Monthly Archives: আগস্ট ২০১১

বিশ্ববিদ্যালয় : ক্লাসে কম উপস্থিতি কেন?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্যার (অধ্যাপক) ক্লাসের সব শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার প্রিয় স্থান কোনটি? জবাবে কেউ বলছে টিএসসি, কেউ ডাকসু, কারও কাছে হাকিম চত্বর, আবার কারও কাছে প্রিয় স্থানটি অপরাজেয় বাংলা। শুনতে শুনতে স্যার রেগে গেলেন, আসলে তিনি অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছেন, কারণ তার কাঙ্ক্ষিত জায়গার নামটি কেউ বলছে না। বিস্ময় প্রকাশ করলেন_ ক্লাসটা তোমাদের কারও কাছেই প্রিয় স্থান নয়!
৭ আগস্ট ২০১১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় ক্লাসে উপস্থিতির বিষয়ে বলা চলে এক কঠিন সিদ্ধান্ত হয়। কোনো শিক্ষার্থী ৬০ ভাগ উপস্থিত না থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। উপস্থিতি ৬৫-৭৪ শতাংশ থাকলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে। ৭৫ ভাগ পর্যন্ত উপস্থিতরাই কেবল নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেবে। আর বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের ৩০ ভাগের কম উপস্থিতি থাকলে ছাত্রত্ব বাতিল হবে। Continue reading

কোচিং সেন্টার চালু রাখতে হবে!


‘আইন করে কোচিং বন্ধের দাবি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের’Ñ ২২ জুলাই যুগান্তরের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে কোচিং বিষয়ে সব প্রতিষ্ঠান প্রধান বৈঠক করার পরদিনই প্রতিটি জাতীয় দৈনিকে এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বোঝাই যাচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তারা কোচিং বন্ধের দাবিতে একমত হয়েছেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা কোচিং বন্ধের যে দাবি করেছেন, কোচিংয়ের প্রতি বিশেষ প্রীতি কিংবা কোচিং ব্যবসা না থাকলেও সচেতন মানুষ মাত্রই তাদের এ দাবির বিপক্ষে। অর্থাৎ বাংলাদেশে কোচিং চালু আছে, থাকবে এবং চালু রাখতে হবে। এর সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের জন্যই এ লেখার অবতারণা।
যে কেউ কোচিংয়ের আন্তর্জাতিক রূপটা ইন্টারনেটের কল্যাণে সহজেই পেতে পারেন। কোচিং বিষয়ে অনুসন্ধান করলে, উইকিপিডিয়াসহ সব তথ্য ভাণ্ডার একত্র করলে বিশ্বব্যাপী চৌদ্দ ধরনের কোচিং পাওয়া যাবে। যেমন লাইফ কোচিং, স্পোর্টস কোচিং, বিজনেস কোচিং এমনকি ডেটিং কোচিং পর্যন্ত আছে। মজার বিষয় হল, এর মধ্যে এডুকেশন বা শিক্ষা কোচিং নামে কোন কোচিং নেই। আশ্চর্যের বিষয় হল, একমাত্র বাংলাদেশ ও ভারতে শুধু শিক্ষা কোচিং প্রচলিত আছে এবং এ দু’দেশে শিক্ষার জন্য কোচিং সেন্টারের সংখ্যা এত বেশি, যা পৃথিবীর সব কোচিংকে হারিয়ে দেবে। বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার বন্ধ না করে চালু রাখার পক্ষে প্রথম এবং শক্তিশালী যুক্তি এটি। বিশ্ববাসীকে আমরা দেখিয়ে দিচ্ছি এটা শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। আমাদের এ স্বাতন্ত্র্য ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও কোচিং সেন্টার চালু রাখতে হবে।
শিক্ষা প্রদান করা মহান ব্রত। একাডেমিক শিক্ষার বাইরে কোচিং ব্যবসায়ীরাও ঠিক এ মহান কাজটি করে যাচ্ছেন। কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দিলে কোচিং ব্যবসায়ীরা জাতির এ মহান খেদমত কিভাবে করবেনÑ জাতি যেন বঞ্চিত না হয়, সেদিকটা দেখলেও কোচিং চালু রাখাটা আবশ্যক।
