ফেসবুকের কাছে মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফা বড়-ফ্রান্সেস হাউগেন

রোববার (৩ অক্টোবর) মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএস টিভিকে সাক্ষাৎকার দেন ফ্রান্সেস হাউগেন। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক বিষয়ে একের পর এক বোমা ফাটানোর মতো অনেক গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এই কর্মী। কিন্তু কখনও নিজের পরিচয় সামনে আনেননি। তবে এবার প্রকাশ্যে এসেছেন সেই তথ্যদাতা। এ নারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক স্কট পেলি। সিক্সটি মিনিটস অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারের প্রাসঙ্গিক অংশ পত্রস্থ হলো। ইংরেজি থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক।

স্কট পেলি: আপনি যখন গত মে মাসে ফেসবুক থেকে পদত্যাগ করেন, তখন ফেসবুকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক অভিযোগ করেন। ফেসবুকের গোপনীয় সেসব নথি গত মাসে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায় প্রকাশ হয়। কেন আপনি ফেসবুকের গোপন তথ্য প্রকাশ করেছেন?

ফ্রান্সেস হাউগেন: আপনাকে ধন্যবাদ। যে বিষয়টি আমি ফেসবুকে বারবার লক্ষ্য করেছি, সেটা হলো মানুষ ও ফেসবুকের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব। ফেসবুক বরাবরই তার নিজের স্বার্থ দেখেছে এবং বেশি অর্থ বানাতে মনোযোগ দিয়েছে।

স্কট পেলি: আপনি যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্য থেকে আসা ৩৭ বছরের একজন তথ্যবিজ্ঞানী। আপনি কম্পিউটার প্রকৌশলে পড়েছেন এবং হার্ভার্ড থেকে ব্যবসায় মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। গত ১৫ বছর ধরে গুগল পিন্টারেস্টসহ উল্লেখযোগ্য কোম্পানিতে কাজ করেছেন…।

ফ্রান্সেস হাউগেন: আপনি ঠিক বলেছেন। আমি ফেসবুকেও কাজ করেছি। আপনি নিশ্চয় অনেক সামাজিক নেটওয়ার্ক দেখেছেন। তবে আমি অন্য কোথাও ফেসবুকের মতো এতটা বাজে অবস্থা দেখিনি। Continue reading

শিক্ষার্থীর ‘শিখনশূন্যতা’ পূরণই বড় চ্যালেঞ্জ-অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান

ড. ছিদ্দিকুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হিসেবে ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি একই ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০৯ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। প্রবীণ এ শিক্ষাবিদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউনিসেফসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠানে কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি এবং ১৯৮২ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট ডক্টরেট অর্জনকারী ছিদ্দিকুর রহমান কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন।

সমকাল: করোনার কারণে দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে। এটাই খোলার যথার্থ সময়?

ছিদ্দিকুর রহমান: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা খুব জরুরি ছিল। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। যদিও আরও আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যেত। বিশেষ করে গত বছরের এ সময়ে করোনা সংক্রমণের হার আরও কম ছিল। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা যেত। করোনা অতিমারি আমাদের জন্য নতুন বিষয়। করোনার কারণে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। ওই সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতো। দেড় বছর ধরে শিক্ষার্থীদের অনেকেই অধৈর্য হয়ে পড়েছে। অনেকেই এ দীর্ঘ সময়ে পড়াশোনার বাইরে রয়েছে। দেরিতে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে- এটাই স্বস্তির।

সমকাল: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে প্রশাসনের তরফ থেকে বিশেষ নির্দেশনা বিষয়ে আপনার মন্তব্য…

ছিদ্দিকুর রহমান: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা জরুরি। ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। আমি মনে করি, এসব নির্দেশনা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাতে বাস্তবায়ন করে, সে জন্য প্রশাসনের কঠোর হওয়া দরকার। একই সঙ্গে প্রয়োজন নিবিড় পর্যবেক্ষণ।

সমকাল: এখনই কি পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা উচিত?

