Monthly Archives: জানুয়ারি ২০১১

শিক্ষানীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন

শিক্ষানীতি আলোচনার আগে শিক্ষার আলোচনা আবশ্যক। শিক্ষা কী? উত্তরটা প্রচলিত এবং চিরাচরিত ধারণার বাইরে খোঁজা যাক। জন মিল্টনের কথা ধরি- মানুষের দেহ মন ও আতœার বিকাশ সাধন হলো শিক্ষা, কিংবা সক্রেটিসের কথা- নিজকে জানা হলো শিক্ষা। এসব মনীষীদের কথা বাদ দিয়েও শিক্ষার একটা প্রচলিত ব্যাপক কথা আছে- ‘মানুষের আচরনের কাংখিত এবং বাঞ্চিত পরিবর্তন’। আমরা বলছি এগুলো শুধুই প্রচলিত আর চিরাচরিত কথা।
এর বাইরে এসে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব কথা হলো- ‘শিক্ষা হলো উৎপাদনের দক্ষ জনশক্তি তৈরি’। ভালোভাবে যাকে অনেকে বলেন ‘হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলাপমেন্ট বা দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি’। বিষয়টা স্পষ্ট, তবুও একটু ব্যাখ্যায় যাওয়া যাক। যারা শিক্ষা গ্রহনকরে আমরা তাকে বলি শিক্ষিত। এটা একাডেমিক। একাডেমিক যোগ্যতায় যে যত অগ্রসর সে ততবেশি শিক্ষিত। মাস্টার্স বা ¯œাতকোত্তর হলো সর্বোচ্চ। এখন পঞ্চম শ্রেনী হবে সর্বনি¤œ শিক্ষিত।
এ শিক্ষিত হওয়া মানে সে উৎপাদনের দক্ষ শ্রমিক। মাস্টার্স পাশ- সর্বোচ্চ শিক্ষিত, সর্বোচ্চ দক্ষ। তাকে তাকে যে কোন উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োগ করে। সাদামাটাভাবে বললে তার উচ্চ চাকরি নিশ্চিত।
উৎপাদনের ধরণ অনুযায়ী শিক্ষিত শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। যেমন- গার্মেন্টস। উৎপাদনের কারখানা। এখানে হেলপারের কাজ করতে পঞ্চম শ্রেণী পাশ শিক্ষার্থী যথেষ্ট। এরা অষ্টম শ্রেনী পাশ দেখলে সহজে নিয়ে নেয়।
শিক্ষানীতির মূল আলোচনা আসলে এখানেই। এটা দক্ষ শ্রমিক তৈরির নীতি। সুন্দরভাবে বললে, একটি দেশ পুরো মানব সম্পদ কিভাবে কাজে লাগাবে তার আলোচনাই শিক্ষানীতির মূখ্য বিষয়। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের শিক্ষানীতি কী বলেছে সেটা আমরা দেখবো।
শিক্ষানীতি ২০১০ এর বিষয়ে বলে রাখা আবশ্যক। ২০০৯ এর ৬ জানুয়ারি বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহন করেই এপ্রিলে শিক্ষানীতি কমিটি গঠন করে। কমিটি মে ২০০৯ হতে কাজ করে, তিনমাসের মাথায় খসড়া শিক্ষানীতি ২ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর নিকট জমা দেয়। পরে খসড়াটি শিক্ষামন্ত্রলায়ের ওয়েবসাইটে জনসাধারণের মতামতের জন্য দেয়া হয়।
সরকারের জানুয়ারি ২০১০ এ শিক্ষানীতি চূড়ান্ত করার কথা বললেও, ছয় মাস পর একত্রিশ মে’তে মন্ত্রীসভার বৈঠকে তা পাশ হয়। খসড়া শিক্ষানীতি চূড়ান্তভাবে পাশ হয় ৩ অক্টোবর ২০১০। জাতীয় সংসদে পাশ হয় ৮ ডিসেম্বর। ২৮ জুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে একুশ জনের সমন্বয়ে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করলেও, এখনো তাদের কোন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
মূল আলোচনায় চোখ ফেরাই। মানব সম্পদ উন্নয়ন। শিক্ষানীতির আটাশটি অধ্যায় দুটি সংযোজনী, শিক্ষানীতির শুরুতে প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর কথনে তা দেখবো। শুরুতেই প্রাক কথন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রী যে এ বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রেখেছেন তা প্রথম কয়েকটি লাইনেই রয়েছে- ‘দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগি শিক্ষানীতি’। তিনি শেষের দিকেও বিষয়টা এনেছেন ‘শিক্ষানীতিতে জীবন জীবিকার সুযোগ সৃষ্টিকারী শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা ব্যবস্থা রয়েছে- যা কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচিত করবে’। প্রধানমন্ত্রী এসব কথা মূল ফোকাস হিসেবে বলেছেন, তা বলা যাবেনা। তার এ বক্তব্য বিক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্ন।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে আসি। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে বিষয়টা এসেছে এভাবে- ‘নতুন প্রজন্মকে দক্ষ মানব সম্পদে উন্নীত করে এবং তা প্রয়োগ করে দারিদ্র্যতা, নিরক্ষরতা, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতাও পশ্চাৎপদতার অবসান ঘটিয়ে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে’। এছাড়া ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে আমাদের বিরাট সংখ্যক তরুণদের দক্ষ ও পেশাদার মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে হবে’। শিক্ষামন্ত্রীর কথায় ‘মানবসম্পদ’ এসেছে বটে, অনেকটা প্রধানমন্ত্রীর মতই কথার কথা।
শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়েছে, মোটেও বলা যাবেনা। ত্রিশটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মাত্র দুটিকে এ সংশ্লিষ্ট ধরা যায়- ‘দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে সৃজনধর্মী , প্রয়োগমুখী ও উৎপাদন সহায়ক করে তোলা, শিক্ষার্থীদেরকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা’। আরেকটা হলো- ‘শিক্ষার প্রত্যেক স্তরে যথাযথ মান নিশ্চিত করা এবং পূর্ববর্তী স্তরে অর্জিত ( শিক্ষার বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ) জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত দৃঢ় করে পরবর্তী স্তরের সাথে সমন্বয় করা’। এগুলো একেবারে প্রত্যক্ষ নয়, প্ররোক্ষ। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে এ গুরুত্বপুর্ণ বিষয়টা যেমন গুরুত্ব পায়নি, পুরো শিক্ষানীতিতে তার ছাপ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।
প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অধ্যায়টি দেখা যাক। বলে রাখার বিষয় হলো- পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত প্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষাকে শিক্ষানীতি অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত করার সুপারিশ করেছে। অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত বর্ধিত করার তেমন কোন কারন শিক্ষানীতি দেখায়নি, তবে একটা কথা মানব সম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যায় বলে, যুক্তি হিসেবে এটাকে আমরা নিতে পারি- ‘প্রাথমিক শিক্ষার পর অনেকে কর্মজীবন আরম্ভ করে বলে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা তাদের যথেষ্ট সহায়ক হতে পারে’। আমরা আলোচনার সুবিধার্থে এভাবে বলতে পারি- পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশোনা করে কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেনা, এক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেনীর যোগ্যতাকে অনেকে প্রাধান্য দেয়। ফলে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত করার যুক্তি এটাই, যাতে এ শিক্ষা শেষ করে, তার সার্টিফিকেট দ্বারা যেকোন কর্ম শুরু করা সম্ভব হয়।
গার্মেন্টস এর কথা আগেই বলেছি, প্রাথমিক শিক্ষার উদাহরন হিসেবে গার্মেন্টস গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বর্তমানে নিঃসন্দেহে এ সেক্টর অর্থনীতির বড় একটি খাত। এখানে শ্রমিক হিসেবে যারা কাজ করেন তাদের যোগ্যতা অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত হলেই চলে। অন্তত এ খাত বা এরকম আরো কয়েকটি খাতে শ্রমিক দেয়ার জন্যই অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা করা হয়েছে। সরকার যদি এ চিন্তা থেকে করে ভালো। বাস্তবতা হলো এ ব্যপারে এ অধ্যায়ের উপরের একটি লাইন ছাড়া কোন কথাই শিক্ষানীতিতে নেই। আরেকটা হলো, যদি ঠিক এদিক বিচেনায় রেখেই করা হয় , তাহলে পাঠ্য পুস্তকেও এ খাতের বিষয়ে পাঠ থাকবে। অসলেই সেটা হবে কিনা তা দেখার বিষয়।
অবশ্য প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অধ্যায়টিতে ‘শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী’ নামে একটি পয়েন্ট আছে, যার শেষ কথাটা আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক “প্রাথমিক স্তরের শেষ তিন শ্রেনী অর্থাৎ ষষ্ঠ হতে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জীবন পরিবেশের উপযোগী প্রাক বৃত্তিমূলক ও তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা প্রদান করা হবে, যাতে যারা কোন কারনে আর উচ্চতম পর্যায়ে পড়বেনা এ শিক্ষার ফলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হতে পারে”।