গোটা বাংলাদেশে ঠিক কত হাজার কোচিং সেন্টার আছে তার কোন হিসাব নেই। পাড়া অনুযায়ী ধরলে গোটা ঢাকায় ধরা যাক এক হাজার কোচিং সেন্টার আছে (ছোট-বড় মিলিয়ে)। ঢাকার বাইরে প্রত্যেকটা জেলা সদর এবং থানা মিলিয়ে সংখ্যাটি ধরি ২০ হাজার (বেশি হতে পারে, কমও হতে পারে)। এর মধ্যে আবার নানা কিসিমের কোচিং আছেÑ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং, বিসিএস কোচিং, ইংরেজি শিক্ষার কোচিং ইত্যাদি। এসব কোচিংয়ের সঙ্গে গড়ে ১০ জন করে জড়িয়ে থাকলেও ২ লাখ মানুষ এবং তাদের পরিবার জড়িয়ে আছে। সংখ্যাটি আরও বেশি হওয়া স্বাভাবিক। কোচিং বন্ধ করলে এ মানুষগুলো বেকার হয়ে যাবে। সুতরাং কোচিং চালু রাখাই ভালো।
কোচিং দিয়ে অনেকেই কোটিপতি হয়েছেন। যারা প্রত্যেক বছর বিভিন্ন মানুষকে দান-সদকা করেন, তারা আবার এ টাকা দিয়ে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়েছেন, যেখানে অনেক মানুষ কাজ করে। কোচিং বন্ধ করলে একদিকে কোটিপতি হওয়ার এ পথটা বন্ধ হয়ে যাবে, অন্যদিকে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু ব্যাহত হবে, এতেও অনেক বেকার বাড়বে।
স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা অল্প ক’টাকা বেতন পান, যা দিয়ে নিজেদের সংসার চালানো দায়। কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে সে শিক্ষক যদি আরামে ১০ তলায় থাকতে পারেন, মন্দ কি!
প্রত্যেক বছর কোচিং করে হাজার শিক্ষার্থী বাংলাদেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠানে চান্স পাচ্ছে। প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে পঞ্চম, অষ্টম, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিসহ বিদেশেও যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। কোচিং বন্ধ করলে এরা চান্স পাবে কিভাবে?
শ্রেণীকক্ষে পড়ানোর জন্য যথেষ্ট সময় শিক্ষকরা পান না। একটার পর একটা ক্লাস নিতে গিয়ে তারা ক্লান্ত, শ্রেণীকক্ষে পড়ানোর মতো যথেষ্ট মুডও তাদের থাকে না। ফলে যা পড়ান শিক্ষার্থীরা কিছুই বোঝে না। ঠিক এ শিক্ষকরাই কোচিংয়ে পড়াতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফলে বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যেতে হয়। কোচিং বন্ধ হলে এসব শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়?
বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করে, অনেকেরই বাড়ি থেকে মা-বাবা টাকা পাঠাতে পারেন না। পাঠালেও তা দিয়ে চলে না। সেক্ষেত্রে কোচিং ক্লাস নিয়ে কিছু টাকা আয় করলে ভালোভাবেই চলা যায়।
যেসব শিক্ষকের কোচিং আছে, তিনি তার বিষয়ের পরীক্ষার প্রশ্নটা নিজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে দিতে পারেন। শিক্ষার্থীরা এর মাধ্যমে একটা এ প্লাস পেলে মন্দ কি! এভাবে যদি প্রত্যেক শিক্ষকের একটা করে কোচিং থাকে, সব বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া তো ব্যাপারই নয়। কোচিং না থাকলে এদের ভাগ্যে কী জুটত আল্লাহই জানেন।
কোচিং সেন্টারগুলো ভর্তির সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে থেকে ভ্যাটের টাকা অতিরিক্ত হিসেবে নিয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সরকার সে টাকা পাচ্ছে। কোচিং বন্ধ করে দিলে সরকারের আয়ের অন্যতম একটা উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং দেশের স্বার্থে হলেও কোচিংগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
আজকালকার অভিভাবকরা সন্তানের শিক্ষা নিয়ে খুবই টেনশনে থাকেন। তার পড়াশোনা আর ভালো রেজাল্টের চিন্তায় অভিভাবক অস্থির। কোন কোচিং যখন চ্যালেঞ্জ দিয়ে ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা দিচ্ছে সে কোচিংয়ে সন্তানদের দিয়েই অভিভাবক কিছুটা টেনশনমুক্ত থাকেন। কোচিংগুলো বন্ধ হয়ে গেলে অভিভাবকদের এ টেনশন কে কমাবে?