ছিদ্দিকুর রহমান: না। এখনই পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা ঠিক হবে না। আমরা জানি, করোনার কারণে মাঝখানের দীর্ঘ সময় তাদের রুটিন ছিল ভিন্ন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, স্কুলে যাওয়া, বিকেলে খেলাধুলা করা, রাতে পড়তে বসা- এ রকম নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে ছিল তারা। অনেকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি ছিল। এখন হঠাৎ প্রতিদিন পাঁচ-ছয় ঘণ্টা করে ক্লাস হলে তারা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে না। পুরোদমে শ্রেণি কার্যক্রমে তাদের মনোযোগী হতে সময় লাগবে। Continue reading

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় আমরা বিশ্ব থেকে শিক্ষা নিইনি

করোনায় সব চললেও দেড় বছর পরও বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

লকডাউন যখন ১১ আগস্ট থেকে লকমুক্ত হলো, তখনও গণপরিবহন কিংবা পর্যটনের ওপর কিছু বিধিনিষেধ ছিল। বৃহস্পতিবারের সরকারি ঘোষণায় সেটিও প্রায় মুক্ত করা হলো। ১৯ আগস্ট থেকে পুরোদমে সব খোলা। যানবাহন চলবে শতভাগ যাত্রী নিয়ে। মার্কেট চলছে আগের নিয়মে। ব্যাংকসহ সব প্রতিষ্ঠান চলছে পূর্ণ কার্যদিবস। কিন্তু যেটা খোলা প্রত্যাশিত এবং জরুরি ছিল, সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই খোলা হয়নি। একটানা এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত কেবল প্রায় চার কোটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীই দিচ্ছেন না; বরং জাতি হিসেবে আমরা সবাই দিচ্ছি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে ১১ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি যদিও বলেছেন, সেপ্টেম্বরেই স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে। তারপরও আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের দোলাচলই দেখি। বলাবাহুল্য, যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমরা দেখেছিলাম গত বছরের ঠিক এ সময়ে। তখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব খোলা হয়েছিল। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোল হয়নি। এভাবে নীতিনির্ধারকদের সঠিক সময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে একটানা দেড় বছরের অধিককাল পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে বিশ্বে রেকর্ড গড়ছে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত ২২ দফায় ছুটি বেড়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সব যখন মহাসমারোহে খুলেছে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে কেন এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব? অবস্থার বিচারে ছুটি আর না বাড়িয়ে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা জরুরি। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। ফলে আবাসিক হল খুলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ও খুলে দিতে বাধা থাকবে কেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্কুলের ছুটিও ৩১ আগস্টের পর আর বাড়ানো উচিত হবে না। আমরা জানি, স্কুল খোলার প্রস্তুতি শিক্ষা প্রশাসন ইতোমধ্যেই নিয়ে রেখেছে। কারণ কয়েকবারই খোলার প্রস্তুতি নিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং করোনার দোহাই আর না দিয়ে সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন খুলে দেওয়া উচিত, তার স্বপক্ষে গত মাসে জাতিসংঘের দুটি সংস্থা ইউনিসেফ ও ইউনেস্কো জোরালো যুক্তি প্রদর্শন করেছে। Continue reading

বঙ্গবন্ধুর জবানিতে ফজিলাতুন্নেছা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠার পেছনে যে মহীয়সী নারীর নেপথ্য ভূমিকা আমরা দেখি, তিনি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর দুটি গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’র উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী ‘রেণু’। বৃহৎ সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি অর্থসহ রাজনীতিতে নানাভাবে সহযোগিতা করে কীভাবে অনুপ্রেরণাদাত্রী হিসেবে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ভূমিকা পালন করেছেন, সে এক বিস্ময়। জেলবন্দি বঙ্গবন্ধুর কাছে জরুরি খবর, কর্মীদের কাছে নেতার নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়াসহ বহুমুখী ভূমিকা পালন করেছেন ‘বঙ্গমাতা’।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ঘটনাপর্ব ১৯৪৩ থেকে ১৯৫৫। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লেখার প্রেরণা হিসেবেই বঙ্গবন্ধু সহধর্মিণীর কথা বলেছেন- “আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’ আমার স্ত্রী- যার ডাকনাম রেণু- আমাকে কয়টা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।”

