Monthly Archives: ডিসেম্বর ২০১০

বৃটেনে টিউশন ফি বৃদ্ধি, ছাত্র বিক্ষোভ এবং বাংলাদেশ

সম্প্রতি বৃটেনের উচ্চশিক্ষায় টিউশন ফি বৃদ্ধির বিষয়টি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচিত হয়। এ আলোচনা ব্যাপক হওয়ার পেছনে একটা বিষয় অবশ্যই রয়েছে ‘ছাত্র বিলোভ’। বলে রাখছি, বৃটেনে একসময় দেশি বিদেশি সকল শিক্ষার্থীদের সমান টিউশন ফি ছিলো। আস্তে আস্তে বিদেশিদের ফি বাড়তে থাকে, ক্ষেত্র বিশেষে তা দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণও।
দিন দিন বিদেশি শিক্ষার্থীদের সাথে স্থানীয়দের ফি ও বাড়ছে। ফি বাড়ার সকল রেওয়াজ ভঙ্গ করে যখন তিনগুন করা হলো, ছাত্ররা তখনি রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। নয় ডিসেম্বর বৃটেনের নি¤œকক্ষ হাউজ অব কমন্সের অনুমোদন পর্যন্ত ছাত্ররা তিনবার বিক্ষোভ প্রদর্শণ করে। চৌদ্দ ডিসেম্বর উচ্চ কক্ষ হাউজ অব লর্ডসের অনুমোদনের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত অনুমতি পেল। লর্ড ব্রাউনের উচ্চশিক্ষায় টিউশন ফি বৃদ্ধি সংক্রান্ত ‘হাইয়ার এডুকেশন ফান্ডিং এন্ড স্টুডেন্ট ফাইনান্স’ শীর্ষক আইনের মাধ্যমে বৃটেনের শিক্ষার্থীদের আগে যেখানে সর্বোচ্চ তিন হাজার পাউন্ড দিতে হতো সেখানে গুনতে হবে নয় হাজার পাউন্ড।
মজার বিষয় হলো, বৃটেনের পূঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায়, ভোগ বিলাসে মত্ত মানুষ খুব কমই কোন অন্যায়ে রাস্তায় নামে, কিন্তু এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা বসে ছিলেনা, তীব্র বিক্ষোভ করেছে। তিন দফার এ ছাত্র বিক্ষোভে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভবন এমনকি প্রিন্স চার্লস এবং ক্যামিলার গাড়ির ওপর হামলা, যদিও তাদের তেমন কিছু হয়নি।
ছাত্র বিক্ষোভে দেখার বিষয় ছিলো তাদের দাবি, তারা বলেছে ‘এডুকেশন ইজ এ রাইট নট এ কমোডিটি’। বাংলাদেশের বামপন্থীরা যেভাবে বলে শিক্ষা পন্য নয়, অধিকার। বৃটেনের এ ছাত্র বিক্ষোভকে ফলে অনেকে বামপন্থী বা একটা অংশের বিক্ষোভ হিসেকে দেখেছেন। বৃটেনের মিডিয়াগুলোও সেভাবেই এ সংবাদকে ফলাও করেছে। ভাবটা এরকম তারা বামপন্থী, গাধা, দাঙ্গা সৃষ্টিকারী। তাদেরকে ধক্ষংসাতœক কার্যকলাপের দোসর বানিয়ে অগুরুত্বপূর্ণ করে তোলাই যে তাদেও লক্ষ্য, বোঝাই যায়।
অবশ্য বিশ্বের অন্যান্য মিডিয়া যে বিষয়টা দেখছে তা বোঝা গেলো নিউইয়র্ক টাইমসের আন্তর্জাতিক সংস্করণ ‘ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনের’ তেরো ডিসেম্বরের সম্পাদকীয়তে। ‘এ ব্রিটিশ এডুকেশন’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে বৃটেনের ছাত্র বিক্ষোভকে অগুরুত্বপূর্ণ বা একশ্রেনীর বলে উড়িয়ে দেয়ার কোন জো নেই। এ বিক্ষোভ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বৃটেনের পার্লামেন্ট যে টিউশন ফি বাড়াচ্ছে তাকে নেতিবাচকভাবে দেখে হেরাল্ড ট্রিবিউন বলছে ‘ফেইলিয়র এডুকেশন পলিসি বা ব্যর্থ শিক্ষানীতি।