কোচিং চালু রাখার পক্ষে এভাবে অনেক যুক্তিই আসবে। সবচেয়ে ভালো হয় বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে কেবল কোচিং সেন্টারগুলো চালু রাখা। সরকার বছর শেষে শুধু একটা পরীক্ষা নিতে পারেন। এর মাধ্যমে বছর বছর সার্টিফিকেট দিয়ে এসএসসি-এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পৌঁছবে। আরও ভালো হয় বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্বটা কোচিং ব্যবসায়ীদের হাতে দিয়ে দেয়া। এতে সরকারের শিক্ষা সংক্রান্ত দুটি মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন হবে না, আর প্রয়োজন হবে না বছর বছর শিক্ষানীতি করা।
ফুটনোট : শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধান শিক্ষকরা বলেনÑ ক্লাসভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের প্রয়োজন পড়ে না। কোচিং বন্ধ করা না গেলে সার্বিক জাতীয় শিক্ষায় ধস নামবে। তাদের প্রতি এক নাগরিকের প্রশ্নÑ আপনার প্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে তো, আপনার প্রতিষ্ঠানের কয়জন শিক্ষক কোচিং ব্যবসা করেন?

শিক্ষানীতিতে নতুন শিক্ষাস্তরের সার্থকতা কোথায়

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সংক্রান্ত সর্বশেষ সংবাদ হলো- শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ২৬ জানুয়ারি ২০১১-তে গঠিত ২৪টি উপকমিটির একটি কমিটিও তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি (সমকাল, ২৫ জুলাই)। যে প্রতিবেদন কমিটিগুলোকে ২-৩ মাসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়। পাঁচ মাস পরও তারা তা জমা দিতে পারেনি। আর এভাবে এ শিক্ষানীতি শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দু’বছরেরও বেশি সময় পার করে ফেলেছে। এর আগে ২০০৯-এর ৪ এপ্রিল শিক্ষানীতি কমিটি গঠন, ২০০৯ এর ২ সেপ্টেম্বর কমিটির খসড়া শিক্ষানীতি প্রকাশ, ২০১০-এর ৩১ মে শিক্ষানীতি চূড়ান্তকরণ এবং মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন, আর ২০১০-এর ৭ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে তা পাস করা হয়।
যাহোক এ শিক্ষানীতি সব প্রক্রিয়া শেষে এখন বাস্তবায়নের পথে। শিক্ষানীতি মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদসহ সবপর্যায়ে অনুমোদন পেয়েছে মানে এর নতুন স্তরবিন্যাসেরই অনুমোদন। বলা চলে শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কিংবা সবার কাছে নতুন শিক্ষানীতি বোঝার জন্য এ স্তরবিন্যাসটা সহজ বিষয়। আগের শিক্ষাস্তরগুলো হলো- প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। এখন আর উচ্চ মাধ্যমিক থাকছে না। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা এখন হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। আর মাধ্যমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণীর পর হতে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত।