বঙ্গবন্ধু জীবনী লিখতেই বংশপরিচয় পর্বে আবার রেণুর প্রসঙ্গ। ‘আমার দাদার চাচা এবং রেণুর দাদার বাবা কলকাতা থেকে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে চলে আসেন বাড়িতে। …রেণুর দাদা আমার দাদার চাচাতো ভাই। তিনি তাঁর জীবনী লিখে রেখে গিয়েছিলেন সুন্দর বাংলা ভাষায়। রেণুও তার কয়েকটা পাতা পেয়েছিল যখন তার দাদা সমস্ত সম্পত্তি রেণু ও তার বোনকে লিখে দিয়ে যান তখন। রেণুর বাবা মানে আমার শ্বশুর ও চাচা তাঁর বাবার সামনেই মারা যান। মুসলিম আইন অনুযায়ী রেণু তার সম্পত্তি পায় না। রেণুর কোনো চাচা না থাকার জন্য তার দাদা সম্পত্তি লিখে দিয়ে যান। আমাদের বংশের অনেক ইতিহাস পাওয়া যেত যদি তাঁর জীবনীটা পেতাম। রেণু অনেক খুঁজেছে, পায় নাই।’

কৈশোরেই কীভাবে শেখ মুজিব ও ফজিলাতুন্নেছার বিয়ে হয়, এ ব্যাপারে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলা হয়েছে- “একটা ঘটনা লেখা দরকার, নিশ্চয়ই অনেকে আশ্চর্য হবেন। আমার যখন বিবাহ হয়, তখন আমার বয়স ১২-১৩ বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাওয়ার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাবো।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হল। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধ হয় তিন বছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তার মা মারা যান। Continue reading

জলবায়ু পরিবর্তন : প্রয়োজন নতুন ‘সবুজ চুক্তি’

মূল: এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন ২০২১ সালের জলবায়ুর দিকে তাকাবে তখন হয়তো বলবে, ‘সেটা ছিল এমন বছর, যখন সমস্যার অন্ত ছিল না।’ ইংল্যান্ডে তীব্র তাপমাত্রা ও বন্যা, পাকিস্তানে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় তীব্র তাপমাত্রায় মানুষের মৃত্যু, জার্মানি ও চীনে মরণঘাতী বন্যা। এক মাসের মধ্যে এত অঘটন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আবহাওয়া অফিসের সতর্কবার্তা। যেখানে বলা হয়েছে, তীব্র আবহাওয়ার সময় মাত্র শুরু হলো।

সতর্কবার্তা অনিবার্য এ কারণে যে, জলবায়ুর অবস্থা সঙ্গিন। যেখানে এও বলা হয়েছে, সংকটের ইতিহাসে বর্তমান প্রজন্ম এক বিশেষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে। যে নাজুক ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, সে জন্য জলবায়ু সংকট উড়িয়ে দেওয়ার অবস্থায় নেই। একে আমরা এড়িয়ে গেলে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বড় ক্ষতি শিগগিরই অপেক্ষা করছে। যত দিন যাচ্ছে আমাদের সম্ভাবনার জানালা যেন একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা এ যুদ্ধে এমন দশকে অবস্থান করছি, যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে জলবায়ু সংকটের সমাধানের বিকল্প নেই।

আগামী কয়েকটি বছরে আমরা যা করব, তার ফল পরবর্তী কয়েকশ বছর পর্যন্ত থাকবে। বিশ্ব এই দশকে কার্বন নিঃসরণ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে না পারলে আমরা ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ সেলসিয়াসের মধ্যে আনতে ব্যর্থ হবো। আমরা ১ দশমিক ২ সেলসিয়াস উষ্ণতার বিধ্বংসী ফল দেখছি। এটি বেড়ে যদি ২ দশমিক ৫ বা ৩ সেলসিয়াসে পৌঁছে, তার পরিণতি কী হতে পারে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে গরম আমরা দেখেছি, তা এর আগে দেখা যায়নি। এমনকি সাম্প্রতিক শীতের অবস্থাও তথৈবচ।
Continue reading

