায়ই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৫ হাজারের মধ্যেও নেই এটি। এ অবস্থায় যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সরকারের গবেষণাসহ সার্বিক ব্যয় বাড়ানো উচিত, সেখানে তা সংকোচনের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার মতো নয়।
উচ্চশিক্ষায় সরকারের টাকা জোগাতে অনীহা স্পষ্ট। প্রত্যেক বছর বলা হয়, বাজেটে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়। মূলত তা শুভঙ্করের ফাঁকি। কারণ প্রত্যেক বছরই দেখা যায়, শিক্ষা খাতকে অন্য একটি খাতের সঙ্গে মিলিয়ে এতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়। সর্বশেষ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ ছিল ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। আবার এ অংশ জাতীয় আয়ের ২ শতাংশ মাত্র। ইউনেস্কোর নির্দেশনা হলো শিক্ষা খাতে ৮ শতাংশ ব্যয় করা।

বণিক বার্তা, উপসম্পাদকীয় ১০ অক্টোবর ২০১১