নতুন এ স্তরবিন্যাসের সার্থকতা কতটা তা পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে দেখা যাক। এখানে পরীক্ষা মানে পাবলিক পরীক্ষা। আগে উচ্চশিক্ষার পূর্বে পাবলিক পরীক্ষা ছিল দু’টি, এসএসসি ও এইচএসসি। এখন পাবলিক পরীক্ষা দাঁড়িয়েছে চারটিতে, পঞ্চম শ্রেণীর পর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, অষ্টম শ্রেণীর পর জেএসসি, আর এসএসসি এবং এইচএসসি তো আছেই।
পঞ্চম শ্রেণীর পর সমাপনী আর অষ্টম শ্রেণীর পর জেএসএসসির যৌক্তিকতা কী। বর্তমান শিক্ষাস্তরের সঙ্গে মিলিয়ে যদি বলি_ পঞ্চম শ্রেণীর পর প্রাথমিক শিক্ষার সমাপনী হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী। যদি তা-ই হয় তবে অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি কী? এবার জেএসসিকে যদি বলি ভবিষ্যৎ প্রাথমিক শিক্ষার সমাপনী (যখন অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হবে)। তবে পঞ্চম শ্রেণীর পর সমাপনীর আর দরকার কী?।
শিক্ষানীতিতে দেখা যাক। শিক্ষানীতির একুশতম অধ্যায় ‘পরীক্ষা ও মূল্যায়ন’। অধ্যায়টিতে পনেরটি কৌশল আছে। পাঁচ নম্বর কৌশলটি হলো_ ‘পঞ্চম শ্রেণী শেষে উপজেলা/পৌরসভা/থানা (বড় বড় শহর) পর্যায়ে সবার জন্য অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।’
ছয় নম্বর কৌশল_ ‘অষ্টম শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আপাতত এ পরীক্ষার নাম হবে জুনিয়র সার্টিফিকেট (ঔ.ঝ.ঈ) পরীক্ষা।’
আট নম্বর কৌশল_ ‘দশম শ্রেণী শেষে জাতীয় ভিত্তিতে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এ পরীক্ষার নাম হবে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (ঝ.ঝ.ঈ) পরীক্ষা। দ্বাদশ শ্রেণীর শেষে আরও একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, এর নাম হবে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (ঐ.ঝ.ঈ) পরীক্ষা।’
শিক্ষানীতির নতুন স্তরবিন্যাসের অসারতা বা অপ্রয়োজনীয়তা আসলে এখানেই। মুখে মুখে বা কাগজে কলমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বললেও আসলে উচ্চ মাধ্যমিক ঠিকই থাকছে। কারণ আগের মতোই মাধ্যমিকের পর এসএসসি পরীক্ষা হচ্ছে আর উচ্চ মাধ্যমিকের পর এইচএসসি পরীক্ষা হচ্ছে। এছাড়া প্রাথমিকের পর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতো আছেই। তাহলে শিক্ষার নতুন স্তরবিন্যাসের কার্যকারিতা কোথায়?
আর যদি নতুন স্তর ধরি, অষ্টম শ্রেণীর পর জেএসসি ঠিক আছে প্রাথমিক শিক্ষার সমাপনী হিসেবে। আর মাধ্যমিকের পর এইচএসসি থাকবে মাধ্যমিক শিক্ষার সমাপনী হিসেবে। তাহলে শুধু শুধু পঞ্চম শ্রেণীর পর সমাপনী আর দশম শ্রেণীর পর এসএসসি কেন?