অন্যের চরকায় তেল দেওয়ার বাতিক

‘পাছে লোকে কিছু বলে’- এটাই বাস্তবতা। তবে তাদের জন্য যথার্থ উত্তর ‘নিজের চরকায় তেল দাও।’

অন্যের বিষয়ে নাক গলাতে আমরা অনেকেই সিদ্ধহস্ত। একনজর দেখেই মন্তব্য করার মতো বিশেষজ্ঞ সমাজে কম নেই। সহপাঠীকে ভালোভাবে ডাকার মতো বন্ধুর সংখ্যা যেন বিরল। অনেক শিক্ষকও শিক্ষার্থীকে সম্বোধন করে যে ‘বডি শেমিং’ করে ফেলছেন, সে হুঁশও নেই। খোশগল্পে সুযোগ পেলেই অনেক সময় কাউকে আকাশে উঠাচ্ছি, আবার কাউকে জমিনে আছড়ে ফেলছি। পরচর্চায় বাঙালির মুনশিয়ানা বলে কথা।

কারও থেকেই যেন নিস্তার নেই। কোনোভাবেই যেন রেহাই নেই। শারীরিকভাবে লম্বা হলে তো কথাই নেই। খাটো হলেও কথা শুনতে হবে। মোটা হলেও উপদেশের বান আপনার দিকে ধেয়ে আসবে। চিকন হলেও সমস্যা। কালো হওয়ার বিপদ ভুক্তভোগীরাই জানেন। আর সুন্দরী হলেও মাপ নেই। আমরা চিন্তাও করতে পারি না, অপরের দিকে মুখ নিঃসৃত যে শব্দ বেরিয়ে যাচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১৬ বছরের কিশোর আজওয়াদ আহনাফ করিমের মৃত্যুর খবর আমরা দেখেছি। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আমাদের হতবাক করেছে। Continue reading

উপমহাদেশ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী বিভ্রান্তি

শিল্পীর আঁকা পলাশি যুদ্ধের চিত্র

মূল: অমর্ত্য সেন

ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরু হয় ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের মাধ্যমে। যুদ্ধটা ছিল সংক্ষিপ্ত, প্রত্যুষে শুরু হয়ে সূর্যাস্তের ক্ষণে শেষ। পলাশি অবস্থিত কলকাতা ও মুর্শিদাবাদের মাঝামাঝি পর্যায়ে। আম্রকাননে অনুষ্ঠিত ওই যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী নবাব সিরাজউদ্দৌলা সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয় এবং তার বাহিনীকে পরাজিত করে। তারপর ব্রিটিশরা প্রায় দুইশ বছর রাজত্ব করে। এত দীর্ঘ সময়ে তারা ভারতে কী অর্জন করে? আর তাদের ব্যর্থতাই বা কী?

১৯৪০-এর দশকে আমি যখন পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রাগ্রসর স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন এসব প্রশ্ন আমাদের আলোচনায় এসেছিল। এখনও সে প্রশ্নের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। কেবল এ কারণে নয় যে, ব্রিটিশ রাজত্ব প্রায়ই বৈশ্বিক সুশাসনের সফলতায় এ আলোচনা সামনে আনে বরং এ কারণেও যে আজ তারা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিষয়টি দেখাতে চায়। কয়েক দশক আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের স্কুলে এসব আলোচনায় জটিল প্রশ্নে বিরক্তই হতাম। আমরা কীভাবে গত শতকের চল্লিশের দশকে চিন্তা করতে পারতাম যে, ভারতে কখনও ব্রিটিশ শাসন ছিল না? ১৭৫৭ সালে যখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শুরু হয় তার সঙ্গে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের যাওয়ার সময়কার ভারতের পার্থক্য ছিল সামান্যই। যদিও একেবারে পরিবর্তন হয়নি তা নয়। কিন্তু পরিবর্তনগুলোর জবাব আমরা কীভাবে দিতে পারি?