বৃটেনের শিক্ষার্থীদের তিনগুন ফি বাড়ানোর প্রভাবটা বোঝা যাক। সম্প্রতি ইপসস মৌরি নামের একটি ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জরিপ চালিয়েছে, দেখিয়েছে এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র পরিবারগুলো। এসব পরিবারের উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশী সন্তানরা শিক্ষা হতে বঞ্চিত হবে। দেখানো হয়েছে, বর্তমান টিউশন ফি ৩,২৯০ পাউন্ড হতে ৫০০০ পাউন্ড করলে দারিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই উচ্চশিক্ষার আশা ত্যাগ করবে। ৭০০০ পাউন্ড করলে দুই তৃতীয়াংশই বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃটেনের টিউশন ফি বৃদ্ধির সাথে রাজনীতিতেও একটা গুরুত্বপূর্ন পরিবর্তণ হয়েছে। গত সরকারের সময়ে ব্লেয়ার যখন একহাজার পাউন্ড টিউশন ফি ( শিক্ষার্থীদের মা বাবার সামর্থ্য সাপেক্ষে) প্রবর্তণের আইন করে, বর্তমান কোয়ালিশন সরকারের জোট লিব-ডেম তখন এর তীব্র বিরোধিতা করে। লিব-ডেম ঘোষনা দেয় তারা ক্ষমতায় গেলে এ টিউশন ফি’র বিধানই বাতিল করে দেবে। অথচ বাস্তবে তারা বর্তমান কনজারভেটিভ সাথে একমত হয়েছে তিনগুন ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে। এ কথা অবশ্য ঠিক, অনেক সদস্যই এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। মাত্র ২১ ভোটের ব্যবধানে এ আইনটি পাস হয়।
অস্বীকার করার জো নেই, বৃটেনে বর্তমানে অর্থনীতির ক্ষেত্রে কৃচ্ছতা সাধন কার্যক্রম চলছে, এ সরকার ক্ষমতায় আসার পরই মন্ত্রীসভার সদস্যদের বেতন কমানোর মাধ্যমে যার সূচনা। বৃটেন তাই বিভিন্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে বাজেট ঘাটতি কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধব্যয়টা অন্যতম । তবে শিক্ষা খাত এর অন্তভর্’ক্ত নয়। বাস্তবে দেখা গেলো উল্টো , অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর আগেই শিক্ষা খাতের এ সিদ্ধান্ত এলো। ফলে ২০১২ সাল হতে শিক্ষায় টিউশন ফি তিনগুন বেড়ে যাচ্ছে। শিক্ষাকেও এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়টির সমালোচনা করেছেন অনেকেই। লিব-ডেমরাও সেকথাই বলেছে সকল খাতের ফি বাড়ালেও তারা শিক্ষায় বাড়াবেনা।
বৃটেনের উচ্চশিক্ষার ফি বৃদ্ধির প্রভাব নি:সন্দেহে বাংলাদেশের ওপর পড়বে। বাংলাদেশ থেকে প্রত্যেক বছর অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক উচ্চ ডিগ্রি নিতে ব্রিটেনে। এদের মধ্যে অনেকে কমন ওয়েলথ, শিভেনিংসহ অন্যান্য শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে যায়। অনেকে আবার নিজেদের খরচেও যায়। বৃটেনে এ ফি বাড়ানোয় যারা নিজস্ব খরচে যেতো তাদের যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কারন বর্তমানে কোন বাংলাদেশী বিশেী হিসেবে যদি নয় হাজার পাউন্ডে পড়াশোনা করে তাকে আগামী বছর হতে দিতে হবে ন্যুনতম ২০ হাজার পাউন্ড। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় একুশ লাখ। এতো টাকা দিয়ে বাংলাদেশের কোন শিক্ষার্থী নিজ খরচে পড়াশোনা করতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক।
বৃটেনের এ উচ্চশিক্ষার নীতি বর্তমান ক্ষমতাসীনদেও জন্য চ্যালেঞ্জ ছিলো। তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ আর সাংসদদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ডেভিড ক্যামেরন সরকার উচ্চ এবং নিম্ন উভয় কক্ষেই পাস করাতে সক্ষম হন। এখন দেখার বিষয় হলো বাজেট ঘাটতি কমাতে অন্য খাতগুলোতে তারা কী করেন।

সমকালে প্রকাশিত, ২২ ডিসেম্বর ২০১০