এসব পরীক্ষা খুব বড় বিতর্কের বিষয় তা কিন্তু নয়। তবে সবকিছু মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো এতবেশি পাবলিক পরীক্ষা পৃথিবীতে কমই আছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত। বই মুখস্থ করে পরীক্ষা দিচ্ছে। পাস করছে। জ্ঞানার্জন বলতে কিছুই হচ্ছে না। যদিও শিক্ষানীতি পরীক্ষার্থীর মুখস্থকরণকে নিরুৎসাহিত করে সৃজনশীলতার কথা বলেছে। এত চাপে শিক্ষার্থী কিভাবে সৃজনশীল হবে তা বোঝা মুশকিল।
এতবেশি পরীক্ষা না নিয়ে, শিক্ষার স্তর ঠিক করে, স্তর অনুযায়ী সমাপনী পরীক্ষা নিলেও অনেকটা চাপ কমবে। এক্ষেত্রে নতুন শিক্ষানীতি উচ্চশিক্ষার আগে যে স্তরবিন্যাস করেছে, সে অনুযায়ী পরীক্ষা হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তর তথা অষ্টম শ্রেণীর পর হবে জেএসসি পরীক্ষা। আর মাধ্যমিক স্তর তথা দ্বাদশ শ্রেণীর পর হবে এইচএসসি পরীক্ষা। মাঝখানে পঞ্চম শ্রেণীর পর সমাপনীর দরকার নেই। আর দরকার নেই এসএসসিরও।
একথা ঠিক এ শিক্ষানীতি নতুন শিক্ষার স্তরবিন্যাস করলেও পরীক্ষার ক্ষেত্রে আগের পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছে। যেমন পঞ্চম শ্রেণীর পর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, দশম শ্রেণীর পর এসএসসি। এগুলো থাকার ফলে নতুন স্তরবিন্যাসের আর কোন যৌক্তিকতা রইল না। ফলে এখন আগের বিন্যাসেই শিক্ষাস্তর থাকাটা ভালো। মাঝখানে শুরু হওয়া অষ্টম শ্রেণীর পর জেএসসি বাদ দিলেই ঝামেলা চুকে যাবে।
মজার বিষয় হলো_ এ অষ্টম শ্রেণীর পর সমাপনী পরীক্ষার ব্যাপারে শিক্ষানীতিতে একটা ছাড় লক্ষণীয়। শিক্ষানীতির ‘পরীক্ষা ও মূল্যায়ন’ অধ্যায়ের সাত নম্বর কৌশলটি তা বলে দেয়_ ‘যেসব শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণীর পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে না, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের একটি কোর্স সমাপ্তি সনদপত্র প্রদান করবে এবং শিক্ষার্থীর আন্তঃপরীক্ষা ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের ফলাফল জন্ম তারিখসহ ওই সনদপত্রে লিপিবদ্ধ থাকবে।’ ফলে স্বাভাবিকভাবেই অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি বাদ দেয়াটা তেমন কোন সমস্যাই না।
আর আগের শিক্ষাস্তরের আরেকটা সুবিধাও আছে। সেটা হলো_ পরীক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ এসএসসি ‘ও’ লেভেল, এইচএসসি ‘এ’ লেভেল। ফলে আগের স্তরে ফিরিয়ে যাওয়া তেমন কোন ব্যাপার না। অন্যথায় একদিকে স্তরবিন্যাসের জটিলতা। অন্যদিকে চার চারটি পাবলিক পরীক্ষার ভার শিক্ষার্থীদের সইতে হবে।
বলার বিষয় হলো_ ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণী থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করার কথা। আর এর জন্যও একটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারকে সভাপতি করে এ কমিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণী থেকে কিভাবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করা যায়, তার বাস্তবায়ন কৌশল কী হবে, তা জানিয়ে কমিটিকে দু’মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন পেশ করার কথা বলা হয়। দু’মাসের জায়গায় এখন পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও কমিটি কোন প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি (নিউএজ, ৩ জুলাই)। এ কমিটির প্রধান সমস্যা হলো_ ঠিক কিভাবে নতুন স্তর অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজাবে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
বাংলাদেশের এ অবস্থায় নতুন স্তর করা জটিলই। কার্যত যেহেতু এ নতুন স্তরবিন্যাসে শিক্ষার্থীদের বেশি পরীক্ষা দেয়া ছাড়া কোন সার্থকতা নেই, সেহেতু আগের স্তরবিন্যাস রাখা যেতে পারে।

সংবাদে প্রকাশিত ০১-০৮-২০১১