অতীতে ভারতের ইতিহাসে বড় অর্জন হলো- দর্শন, গণিত, সাহিত্য, কলা, স্থাপত্য, সংগীত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাষা ও জ্যোতির্বিদ্যা। ঔপনিবেশিক শাসনের আগে ভারতের অর্থনৈতিক অর্জন বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। ভারতের অর্থনৈতিক সম্পদের বিষয়টি অ্যাডাম স্মিথের মতো ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকরাও স্বীকার করেছিলেন। এসব অর্জন সত্ত্বেও ইউরোপের যে অর্জন ছিল, আঠারোশ শতকের মধ্যভাগে ভারত তা থেকে পিছিয়েই ছিল। পিছিয়ে পড়ার ধরন ও তার তাৎপর্য আমাদের স্কুলের বিকেলে বিতর্কের বিষয় ছিল। Continue reading

কৃষি বাজেটের সুফল সরাসরি কৃষকের ঘরে পৌঁছান- আবদুল লতিফ মণ্ডল

আবদুল লতিফ মণ্ডল খাদ্য সচিব হিসেবে ২০০২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে এক বছর রাষ্ট্রপতির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই সংবাদপত্রে বিশেষত কৃষি খাতের নানাদিক নিয়ে লিখছেন নিয়মিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আবদুল লতিফ মণ্ডল শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও সিএসপি অফিসার হিসেবে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করেন স্বাধীনতারও আগে। তিনি রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন।

সমকাল: বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষি খাতকেন্দ্রিক হলেও জাতীয় আয়ে কৃষি খাতের অবদান সেই অর্থে কম। বাজেটেও কি এর প্রভাব রয়েছে?

আবদুল লতিফ মণ্ডল: কৃষি খাতের অবদান জাতীয় আয়ে একেবারে কম নয়। এটা ঠিক, স্বাধীনতার পর জিডিপিতে কৃষির অবদান অনেক বেশি ছিল। তার কারণ তখনও অন্যান্য খাত সেভাবে বিকশিত হয়নি। ধীরে ধীরে অন্যান্য খাত বিশেষত শিল্পের বিকাশে কৃষির অবদান কমেছে। তবে মনে রাখতে হবে, কৃষি খাত অনেক বড় বিষয়। এর সঙ্গে শস্য, মৎস্য, বন এমনকি প্রাণিসম্পদও অন্তর্ভুক্ত। জিডিপিতে কৃষির অবদান ২০ শতাংশের নিচে নেমে এলেও বাজেটে কৃষি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না তা কিন্তু নয়।

সমকাল: কৃষি কীভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে?

আবদুল লতিফ মণ্ডল: আমরা দেখেছি, দেশের সব বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ ছিল। প্রথম থেকে পঞ্চম পর্যন্ত সব পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যথাযথভাবে। মনে রাখা দরকার, শিল্পের অগ্রগতিতে কৃষি খাতে জিডিপিতে অবদান কমলেও কৃষিই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। কৃষি আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। দেশের মোট কর্মসংস্থানের অন্তত ৪০ শতাংশ কৃষিকেন্দ্রিক। এমনকি আমরা যদি হিসাব করি, দেখা যাবে অন্যান্য খাতও কৃষির ওপর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত। যেমন হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন এবং অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা। Continue reading

বাংলাদেশের উন্নতি থেকে পাকিস্তানের শিক্ষা

মূল: আবিদ হাসান

বর্তমান সরকারসহ পাকিস্তানের সব সরকারই সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাপী ধরনা ধরেছে। আমরা ঋণে হাবুডুবু খাচ্ছি এবং প্রবৃদ্ধির হার একই বৃত্তে আবদ্ধ। অদূর ভবিষ্যতে এভাবেই চলবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, কোনো সরকারই পাকিস্তানের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের গভীরে দৃষ্টি দেয়নি। অথচ ২০ বছর আগেও এটি অকল্পনীয় ছিল- বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে দেশটি ২০৩০ সালে অর্থনীতির বড় শক্তি হয়ে উঠবে। আর পাকিস্তানের এই দুরবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ থেকে আমাদের সহায়তা নেওয়ার অবস্থা তৈরি হবে।