মাধ্যমিক শিক্ষা দেখি। শিক্ষানীতি এ শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে যা বলেছে তা আজকের বিষয়ের আলোচনায় মোটামুটি চলে- ‘এই স্তরের শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা সামর্থ্য অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ধারয় যাবে, নয়তো অর্জিত বৃত্তিমূলক শিক্ষার ভিত্তিতে বা আরো বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে জীবিকার্জনের পথে যাবে’। এখানে আরো বলা হয়েছে – ‘কর্মজগতে অংশগ্রহনের জন্য, বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, একটি পর্যায়ের প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিরূপে শিক্ষার্থীদের তৈরি করা’।
শিক্ষানীতি অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা এখন দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই যেকোন শিক্ষার্থী, এ স্তর পর্যন্ত যাতে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ পায় তার বন্দোবস্ত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর চিত্র এমনই, কম শিক্ষার্থীই সেখানে ব্যচেলর লেভেলে পড়াশোনা করে, অধিকাংশই এইচএসসি লেভেল পর্যন্ত পড়াশোনা করে পছন্দ অনুযায়ী কাজে প্রবেশ করে। যারা গবেষক হতে চায় বা যাদের রেজাল্ট খুব ভালো তারাই উচ্চতর ডিগ্রি নেয়।
বাংলাদেশের অবস্থা উল্টা। এইচএসসি পাশ করে সবাই অনার্সে ভর্তি হতে চায়, না পারলে ডিগ্রিতে হলেও ভর্তি হয়। ফলে সরকারের উপর উচ্চশিক্ষার একটা বিরাট চাপ বিদ্যমান। এটা ঠিক, এ অবস্থার সৃষ্টি হতোনা যদি শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে জীবন যাপন করার মত চাকরি বা কাজ এইচএসসি পাশ করেই পেতো।
শিক্ষানীতিতে এবার সে চেষ্টা দেখা গেলেও অলোচনার জন্য কয়েকটা বিষয় থেকেই যাচ্ছে। প্রথমত: যেসব প্রতিষ্ঠান চাকরি দিবে তারা এইচএসসি পাশ করা শিক্ষার্থী নেবে কি-না।
দ্বিতীয়ত: কর্মজীবনে প্রবেশের মত এমন কোন বিষয় সিলেবাসে থাকবে কি-না।
তৃতীয়ত: থাকলেও বাস্তবে কোন খাতে এগুলো কাজে লাগবে।
চতুর্থত: এইচএসসি পাশ করলেই চাকরি দেবে এমন প্রতিষ্ঠান সংখ্যা কেমন এবং তারা বছরে ঠিক কি পরিমান লোক নিতে পারবে।
শিক্ষানীতিতে মোটাদাগে কিছু কথা বলা আছে। বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ বা ফলানোর তেমন কোন কার্যকরী কথা নেই।
উচ্চশিক্ষায় আসি। এখানে উদ্দেশ্যে বলা আছে জ্ঞান সঞ্চারণ ও নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন এবং সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। দক্ষ জনশক্তির স্পষ্ট উল্লেখ শুধু এখানেই। এর বাইরে এ সংশ্লিষ্ট কথা হলো- ‘চার বছরের সম্মান স্নাতক ডিগ্রিকে সমাপনী ডিগ্রি হিসেবে এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকতা ব্যতিত অন্য সকল কর্মক্ষেত্রে যোগদানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে’।
আরেকটা কথা হচ্ছে- ‘বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতিতে পাট বস্ত্র ও চামড়া খাতের বিপুল গুরুত্ব ও সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় রেখে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, টেক্সটাইল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ অব লেদার টেকনোলজিকে অধিকতর শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে’।
উচ্চশিক্ষায় এরকম প্রতিষ্ঠানের কথা আসতেই পারে। পরিকল্পিত উপায়ে আগ থেকেই বর্তমান বাজার বিশ্লেষণ করে, উচ্চশিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠান গড়া উচিত ছিলো, যেটা হয়নি বললেই চলে। এক্ষেত্রে আইবিএ প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আইবিএ তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট, এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আজকে দেশের বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিসহ দেশের বাইরেও সহজেই এখানকার শিক্ষার্থীরা চাকরি পাচ্ছে। আমাদের উচ্চ শিক্ষায় চাকরির বাজার উপযোগি এরকম প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শুধু দেশের চাকরির বাজারই নয় আন্তর্জাতিক বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রতিবেশি ইন্ডিয়াকেই ধরি, এখানকার গ্রাজুয়েটরা বিশ্বে বিভিন্ন দেশে কাজ করছে।