পাকিস্তানের এই মন্দাবস্থার দায় আমাদেরই। যদিও আমাদের নেতারা সহজেই আমাদের শত্রু এবং আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের দোষ দিয়ে থাকেন। এটা অস্বীকার করা যাবে না, আইএমএফ কিংবা বিশ্বব্যাংকের দুর্বল নীতি ও মন্দ ঋণের গভীর খাদে রয়েছে পাকিস্তান। দুর্নীতি ছাড়াও সন্ত্রাসবাদের প্রভাব রয়েছে অর্থনীতিতে। কর্মক্ষমতায় দুর্বলতার ফলে দায়িত্বহীন ও অযৌক্তিক নীতি এবং উদ্যমহীন সংস্কার করা হচ্ছে। বেপরোয়া নীতির দুটি উদাহরণ হলো :জাতীয় ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের অধিক সরকারি ব্যয় এবং রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি আমদানিনির্ভরতা বাইরের ঋণও বাড়িয়ে তুলছে।

নানা দিক থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সাযুজ্য থাকায় বাংলাদেশের সাফল্য একটি ভালো উদাহরণ। একই ধর্ম, কাজের ক্ষেত্রে নৈতিকতায় ঘাটতি, নোংরা রাজনীতি, সুশাসনের অভাব, দুর্বল জনপ্রশাসন ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও অভিজাতদের তোষণের নীতিতে দুই দেশের অবস্থান প্রায় সমান হলেও বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি বেড়েছে কয়েক গুণ। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় যেখানে দুই হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার, সেখানে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় মাত্র এক হাজার ১৯০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য অর্জন আর পাকিস্তানের দুর্যোগের পেছনের গল্প কী? Continue reading

কর্মক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীর বৈশ্বিক সংকট

কর্মজীবী নারীর গর্ভধারণকাল নিয়ে চাকরির জটিলতার চিত্র বিশ্বব্যাপী প্রায় অভিন্ন। এমনকি বিশ্বের ৩৮টি দেশে গর্ভবতী নারীর চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে। ১৩ মে বিশ্বব্যাংকের ব্লগে প্রকাশিত ‘ইন থার্টি এইট কান্ট্রিস উইম্যান ক্যান স্টিল বি ফায়ারড ফর বিয়িং প্রেগন্যান্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে ইতালির ভলিবল খেলোয়াড় লারা লাগলির চাকরিচ্যুতির ঘটনা দিয়ে। লারার ঘটনা ইতালির আদালত থেকে সিনেট পর্যন্ত গড়ায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, কর্মজীবী গর্ভবতী নারীর এমন সংকট চীন, গ্রিস, যুক্তরাজ্য এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ তথা সিডো সনদ অনুযায়ী নারীর গর্ভধারণ কিংবা সন্তান জন্মদানের কারণে চাকরিচ্যুতিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারী কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্যের স্বীকার হলে কিংবা অবৈধভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত হলে অধিকাংশ দেশেই আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলছে, বিশ্বের অন্তত ২০ শতাংশ অর্থনীতিতে গর্ভধারণের কারণে নারী চাকরিচ্যুত হলেও তার আইনের আশ্রয় নেওয়ার কোনো অধিকারই নেই। যেখানে নারীর আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেখানেই কর্মজীবী গর্ভবতী নারী হেনস্তার শিকার হন আর যেখানে সেই অধিকারই নেই, সেখানকার অবস্থা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

নারীর গর্ভধারণের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অনেক বিষয় জড়িত, যেগুলোর প্রভাব রয়েছে কর্মক্ষেত্রেও। গর্ভকালে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, বিশেষ যত্ন, খাদ্য ও পুষ্টি পাওয়া এবং তার চেয়েও বড় বিষয় মানসিক সমর্থন। কর্মক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতিসহ গর্ভধারণের কারণে অন্য ধরনের বৈষম্যও দেখা যায়। যেমন ধরা যাক, গর্ভবতী কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি আটকে দেওয়া, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজের অ্যাসাইনমেন্ট না দেওয়া, মাঝে চিকিৎসককে দেখানোর জন্য ছুটি না দেওয়া। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা ও সহমর্মিতামূলক আচরণ না করে বিপরীতমুখী ব্যবহারে গর্ভবতী নারী ভেঙে পড়তে পারেন। তাতে ওই নারীই নন বরং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গর্ভের সন্তানও। Continue reading