আমাদের শিক্ষানীতি প্রনয়ণে মানব সম্পদ উন্নয়নের যা কথা আমরা শুনছি সবই অপরিকল্পিত এবং কথার কথা। যদি তা-ই না হতো, শিক্ষানীতি প্রনয়নের আগে বাংলাদেশের চাকরির বাজারের কী কোন জরিপ হয়েছে, শিক্ষানীতিতে কী কোন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ ছিলো, আগামী দিনের উদিয়মান খাতগুলো চিহ্নিত করেছে? সবগুলোর উত্তর ‘না’। এখানে উত্তর ‘না’ হলে মানব সম্পদের অর্থবহুল আলোচনা শিক্ষানীতিতে এসে, তা ‘হ্যাঁ’ হবে কীভাবে।

(Daily Jugantor বাতায়ন 24.01.2011)

প্রাথমিক শিক্ষা: ঝরেপড়া এখনও প্রধান চ্যালেঞ্জ


প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে এ বছর পাসের হার ৯২ ভাগ। পাসের হার সন্তোষজনক। উদ্বেগটা অন্যখানে, ঝরেপড়ায়। প্রায় ২৫ লাখ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করে। গত ২৩ নভেম্বর শুরু হওয়া পরীক্ষায় অংশ নেয় ২২ লাখ শিক্ষার্থী। প্রায় তিন লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়নি। ২২ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ২০ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৬ জন। ফেল করেছে দুই লাখ। অর্থাৎ মোট পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী শুধু পঞ্চম শ্রেণী থেকে ঝরে গেল।
গোটা প্রাথমিক শিক্ষায় এ ঝরেপড়ার হার কত ভাগ। গত ৮ নভেম্বর সমকাল শিক্ষামন্ত্রীর তরফে জানায় ৪৮ ভাগ। বিষয়টি স্পষ্ট। প্রত্যেক বছর ৪০ লাখের মতো শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। ৪০ লাখের মধ্যে সমাপনী পরীক্ষা শেষে দেখলাম টিকে আছে ২০ লাখ।
আমাদের অর্ধেক শিক্ষার্থীই পঞ্চম শ্রেণী পাস করার আগেই ঝরে যায়। তার ওপর দেশের মোট শিশুর ৯২ ভাগ স্কুলে আসে, অর্ধেকের সঙ্গে যুক্ত হলো আরও ৮ ভাগ। মানে, আমাদের অর্ধেকের বেশি শিশুই ঝরেপড়ার কাতারে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা তা-ই প্রমাণ করল।
প্রাথমিকে ফেল করা শিক্ষার্থী যেমন আছে, তেমনি পরীক্ষায় অংশই নেয়নি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। অংশ না নেওয়ার পেছনে অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ ছিল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্র অনেক দূরে। দূরে কেন্দ্র হওয়ার ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে যেতে পারেনি। এটার সমাধান খুব সহজ, গ্রামভিত্তিক, ইউনিয়ন ছোট হলে ইউনিয়নভিত্তিক কেন্দ্র দেওয়া। এরকম ছোট ছোট এবং সহজে সমাধানযোগ্য কারণগুলো খুঁজে সহজ সমাধান বের করা।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় যারা ফেল করেছে বা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা নিঃসন্দেহে কষ্টের বিষয়। প্রধান প্রতিবন্ধকতা দারিদ্র্য। দরিদ্র পরিবারের অভিভাবক তাদের সন্তানদের আবার স্কুলে দেওয়ার প্রেষণা হারিয়ে ফেলবে। এক্ষেত্রে এক বিষয় বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের ওই বিষয়ে আলাদা পরীক্ষার সুযোগ রেখে, পরবর্তী শ্রেণীতে ভর্তির অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়গুলোকে তাদের ফেল করা এবং পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে অধিক তত্ত্বাবধান করার ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে।
এ কথা ঠিক, পাবলিক পরীক্ষা বেড়েছে বলে গোটা শিক্ষার মান যেমন আমাদের কাছে স্পষ্ট, তেমনি এর চ্যালেঞ্জগুলো। বলাই যায়, ঝরেপড়াটা এখনও আমাদের শিক্ষার প্রধান চ্যালেঞ্জ। আগের এসএসসি আর এইচএসসি তো থাকছেই, নতুন করে যোগ হলো জেএসসি এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর ব্যাপারে আরও কথা আছে। ১০-১১ বছরের একটি শিশুকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়ে এ পরীক্ষা নিজেই ঝরেপড়া বাড়াচ্ছে কি-না, সংশয় প্রকাশ করেছে অনেকেই।
প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করার ব্যাপারে অনেক তোড়জোড় বক্তব্য শোনা যায়। তার তুলনায় ঝরেপড়া রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের আওয়াজ খুবই ক্ষীণ। অথচ গুরুত্ব দেওয়া উচিত এখানেই।

সমকালে প্রকাশিত 14 January11